প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
যান্ত্রিক ত্রুটির দীর্ঘ ও চরম অনিশ্চয়তা কাটিয়ে অবশেষে প্রায় ২২ ঘণ্টা পর সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সৌদি আরবের পবিত্র নগরী জেদ্দার উদ্দেশে সফলভাবে ডানা মেলেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি বিশেষ ফ্লাইট। মঙ্গলবার বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে বোয়িং ৭৭৭ মডেলের ওই ফ্লাইটটি বিজি-২৩৫ নম্বর নিয়ে সিলেট থেকে প্রথমে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয় এবং সেখান থেকে অতিরিক্ত যাত্রী ও আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে জেদ্দার পথে চূড়ান্ত যাত্রা শুরু করে। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বিমানবন্দরে আটকে থাকা শত শত ওমরাহযাত্রী ও প্রবাসীর মনে স্বস্তি ফিরে আসে, তবে এই দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর ফুরানোর আগে তাদের যে সীমাহীন দুর্ভোগ ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তা বিমানযাত্রার নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার ওপর এক নতুন প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত সোমবার সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে, যখন নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জেদ্দার উদ্দেশে উড্ডয়নের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফ্লাইটটি রানওয়ের দিকে এগিয়ে যায়। যাত্রীরা যখন তাঁদের বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত ওমরাহ পালন কিংবা কর্মস্থলে ফেরার আনন্দে বিভোর ছিলেন, ঠিক তখনই উড্ডয়নের ঠিক আগ মুহূর্তে রানওয়েতে বিমানটিতে আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ে। চরম সতর্কতা অবলম্বন করে পাইলট তাৎক্ষণিকভাবে বিমানটিকে উড্ডয়ন থেকে বিরত রাখেন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিমানটি ফিরিয়ে এনে ট্যাক্সিওয়েতে পার্ক করেন। যাত্রীদের নিরাপত্তা রক্ষায় পাইলটের এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বড় ধরনের কোনো সম্ভাব্য দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা করলেও, এর পর থেকেই শুরু হয় যাত্রীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অসহনীয় পর্ব।
বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং যাত্রীদের বিবরণ থেকে জানা যায়, ত্রুটি দেখা দেওয়ার পরপরই ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতরে শুরু হয় জরুরি মেরামতের কাজ। কিন্তু ত্রুটির মাত্রা ও জটিলতা বেশি থাকায় স্থানীয় প্রকৌশলীদের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে তা সমাধান করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজধানী ঢাকা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দক্ষ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের একটি বিশেষ দল বিমানে করে সিলেটে এসে পৌঁছায়। সিলেট ও ঢাকা থেকে আসা এই যৌথ প্রকৌশলী দল দীর্ঘ রাত এবং সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে বিমানটির ত্রুটিপূর্ণ অংশটি মেরামত করার চেষ্টা চালায়। টানা প্রায় ২২ ঘণ্টা ধরে চলা এই নিবিড় ও জটিল মেরামতের কাজ সফলভাবে শেষ হওয়ার পরেই বিমানটিকে পুনরায় চলাচলের শতভাগ উপযোগী হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
এদিকে নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পেরে এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিমানবন্দরে অলস সময় কাটাতে বাধ্য হয়ে ফ্লাইটের যাত্রীরা চরম দুর্ভোগ ও উৎকণ্ঠার শিকার হন। আটকে থাকা যাত্রীদের এই বিশাল বহরের সিংহভাগ জুড়েই ছিলেন পুণ্য অর্জনের আশায় ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরবগামী সাধারণ মানুষ ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। সোমবার রাতে হঠাৎ সৃষ্ট এই পরিস্থিতিতে আটকে পড়া যাত্রীদের চরম ভোগান্তি এড়াতে বিমান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাদের বিমানবন্দর থেকে সরিয়ে নগরীর বিভিন্ন উন্নত হোটেলে সাময়িক থাকা ও খাওয়ার সুব্যবস্থা করা হয়। তবে অচেনা শহরে এসে হঠাৎ এমন অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে বয়স্ক ও নারী যাত্রীরা ভীষণ শারীরিক ক্লান্তি ও মানসিক চাপের মুখে পড়েন। অনেকেরই পবিত্র ওমরাহ পালনের শিডিউল বা পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিতে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে, যা তাদের জন্য অত্যন্ত বেদনায়ক ছিল।
এ বিষয়ে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্মানিত পরিচালক হাফিজ আহমদ সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, যাত্রীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থেই ত্রুটিযুক্ত বিমানটিকে তাৎক্ষণিকভাবে উড্ডয়ন থেকে নিবৃত করা হয়েছিল। তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, দেশসেরা প্রকৌশলীদের যৌথ প্রচেষ্টায় বিমানের যান্ত্রিক ত্রুটি সম্পূর্ণ ও নিখুঁতভাবে নিরসন করার পরই মঙ্গলবার বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে বিমানটিকে নিরাপদে ঢাকা হয়ে জেদ্দার পথে সিলেট ত্যাগ করার অনুমতি দেওয়া হয়। এই দীর্ঘ ঘটনার পর বিমান চলাচল খাতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কারিগরি ত্রুটি রোধে আরও বেশি রক্ষণাবেক্ষণ ও আগাম সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা, যাতে ভবিষ্যতে কোনো যাত্রীকে এমন মর্মান্তিক ও দীর্ঘ ভোগান্তির মুখে পড়তে না হয়।