প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
টানা ও অঝোর বর্ষণের কারণে সোনারগাঁয়ে ব্যস্ততম ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখন চরম দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে উঠেছে এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতের জন্য একপ্রকার মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত এই মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও ছোট যানবাহন চরম ঝুঁকি ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে চলাচল করছে। বিশেষ করে রাতের বেলা এই মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াত করা চালক ও যাত্রীদের জন্য এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে বিপজ্জনক খানাখন্দ তৈরি হওয়ায় একদিকে যেমন প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে, অন্যদিকে তেমনি বেড়েছে রাতের আঁধারে সংঘটিত বিভিন্ন ছিনতাইয়ের ঘটনাও। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের এই প্রধান পথটির এমন বেহাল দশায় সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও চরম অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্রে বিস্তারিতভাবে জানা গেছে, ঐতিহাসিক সোনারগাঁ উপজেলার প্রবেশদ্বারখ্যাত কাঁচপুর সেতুর পূর্ব পাশ থেকে শুরু করে মদনপুর, লাঙ্গলবন্দ, ব্যস্ততম মোগরাপাড়া চৌরাস্তা হয়ে মেঘনা টোলপ্লাজা পর্যন্ত মহাসড়কের উভয় পাশের প্রায় চৌদ্দ কিলোমিটার এলাকার বিভিন্ন স্থানে রাস্তার ওপরের পিচ ও কার্পেটিং সম্পূর্ণ উঠে গিয়ে ছোট-বড় অসংখ্য গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে গত কয়েকদিনের টানা ভারী বর্ষণে এসব গর্তগুলোর ভেতর থইথই পানি জমে থাকায় দূরপাল্লার চালকরা অনেক সময় রাস্তার গর্তের সঠিক গভীরতা ও আকৃতি কিছুতেই বুঝতে পারেন না। আর এর ফলে হঠাৎ করেই গাড়ির চাকা গর্তে পড়ে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খাচ্ছে এবং প্রায়শই এক্সেল ভেঙে বা অন্যান্য যন্ত্রাংশ বিকল হয়ে মাঝপথেই মহাসড়কের ওপর গাড়ি থামিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন চালকরা। এর জেরে ওই পুরো অংশজুড়ে তীব্র ও দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে, যা যাত্রীদের সময় অপচয়ের পাশাপাশি চরম শারীরিক ও মানসিক ভোগান্তিতে ফেলছে।
কুমিল্লার জনপ্রিয় দূরপাল্লার তিশা পরিবহনের একজন অভিজ্ঞ চালক শুক্কুর আলী অত্যন্ত হতাশার সুরে জানান যে, দিনের বেলায় খালি চোখে কিছুটা সতর্ক থেকে মহাসড়কের এসব খানাখন্দ বা গর্ত এড়িয়ে চলাচল করা সম্ভব হলেও রাতের বেলা পথ চলতে গিয়ে তাদের চরম ও অকথ্য দুর্ভোগ পোহাতে হয়। রাতের অন্ধকার এবং বৃষ্টির কারণে গর্তগুলো পানির নিচে ঢাকা থাকায় প্রায়ই আকস্মিকভাবে গাড়ির চাকা গভীর গর্তে আটকে যায়, যার ফলে মুহূর্তের মধ্যে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং অনেক সময় গাড়ি বিকল হয়ে চরম বিপাকে পড়তে হয় চালক ও নিরীহ যাত্রীদের। একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় একজন ট্যাক্সিচালক মনির হোসেন জানান যে, চলন্ত অবস্থায় গাড়ির চাকা একবার মহাসড়কের এই গভীর গর্তগুলোতে পড়লে চালকের পক্ষে গাড়ির স্টিয়ারিং বা চাকার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। মহাসড়ক রক্ষাকারী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও উদাসীনতার কারণে রাস্তাগুলোর মেরামতকাজ অতীতে খুবই দায়সারা গোছের করা হয়েছিল বলেই অল্প বৃষ্টিতেই কার্পেটিং ও পিচ উঠে গিয়ে এমন করুণ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এর ওপর আবার রাতের বেলা যানবাহন ধীরগতিতে চললে বা বিকল হলে একশ্রেণির বেপরোয়া ছিনতাইকারীর দৌরাত্ম্য ও উৎপাতে চালক ও যাত্রীদের আতঙ্ক বহুগুণ বেড়ে যায়।
এদিকে মহাসড়কের এই ভয়াবহ ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী বেহাল অবস্থার বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বা সওজ বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম সাংবাদিকদের জানান যে, সাম্প্রতিককালের টানা ও অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে মহাসড়কের বিভিন্ন পিচঢালা অংশে নতুন করে এই বিপজ্জনক খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া মহাসড়কের দুই পাশের সংযোগ এলাকায় জমে থাকা অনাবশ্যক ঘাস ও ঘন ঝোপঝাড়ের কারণে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশিত হতে না পারায় রাস্তাগুলো খুব দ্রুত এবং মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি আরও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আশ্বস্ত করে বলেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছে এবং ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোর জরুরি সংস্কারকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করা হয়েছে। আবহাওয়া যদি সম্পূর্ণ অনুকূলে থাকে এবং আর যদি ভারী বৃষ্টিপাত না হয়, তবে আশা করা যাচ্ছে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই ব্যস্ততম এই মহাসড়কটি পুনরায় সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত করে সাধারণ যানবাহন চলাচলের উপযোগী করে তোলা সম্ভব হবে।
জনগুরুত্বপূর্ণ এই মহাসড়কটি দ্রুত ও স্থায়ীভাবে সংস্কার করা না হলে যেকোনো মুহূর্তে আরও বড় ধরনের কোনো মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল ও স্থানীয় এলাকাবাসী। দেশের অন্যতম প্রধান এই বাণিজ্যিক করিডোরটি দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার পণ্যবাহী পরিবহন চলাচল করে থাকে, ফলে এর রক্ষণাবেক্ষণে কোনো ধরনের শৈথিল্য প্রদর্শনের সুযোগ নেই বললেই চলে। সাধারণ যাত্রী, পরিবহন শ্রমিক এবং সচেতন নাগরিক সমাজের একটাই জোর দাবি, সওজ বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন যেন কেবল সাময়িক বা লোক দেখানো প্রলেপ না দিয়ে অত্যন্ত মানসম্মত উপায়ে মহাসড়কটির স্থায়ী সংস্কার নিশ্চিত করে। একই সঙ্গে রাতের বেলায় চলাচলকারী সাধারণ মানুষের জানমালের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মহাসড়কের সংবেদনশীল পয়েন্টগুলোতে পুলিশের নিয়মিত টহল ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় এই মরণফাঁদ পরিণত হতে পারে আরও বড় কোনো মানবসৃষ্ট বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের স্থায়ী কারণে, যা কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।