সাত মাস বেতন বন্ধ, কর্মবিরতিতে রামেক ওসিসি কর্মীরা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ জুলাই, ২০২৬
  • ২৫ বার
সাত মাস বেতন বন্ধ, কর্মবিরতিতে রামেক ওসিসি কর্মীরা

প্রকাশ: ২১ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার বা ওসিসি, ট্রমা সেন্টার এবং ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবের নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা গত দীর্ঘ সাত মাস ধরে সম্পূর্ণ অবৈতনিক অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কঠোর আন্দোলনে নেমেছেন। দীর্ঘ সাতটি মাস ধরে সরকারি কোনো প্রকার আর্থিক বরাদ্দ বা বেতনভাতা না পাওয়ার চরম অর্থনৈতিক সংকটের কারণে পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে তারা নিজেদের বকেয়া বেতন দ্রুত পরিশোধ এবং জনবল রাজস্বকরণের ন্যায়সংগত ও দীর্ঘদিনের দাবিত আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি কর্মসূচি শুরু করেছেন। তীব্র এই আন্দোলনের ফলে উত্তরবঙ্গ জুড়ে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং জরুরি ফরেনসিক চিকিৎসা সেবার মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতটি আজ বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পতিত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করেছে।

আজ মঙ্গলবার সকাল ঠিক দশটার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্যস্ততম জরুরি বিভাগের মূল প্রবেশপথ ও সংলগ্ন চত্বরে আন্দোলনরত কর্মীরা তাদের বিভিন্ন দাবি সমসংবলিত বড় বড় ব্যানার ঝুলিয়ে দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে এই কর্মসূচি শুরু করেন এবং দুপুরের গড়িয়ে বিকেল চারটা বাজার পরও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের অনড় কর্মবিরতি অত্যন্ত কঠোরভাবে অব্যাহত ছিল। সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে যে, সুদূর ২০০২ সাল থেকে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রে ঘটে চলা বিভিন্ন নির্মম নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের বহুমুখী সেবাদানকারী এই বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানটি সমাজের অসহায় ও নির্যাতিত নারী ও শিশুদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, আইনি সহায়তা, আইনগত সনদপত্র প্রদান ছাড়াও ওসিসিতে চিকিৎসাধীন দুস্থ ভিকটিমদের নিখরচায় ট্রমা সেন্টারে দক্ষ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের মাধ্যমে অত্যন্ত সংবেদনশীল মনোসামাজিক কাউন্সেলিং এবং ডিএনএ পরীক্ষার মতো অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জরুরি সেবাগুলো নিরলসভাবে প্রদান করে আসছে। বর্তমান সময়ে সাধারণ কোনো ল্যাবরেটরিতে ধর্ষণের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনার শিকার ভুক্তভোগীদের ডিএনএ টেস্ট করাতে গেলে যেখানে প্রায় পনেরো হাজার টাকার মতো মোটা অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়, সেখানে এই সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অসহায় মানুষগুলো সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো পেয়ে আসছিলেন।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক ও অমানবিক বিষয় হলো যে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই ওসিসি যদি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়, তবে সমাজের প্রান্তিক ও অবহেলিত ভুক্তভোগী নারী ও শিশুরা প্রয়োজনীয় ও আইনসম্মত কোনো মেডিকেল সার্টিফিকেট বা ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন আর সময়মতো হাতে পাবেন না। এর ফলে বাধ্য হয়ে তাদের সমস্ত ফরেনসিক ও ডিএনএ টেস্ট অত্যন্ত চড়া মূল্যে বাইরের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টার বা ল্যাবরেটরিতে করাতে হবে, যা গরিব ও সহায়সম্বলহীন মানুষের পক্ষে কোনোভাবেই বহন করা সম্ভব নয়। বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা, ট্রমা কাউন্সেলিং এবং অত্যন্ত জরুরি ডিএনএ টেস্টের এই সুমহান সেবাগুলো থেকে বঞ্চিত হওয়ার ফলে উত্তরবঙ্গের বিচারপ্রার্থী ও নির্যাতিত মানুষগুলো এক অপূরণীয় ও মারাত্মক সংকটের মধ্যে পড়ে যাবেন। বর্তমানে শুধুমাত্র রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই ওসিসিতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে সর্বমোট তেইশজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তা ও কর্মচারী অত্যন্ত সততা ও ঝুঁকির সঙ্গে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন, কিন্তু গত সাতটি দীর্ঘ মাস ধরে এই প্রকল্পের কর্মরত ব্যক্তিরা তাদের প্রাপ্য মাসিক বেতন এবং অফিস পরিচালনার জন্য ন্যূনতম কোনো আর্থিক বরাদ্দ না পেয়ে চরম আর্থিক অনটন ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

ভুক্তভোগী ক্ষুব্ধ কর্মীরা অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, ‘মাল্টিসেক্টোরাল প্রোগ্রাম অন ভায়োলেন্স এগেইনস্ট ওমেন’ নামক এই অত্যন্ত জনহিতকর প্রকল্পটি যখন চলমান ছিল, তখন বিগত ২০১৬ সালের দিকেও টানা নয় মাসের মতো দীর্ঘ সময় ধরে তাদের বেতন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে নানামুখী জটিলতার অজুহাতে সেই বকেয়া বেতন আর প্রকল্পের কর্মরত অসহায় ব্যক্তিদের পরিশোধ করা হয়নি। এর ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটির নির্ধারিত মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হয়ে যায়, যার ফলে প্রশাসনিক জটিলতার আবর্তে পড়ে কর্মীদের বেতনভাতা সম্পূর্ণ আটকে যায়। তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট চিঠি দিয়ে প্রকল্পের সমস্ত জনবলকে আগের মতোই তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাওয়ার জন্য মৌখিক ও লিখিত নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছিল, কিন্তু কাজের কাজ কেবল মৌখিক নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও মাস শেষে ক্ষুধার্ত পেট চালানোর মতো বকেয়া বেতনের কোনো সুরাহা করা হয়নি।

পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিয়ে ভুক্তভোগী কর্মীরা জানান যে, সরকার সম্প্রতি অত্যন্ত অপরিকল্পিতভাবে ওসিসিগুলোকে সরাসরি আউটসোর্সিং খাতের অধীনে ছেড়ে দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া শুরু করে এবং এর অংশ হিসেবে মোট ছয়টি নতুন ঠিকাদারি কোম্পানি দরপত্র বা টেন্ডার পায়। এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অধীনে গত ১০ জুন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের ওসিসির সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে একটি বাধ্যতামূলক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়েছিল, যা তাদের চাকরি স্থায়ীকরণের বিষয়ে একপ্রকার প্রহসনে পরিণত হয়। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো যে, এর ঠিক পনেরো দিন পরেই কোনো প্রকার যৌক্তিক কারণ বা ব্যাখ্যা ছাড়াই সেই পরীক্ষাটি সম্পূর্ণ বাতিল করে দেওয়া হয়, যার ফলে কর্মরত মানুষেরা চরম পেশাগত অনিশ্চয়তা এবং গভীর অন্ধকারের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হন। দিনের পর দিন বিনা বেতনে পরিবার-পরিজন নিয়ে অনাহার ও অর্ধাহারে দিন কাটানোর এই নির্মম বাস্তবতাই তাদের আজ বাধ্য করেছে রাজপথে নেমে এসে এই কঠোর কর্মবিরতি কর্মসূচি পালন করতে।

হাসপাতালের এই আকস্মিক ও মারাত্মক অচলাবস্থা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সম্মানিত মুখপাত্র এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ডা. শেখ শামীম আহমেদ প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে অত্যন্ত উদ্বেগের সুরে জানান যে, ওসিসিতে বর্তমানে চিকিৎসাধীন অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মুমূর্ষু রোগীগুলোর চিকিৎসার জন্য বিকল্প হিসেবে তারা ঠিক কী ধরনের জরুরি ব্যাকআপ বা সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন, তা নিয়ে হাসপাতালের পরিচালকের কার্যালয়ে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে দীর্ঘ ও জরুরি বৈঠক চলছে। তিনি আরও আশ্বস্ত করেন যে, কর্মচারীদের বকেয়া বেতনের এই জটিল সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য হাসপাতালের প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারের উচ্চপর্যায়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে যোগাযোগ করার অক্লান্ত ও আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। খুব দ্রুতই সরকারের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাবে এবং এই মানবিক সংকটের অবসান ঘটবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, তবে যতদিন পর্যন্ত বকেয়া বেতন পরিশোধের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হবে, ততদিন পর্যন্ত কর্মীদের এই আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় মনোভাব সমগ্র চিকিৎসালয় চত্বরে এক চাপা উত্তেজনা ও সংবেদনশীল পরিবেশ বজায় রেখেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত