বিএফটিআইকে জাতীয় থিংক ট্যাংক হিসেবে গড়ে তোলা হবে

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ৩০ বার
বিএফটিআইকে জাতীয় থিংক ট্যাংক হিসেবে গড়ে তোলা হবে

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বাণিজ্য আইন, অর্থনৈতিক গবেষণা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই)-কে একটি শক্তিশালী জাতীয় থিংক ট্যাংক হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তন, মুক্তবাণিজ্য চুক্তির বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির এই সময়ে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় একটি আধুনিক, গবেষণানির্ভর ও দক্ষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বিকল্প নেই। সেই লক্ষ্যেই বিএফটিআইকে নতুন পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের মাধ্যমে আরও কার্যকর ও আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হবে।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) রাজধানীর বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের ৬৩তম পরিচালনা পর্ষদের সভায় সভাপতির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, দেশের রপ্তানি সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে তথ্যনির্ভর গবেষণা, দক্ষ জনবল এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। তাঁর মতে, অর্থায়নের অভাব নয়, বরং সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজন ছিল। এখন সেই ঘাটতি পূরণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিএফটিআই ভবিষ্যতে সরকারের নীতিনির্ধারণ, ব্যবসায়ী সমাজ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য জ্ঞানকেন্দ্রে পরিণত হবে।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিধিবিধান, শুল্কনীতি, বাণিজ্য আইন এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ে দক্ষ জনবল তৈরিতে বিএফটিআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তৈরি করা গেলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাণিজ্য আলোচনায় আরও কার্যকরভাবে নিজেদের স্বার্থ তুলে ধরতে সক্ষম হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের বাজার পরিস্থিতি নিয়মিত বিশ্লেষণ করবে বিএফটিআই। চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোর অর্থনৈতিক প্রবণতা, বাণিজ্যিক সুযোগ, সম্ভাব্য ঝুঁকি, শুল্ক পরিবর্তন এবং সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়ে নিয়মিত গবেষণা পরিচালনা করা হবে। এসব গবেষণার ফলাফল সরকারের নীতিনির্ধারণ, রপ্তানিকারকদের কৌশল নির্ধারণ এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সভায় আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক এবং বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বাণিজ্য আইন, অর্থনৈতিক নীতি এবং বাণিজ্যিক আলোচনাবিষয়ক বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হবে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দক্ষ আলোচক এবং বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ তৈরি করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও জানান, সরকারি ও বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ বাণিজ্য আইন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এই নেটওয়ার্ক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তি, চুক্তি বিশ্লেষণ এবং নীতিগত সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

পরিচালনা পর্ষদের সভায় বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে ড. মোস্তফা আবীদ খানের নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় উপস্থিত সদস্যরা আশা প্রকাশ করেন, তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন গতি পাবে।

সভায় জানানো হয়, দেশের বাণিজ্য নীতি উন্নয়ন এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) ইতোমধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব গবেষণার মধ্যে রয়েছে বিদ্যমান বাণিজ্য আইন ও বিধিমালার পর্যালোচনা, রপ্তানি বহুমুখীকরণে Anti-Export Bias-এর প্রভাব, অ্যান্টি-ডাম্পিং, কাউন্টারভেইলিং ও সেফগার্ড ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ এবং বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা।

এছাড়া বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের (বিসিসি) জন্য দেশের বিমান টিকিট বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি নিয়েও গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাণিজ্য নীতি পর্যালোচনা, আরজেএসসি নিবন্ধন ও রিটার্ন দাখিল, কর, ভ্যাট, কাস্টমস এবং আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব উদ্যোগ ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

সভায় আরও জানানো হয়, বিএফটিআই ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ উদ্যোগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও ব্যবসা বিষয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা (পিজিডি) চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) এবং ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (আইইআরএফ) সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং সক্ষমতা উন্নয়ন কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে। এ পরিস্থিতিতে গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারণ, দক্ষ বাণিজ্য বিশেষজ্ঞ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইন সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বিএফটিআইকে একটি শক্তিশালী গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ সময়োপযোগী বলে মনে করছেন তারা।

পরিচালনা পর্ষদের সভায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী, বাণিজ্য সচিব মো. আতাউর রহমান খান, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ, বিএফটিআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. সাইফ উদ্দিন আহমেদ, পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় অংশগ্রহণকারীরা দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সক্ষমতা বৃদ্ধি, গবেষণা সম্প্রসারণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে বিএফটিআইকে আরও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত