কাঙ্ক্ষিত বিচারের আশায় সিরাজগঞ্জের শহীদ পরিবার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪ বার
কাঙ্ক্ষিত বিচারের আশায় সিরাজগঞ্জের শহীদ পরিবার

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসের পাতায় একাত্তরের মতোই আরেকটি ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হয়ে চিরভাস্বর হয়ে আছে ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের দিনটি। উত্তর জনপদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল জেলা সিরাজগঞ্জে ওইদিন সংঘটিত হয়েছিল এক নজিরবিহীন ত্রিমুখী সংঘর্ষ। আওয়ামী লীগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং অধিকারসচেতন ছাত্র-জনতার সেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে কেঁপে উঠেছিল গোটা সিরাজগঞ্জ। সাংবাদিক, শিক্ষার্থী, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ বহু প্রাণ ঝরে গিয়েছিল রাজপথে। আজকের এই দিনে ঘটনার দুই বছর পূর্ণ হলেও সিরাজগঞ্জের বাতাস থেকে এখনও সম্পূর্ণরূপে মুছে যায়নি স্বজন হারানোর গভীর শোকের দীর্ঘশ্বাস। নিহতদের পরিবার এবং আহতদের আর্তনাদ আজও চারপাশের পরিবেশকে ভারী করে তোলে, আর তাদের একটাই আকুল প্রশ্ন—কবে মিলবে এই নৃশংসতার কাঙ্ক্ষিত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার?

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন পয়েন্টে যে নারকীয় তাণ্ডব ও ত্রিমুখী সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়েছিল, তার ক্ষত আজও তাজা। তৎকালীন রাজনৈতিক সহিংসতা ও জনরোষের মুখে এনায়েতপুর থানা এলাকাসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে যে বর্বরোচিত হামলা হয়েছিল, তাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন বহু মানুষ। দীর্ঘ দুই বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ভয়াবহ দিনটির অনেক রহস্য এখনও কুয়াশাবৃত। ঘটনার পর দীর্ঘ সময় গড়িয়ে গেলেও এখনও পুরোপুরি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি সেই দিন সংঘটিত সহিংসতায় খোয়া যাওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সব বৈধ ও ঘাতকদের হাতে লুট হওয়া অস্ত্রশস্ত্র। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এত বড় একটি নাড়া দেওয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার প্রধান প্রধান এজাহারভুক্ত মূল আসামিরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। আইনের ফাঁকফোকর কিংবা প্রভাবশালী মহলের অদৃশ্য ইশারায় আসামিরা মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়ালেও বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি শহীদ পরিবারগুলোকে প্রতিনিয়ত ভেতর থেকে পুড়িয়ে মারছে।

সরকারিভাবে গঠিত গেজেট ও জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জের ওই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মোট ১৩ জন বীর আন্দোলনকারীকে শহীদ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক তালিকায় রয়েছেন এনায়েতপুরের উদীয়মান কলেজ শিক্ষার্থী শিহাব হোসেন, সম্ভাবনাময় মাদ্রাসা শিক্ষার্থী সায়েম হোসেন এবং হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে পরিবার চালানো তাঁত শ্রমিক ইয়াহিয়া আলীসহ আরও অনেকে। তাঁদের এই আত্মত্যাগ দেশের গণতন্ত্র ও মুক্তিকামী মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইকে এক নতুন মাত্রা দিলেও তাঁদের পরিবারের কাছে এই অর্জন সান্ত্বনার চেয়েও বেদনার বড় পাহাড় হয়ে চেপে বসেছে। পুলিশ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ৪ আগস্টের ভয়াবহ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে মোট ৯টি গুরুতর মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এর মধ্যে বহুল আলোচিত যুবদল নেতা সোহানুর রহমান রঞ্জু, সুমন শেখ এবং আব্দুল লতিফ হত্যা মামলাসহ মাত্র তিনটি মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে বাকি ছয়টি মামলা এখনো দীর্ঘসূত্রতার মারপ্যাঁচে পড়ে তদন্তাধীন রয়েছে, যা বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও দীর্ঘায়িত করছে এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনাকে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন করে তুলছে।

সংঘর্ষের দুই বছর অতিবাহিত হলেও সেদিন আহত হওয়া মানুষগুলোর শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা একটুও কমেনি। চিকিৎসাধীন আহতদের একটি বড় অংশ আজ চিরতরে স্থায়ী পঙ্গুত্ববরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। অনেকে নিজ পরিবারে কর্মক্ষম একমাত্র ব্যক্তি ছিলেন, অথচ অঙ্গহানি কিংবা গুরুতর আঘাতের কারণে তাঁরা এখন বিছানায় শুয়ে দিন কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে স্বজনহারা পরিবারগুলোর মাঝে এখনও প্রতিদিন চলছে কান্নার রোল। মা হারিয়েছে তাঁর আদরের সন্তানকে, বোন হারিয়েছে ভাইকে, আর স্ত্রী হারিয়েছে তাঁর একমাত্র উপার্জক্ষম জীবনসঙ্গীকে। শহীদ পরিবারের সদস্যরা বুকফাটা কান্না নিয়ে একটাই আকুতি জানিয়ে আসছেন—যাতে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। অপরাধীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত না হলে শহীদদের আত্মা শান্তি পাবে না এবং ভবিষ্যতে কেউ এমন বর্বরতা চালানোর সাহস পাবে না বলে মনে করেন তারা।

এদিকে বিচারহীনতার এই দীর্ঘ অপেক্ষার মাঝেই শহীদদের স্মরণে এবং তাদের রুহের মাগফেরাত কামনায় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। সম্প্রতি ১৪ পুলিশ সদস্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এনায়েতপুর থানায় নিহতদের স্মরণে এক বিশেষ মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। এনায়েতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে জানান যে, বেলকুচি সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. শহিদুল হাসান ওই মাহফিলে উপস্থিত থেকে শহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করেছেন। অন্যদিকে, সরকারি গেজেটভুক্ত ১৩ শহীদকে যথাযথ মর্যাদায় ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন যে, বাজার স্টেশন স্বাধীনতা স্কয়ারের শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ, জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে বিশেষ আলোচনা সভা, শহীদ স্বজনদের সংবর্ধনা প্রদান, ঐতিহাসিক চিত্র প্রদর্শনী এবং শহীদদের মাগফেরাত কামনায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। এই স্মরণানুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এমপির। তবে প্রশাসনের এসব আনুষ্ঠানিকতা ও স্মরণসভার বাইরেও শহীদ পরিবারগুলোর একটাই চাওয়া—অনুষ্ঠান বা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরির চেয়ে দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের ফাঁসি বা সর্বোচ্চ সাজা কার্যকর হোক, যাতে তাদের দীর্ঘশ্বাসের অবসান ঘটে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত