ছাত্রদের ওপর দমন-পীড়ন, মোদিকে ক্ষমা চাইতে বললেন রাহুল

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ৮১ বার
ছাত্রদের ওপর দমন-পীড়ন, মোদিকে ক্ষমা চাইতে বললেন রাহুল

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ব্যাপক আহতের ঘটনা এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে শিক্ষার্থীদের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। তাঁর অভিযোগ, শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের ভবিষ্যৎ, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতার দাবিতে আন্দোলনে নামা তরুণদের ওপর যে ধরনের বলপ্রয়োগ করা হয়েছে, তা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর দমন না করে তাদের উদ্বেগের প্রতি সরকারকে সংবেদনশীল হতে হবে।

মঙ্গলবার দিল্লিতে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ও রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেসের সাংসদরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় তারা শিক্ষার্থী আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেন এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বলা হয়, যারা দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে, সেই তরুণদের সঙ্গে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা উচিত।

বিক্ষোভস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে রাহুল গান্ধী বলেন, দেশের তরুণরা কেবল শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়েই উদ্বিগ্ন নয়, তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়েও গভীর অনিশ্চয়তায় ভুগছে। তাঁর ভাষায়, “এটা সম্পূর্ণ ভুল। দেশের তরুণদের সঙ্গে এভাবে আচরণ করা যায় না। তারা তাদের ভবিষ্যৎ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে উদ্বিগ্ন বলেই রাস্তায় নেমেছে।” তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবিকে রাজনৈতিকভাবে দেখার পরিবর্তে সরকারকে তাদের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে শোনা উচিত।

রাহুল গান্ধীর মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমেই রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে চলে যাচ্ছে, যার ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের সুযোগ সীমিত হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগে অনিয়ম এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা দেশের লাখো তরুণের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সরকার যদি শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নেয়, তাহলে সংকট আরও গভীর হবে।

দিল্লিতে সংঘর্ষে আহত বিক্ষোভকারীদের খোঁজ নিতে রাহুল গান্ধী রাম মনোহর লোহিয়া (আরএমএল) হাসপাতালে যাওয়ার ঘোষণা দেন। সেখানে চিকিৎসাধীন শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানবেন বলেও জানান তিনি। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া আইনি পদক্ষেপও পুনর্বিবেচনা করা উচিত।

এদিকে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) জানিয়েছে, তারা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত রাখবে। তবে দিল্লিতে সংঘর্ষে বিপুলসংখ্যক সমর্থক আহত হওয়ার পর আপাতত সংসদ অভিমুখে নতুন কোনো পদযাত্রা কর্মসূচি দেওয়া হবে না। মঙ্গলবার দলের প্রধান অভিজিৎ দীপকে বলেন, আন্দোলনের উদ্দেশ্য কখনোই তরুণদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলা নয়। সাম্প্রতিক ঘটনার পর তারা কৌশল পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

অভিজিৎ দীপকে বলেন, আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তা তাদের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তিনি দাবি করেন, দিল্লি পুলিশের কঠোর পদক্ষেপে বহু শিক্ষার্থী ও তরুণ-তরুণী আহত হয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে আন্দোলনের কর্মসূচি নির্ধারণে অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

সোমবার সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিন হাজারো বিক্ষোভকারী প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং সরকারের জবাবদিহির দাবিতে সংসদ অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করেন। মিছিল সংসদ ভবনের দিকে অগ্রসর হলে দিল্লি পুলিশ বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড স্থাপন করে। পরে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। একপর্যায়ে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়, যা দ্রুতই বড় আকার ধারণ করে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সংঘর্ষে আহত ঘিটোর্নি এলাকার ২৫ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থী বর্তমানে দিল্লির লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া কয়েকজন আহতকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। চোখে পেলেটের আঘাত পাওয়া আরেক আন্দোলনকারীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (এইমস)-এ স্থানান্তর করা হয়েছে।

ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, সংঘর্ষে আহত এক তরুণী বর্তমানে রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। যদিও তাঁর আঘাতের প্রকৃতি সম্পর্কে হাসপাতাল বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। আহতদের সংখ্যা এবং তাদের অবস্থার বিষয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেলেও সংঘর্ষের তীব্রতা নিয়ে কোনো পক্ষই দ্বিমত পোষণ করছে না।

সংঘর্ষের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে সিজেপি সভাপতি অভিজিৎ দীপকে আহত সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চান। তিনি লেখেন, আন্দোলনকারীদের, বিশেষ করে নারী সমর্থকদের, আরও ভালোভাবে সুরক্ষা দিতে না পারায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করছেন। তাঁর অভিযোগ, দিল্লি পুলিশের আচরণ ছিল অমানবিক এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে অনেক নিরীহ আন্দোলনকারী অপ্রয়োজনীয় বলপ্রয়োগের শিকার হয়েছেন।

দীপকে আরও দাবি করেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে রাজনৈতিকভাবে রক্ষা করতেই সরকার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তিনি আহতদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করে তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন এবং বলেন, আন্দোলনের মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তিনি আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বলেন, “আমরা আপনাদের জন্য লড়াই চালিয়ে যাব।”

অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত রাহুল গান্ধীর ক্ষমা চাওয়ার দাবির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। দিল্লি পুলিশও তাদের পদক্ষেপকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় বলে উল্লেখ করেছে। পুলিশের দাবি, সংসদ ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের চর্চায় অযথা বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা, সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অধিকার নিয়ে নতুন করে জাতীয় পর্যায়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধী দলগুলো বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে সরকারের জবাবদিহির প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরলেও সরকারপক্ষ আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার বিষয়টিকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে এই ইস্যু ভারতের সংসদ ও রাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com