প্রকাশ: ৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর বকশীবাজারে অবস্থিত সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া (আলিয়া মাদ্রাসা) মঙ্গলবার কয়েক ঘণ্টা ধরে উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের পর সন্ধ্যার দিকে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা মাদ্রাসা এলাকা ছেড়ে গেলে একমাত্র আবাসিক হল আল্লামা কাশগরী (রহ.) হলে প্রবেশ করেন ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা। পরে হলের একাধিক কক্ষে ভাঙচুর, সাধারণ শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়া এবং হলের ফটকে তালা লাগানোর ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে দিনভর বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যেই এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। প্রত্যক্ষদর্শী, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, দুপুরের দিকে আলিয়া মাদ্রাসা ক্যাম্পাসে উত্তেজনা শুরু হয়। শুরুতে দুই পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হলেও তা দ্রুত ধাক্কাধাক্কি এবং পরে সংঘর্ষে রূপ নেয়। কয়েক ঘণ্টা ধরে বিরতিহীনভাবে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং হামলার ঘটনা ঘটে। এতে ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়েন।
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা মাদ্রাসা এলাকা ছেড়ে গেলে যুবদলের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব রবিউল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বে ছাত্রদল ও যুবদলের কয়েকশ নেতা-কর্মী আল্লামা কাশগরী (রহ.) হলে প্রবেশ করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হলে প্রবেশের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ছাত্রশিবিরের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে দাবি করা কয়েকটি কক্ষে ভাঙচুর চালানো হয়। এ সময় হলের ভেতরে থাকা সাধারণ শিক্ষার্থীদের বের হয়ে যেতে বলা হয়। পরে সবাই বেরিয়ে গেলে হলের প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।
হলের ফটকে তালা লাগানোর সময় উপস্থিত থাকা আলিয়া মাদ্রাসার ফাজিল প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা মো. ইব্রাহীম দাবি করেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থেই সাময়িকভাবে হল বন্ধ রাখা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরবর্তী সময়ে হল আবার খুলে দেওয়া হবে।
সংঘর্ষ চলাকালে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ওবায়দুল হকও হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কয়েকজন উত্তেজিত ব্যক্তি তাঁকে মারধর করেন। তবে এ ঘটনায় তাঁর শারীরিক অবস্থার বিষয়ে বিস্তারিত কোনো সরকারি তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
সংঘর্ষে উভয় পক্ষের বহু নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো দাবি করেছে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখার প্রচার ও মিডিয়া সম্পাদক দাউদ খান জানান, তাঁদের অন্তত ২৫ জন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ফুয়াদ নামের এক কর্মীর অবস্থা গুরুতর। তাঁর মাথায় একাধিক সেলাই দিতে হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
অন্যদিকে ছাত্রদলের ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা শাখার নেতা সাদ চৌধুরী বলেন, সংঘর্ষে ছাত্রদল ও যুবদলের ৩০ জনের বেশি নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর বলে দাবি করেন তিনি। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার জন্য দুই সংগঠনই একে অপরকে দায়ী করেছে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের আলিয়া মাদ্রাসা শাখার সভাপতি আবদুল আলিম অভিযোগ করেন, দুপুরের দিকে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা হলে প্রবেশ করে শিবিরের কর্মীদের মারধর করেন এবং কয়েকটি কক্ষে তালা লাগিয়ে দেন। এর প্রতিবাদ করতে গেলে সংঘর্ষ শুরু হয় বলে তাঁর দাবি।
অন্যদিকে ছাত্রদল নেতা সাদ চৌধুরীর বক্তব্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ছাত্রশিবির হলের বেশ কয়েকটি কক্ষ দখল করে রেখেছিল। এমনকি বহিরাগতদেরও সেখানে অবস্থান করানো হচ্ছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। মঙ্গলবার ছাত্রদলের একটি কক্ষে তালা লাগানো হলে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে গিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে বলে তাঁর দাবি।
বিকেলের দিকে সংঘর্ষ কিছু সময়ের জন্য থেমে গেলেও পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় দফায় প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী দুই পক্ষের মধ্যে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলে। এ সময় ক্যাম্পাসসংলগ্ন সড়কে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। সংঘর্ষের সময় বেশ কয়েকজনকে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনাও দেখা যায়। এতে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সংঘর্ষের সময় পুলিশ দুই পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নিলেও শুরুতে সদস্যসংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্যাম্পাসে উত্তেজনা বিরাজ করছিল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে ছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ছে। বিশেষ করে আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ, সাংগঠনিক কার্যক্রম এবং রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন সহিংসতা শুধু শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত করে না, সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ক্যাম্পাসে স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোরও সংযম প্রদর্শন এবং সংলাপের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় এমন সংঘর্ষ ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে।
ঘটনার পর মাদ্রাসা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা বা আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই এখন সবার নজর।