গাফিলতিতে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী: রিজভী

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৫ বার

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সরকারি দায়িত্ব পালনে গাফিলতি কিংবা অবহেলার ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আমলাতন্ত্রের কর্মকর্তা থেকে রাজনৈতিক ব্যক্তি—দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা বা অবহেলা দেখা গেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছেন। পাশাপাশি যারা নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন, তাঁদের উৎসাহিত করা হচ্ছে জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম আরও গতিশীল করার জন্য।

শনিবার (৮ আগস্ট) সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ইয়ুথ ফোরামের আয়োজনে সেখানে রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান সম্পাদিত ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাঁচ মাসের উন্নয়নযাত্রা’ গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। একই আয়োজনে ‘আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভাও অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রুহুল কবির রিজভী সরকারের গত পাঁচ মাসের কর্মকাণ্ড, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এবং জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কথা বলেন। একই সঙ্গে সরকারের কর্মকাণ্ড তথ্য ও পরিসংখ্যানসহ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

রিজভী বলেন, একটি সরকারের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন বক্তব্য কিংবা রাজনৈতিক প্রচারের চেয়ে তথ্যভিত্তিক দলিল গুরুত্বপূর্ণ। গত পাঁচ মাসে সরকার কী করেছে, কোন উদ্যোগ নিয়েছে এবং কতটা অগ্রগতি হয়েছে—এসব বিষয় এক জায়গায় সুসংগঠিতভাবে তুলে ধরলে ভবিষ্যতে সেটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সরকারি কাজে জবাবদিহির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গাফিলতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন না। তাঁর দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আমলাতন্ত্রের কর্মকর্তা কিংবা রাজনৈতিক অঙ্গনের কেউ হলেও দায়িত্বে অবহেলা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ভালো কাজের স্বীকৃতি এবং উৎসাহ দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

রিজভীর বক্তব্যে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা ও জনসেবামূলক কয়েকটি কর্মসূচির কথাও উঠে আসে। বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাল পুনঃখনন এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের বিভিন্ন উদ্যোগের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন তিনি।

সরকারের এসব কর্মসূচির কয়েকটি ইতোমধ্যে পরীক্ষামূলক কিংবা প্রাথমিক পর্যায়ে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। জাতীয় সংসদে গত জুনে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট কর্মসূচিতে ৩৬টি ইউনিটের ৬০ হাজার ৪৪টি পরিবারকে কার্ড দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে কৃষক কার্ডের প্রি-পাইলট কর্মসূচিতে দেশের আট বিভাগের ১০ জেলার ১১ উপজেলার বিভিন্ন কৃষি ব্লকে ২০ হাজারের বেশি কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করার তথ্য জানানো হয়। সরকার পাঁচ জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ই-হেলথ কার্ড চালুর উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে।

এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা অবশ্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বাস্তবায়ন, সেবার মান, উপকারভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতার ওপর। সরকারি কর্মসূচির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে কতটা পৌঁছাচ্ছে, সেটিই জনকল্যাণমূলক নীতির বাস্তব সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি হয়ে উঠবে।

রিজভী বলেন, নির্বাচনের আগে তারেক রহমান যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সরকার গঠনের পর সেগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করছেন তিনি। বিভিন্ন এলাকা ও কর্মসূচি পরিদর্শনের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছেন প্রধানমন্ত্রী বলেও দাবি করেন তিনি।

বিএনপির এই নেতা মনে করেন, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ যথেষ্ট নয়; বাস্তবায়ন পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি জরুরি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী সেই জায়গাতেই বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। কোনো কাজে অবহেলা দেখা দিলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়নে কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।

আলোচনায় বই এবং জ্ঞানচর্চার গুরুত্ব নিয়েও দীর্ঘ বক্তব্য দেন রুহুল কবির রিজভী। তাঁর মতে, মানবসভ্যতার অগ্রগতির পেছনে বইয়ের ভূমিকা অপরিসীম। বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার, তত্ত্ব এবং গবেষণা লিখিত আকারে সংরক্ষিত হয়েছে বলেই পরবর্তী প্রজন্ম সেগুলো জানতে পেরেছে। পুরোনো জ্ঞানের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন আবিষ্কার ও প্রযুক্তি তৈরি হয়েছে।

তিনি বইকে মানুষের মনের জগতের ‘পাসপোর্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর ভাষায়, মানুষ বই না পড়লে কিংবা জ্ঞান অর্জনের সুযোগ থেকে দূরে থাকলে মনের জগত সংকুচিত হয়ে পড়ে। শিক্ষা এবং জ্ঞানচর্চা মানুষকে নিজের চারপাশের পৃথিবী আরও গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে।

এই প্রেক্ষাপটেই ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাঁচ মাসের উন্নয়নযাত্রা’ বইটির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন রিজভী। তাঁর মতে, সরকারের কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন কর্মসূচির তথ্য একত্রে সংরক্ষিত হলে সাধারণ মানুষ সেগুলো যাচাই ও মূল্যায়নের সুযোগ পাবে।

সরকারবিরোধী সমালোচনা এবং রাজনৈতিক প্রচারের প্রসঙ্গও আসে তাঁর বক্তব্যে। রিজভী অভিযোগ করেন, সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহল থেকে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে। তথ্য-উপাত্ত এবং পরিসংখ্যানসমৃদ্ধ প্রকাশনা সেই প্রচারের জবাব দেওয়ার একটি মাধ্যম হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

তবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সমালোচনা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। ফলে কোন বক্তব্য অপপ্রচার এবং কোনটি নীতিগত সমালোচনা—সেটি নির্ধারণে যাচাইযোগ্য তথ্য, সরকারি নথি এবং বাস্তব ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে ক্ষমতাসীনদের উন্নয়ন ও সাফল্যের দাবিও স্বাধীনভাবে যাচাইয়ের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

সরকারের পাঁচ মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বইটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন নতুন সরকারের বিভিন্ন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক ও জনপরিসরে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি সহায়তা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য আর্থিক সুবিধা কতটা বিস্তৃত করা সম্ভব হবে, সেটি নিয়ে আগ্রহ রয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি কৃষক ও স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত কার্ডভিত্তিক উদ্যোগগুলোও সরকারের বৃহত্তর সামাজিক সুরক্ষা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য প্রত্যক্ষ সুবিধা তৈরি হতে পারে। বিপরীতে উপকারভোগী নির্বাচন, প্রশাসনিক সক্ষমতা কিংবা স্বচ্ছতার ঘাটতি দেখা দিলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।

রিজভীর বক্তব্যে সরকারের সামনে থাকা এই বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের চেয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রধানমন্ত্রীর তদারকির বিষয়টিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর দাবি, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার জনকল্যাণ, জনস্বার্থ এবং সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।

অনুষ্ঠানে রোটারিয়ান নাজমুল হাসানের সভাপতিত্বে এবং বাংলাদেশ ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি সাইদুর রহমানের সঞ্চালনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান এবং ছাত্রদলের সহসভাপতি তৌহিদ আউয়ালসহ অন্যরা ছিলেন।

সরকারের পাঁচ মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত এই গ্রন্থ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলিল নাকি বৃহত্তর তথ্যভিত্তিক রেফারেন্স হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে, সেটি নির্ভর করবে এতে উপস্থাপিত তথ্যের নির্ভুলতা এবং যাচাইযোগ্যতার ওপর। তবে রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—সরকার তার বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের পাশাপাশি প্রশাসনিক জবাবদিহিকেও নিজেদের শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত