বরাদ্দ জটে আটকে আছে বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
  • ৯ বার
বরাদ্দ জটে আটকে আছে বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ
প্রকাশ: ১০ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কুড়িগ্রামের উলিপুর পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও চরম পরিবেশগত বিপর্যয়ের অবসান ঘটাতে গৃহীত সাড়ে চার কোটি টাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ প্রকল্প দীর্ঘ ছয় বছর ধরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বরাদ্দ জটে থমকে রয়েছে। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কাজের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় উলিপুর পৌরসভার নাওডাঙ্গা বিল এলাকাটি এখন স্থায়ী বর্জ্যের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে খোলা আকাশের নিচে ময়লার স্তূপ ফেলে রাখায় সৃষ্ট তীব্র দুর্গন্ধ, মশা-মাছির উপদ্রব এবং দূষিত তরল বর্জ্যের কারণে আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। স্থানীয় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও পথচারীদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এই অসহনীয় পরিবেশের কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সরেজমিন নাওডাঙ্গা বিল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি পরিবেশবান্ধব বর্জ্য শোধনাগার গড়ে তোলার কথা ছিল, সেখানে কেবল পড়ে থাকা একটি ভিত্তিপ্রস্তরই প্রকল্পের ম্রিয়মাণ অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। তার ঠিক পাশেই প্রতিদিন পৌরসভার শত শত টন বর্জ্য এনে স্তূপাকার করে ফেলা হচ্ছে। বর্ষার মৌসুমে বৃষ্টির পানির সঙ্গে এই পচা ময়লার বিষাক্ত তরল অংশ মিশে গিয়ে সংলগ্ন বিশাল বিলের পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়ে একদিকে যেমন দেশীয় প্রজাতির মাছের গণমৃত্যু ঘটছে, অন্যদিকে এলাকার উর্বর জমিতে ঐতিহ্যবাহী ধান চাষও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। আশপাশের পরিবেশ এতই দূষিত হয়ে পড়েছে যে, স্থানীয়দের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে বসবাস করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জনকল্যাণমূলক এই প্রকল্পের জন্য নিজেদের অমূল্য জমি বিক্রি করে আজ তারা চরম অনুতাপ ও অভিশাপের জীবন পার করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিক ও এলাকার সাবেক কমিশনার রফিকুল ইসলাম আক্ষেপ করে জানান যে, সম্পূর্ণ জনস্বার্থের কথা চিন্তা করেই তারা জমি দিয়েছিলেন, অথচ সঠিক তদারকি ও বাস্তবায়নের অভাবে আজ সেখানে বর্জ্যের ভাগাড় তৈরি হয়ে চার গ্রামের মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। এলাকার বাসিন্দা নজরুল মাস্টার, তৈয়বুর রহমান এবং নুর হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে, অতীতে এই সুব্দল প্রায় কুড়ি একরজুড়ে বিস্তৃত নাওডাঙ্গা বিলে সমবায় ভিত্তিতে মাছ ও আমন ধানের চাষ করে শত শত মানুষের কর্মসংস্থান ও লাখ লাখ টাকা আয় হতো। অথচ আজ সেই প্রাণবন্ত বিলটি বর্জ্যের বিষাক্ত প্রভাবে সম্পূর্ণ অকেজো ও মৃতপ্রায় এক জলাশয়ে রূপ নিয়েছে। স্থানীয় বাকরেরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিফন মিয়া জানিয়েছে, প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাতায়াতের সময় তীব্র দুর্গন্ধের কারণে নাক চেপে চলাচল করতে হয়, যা কোমলমতি শিশুদের স্বাস্থ্য ও মানসিক বিকাশের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, দেশের ২৩টি পৌরসভার পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পের আওতায় ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে ৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০২১ সালে উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কুড়িগ্রামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এম আদিল এন্টারপ্রাইজ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কার্যাদেশ লাভ করে। চুক্তি অনুযায়ী ২০২২ সালের মধ্যেই প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে প্রকল্প এলাকায় জমি নির্বাচন পরিবর্তনের কারণে প্রকৌশলী নকশায় পরিবর্তন আনতে হয়। পরবর্তীতে সেই সংশোধিত নকশা অনুযায়ী অতিরিক্ত আর্থিক বরাদ্দের অনুমোদন না পাওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের প্রাপ্য বিল তুলতে ব্যর্থ হয় এবং একপর্যায়ে নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়।
উলিপুর পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম জানিয়েছেন যে, প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণের মূল কাজটি পৌর কর্তৃপক্ষ সফলভাবে সম্পন্ন করেছে এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করার কথা রয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের। তবে যথাসময়ে কাজ সমাপ্ত না হওয়ার কারণে বাধ্য হয়ে পৌর কর্তৃপক্ষকে ওই নির্দিষ্ট এলাকাতেই ময়লা-আবর্জনা ফেলতে হচ্ছে, যা প্রতিনিয়ত পরিবেশের অবনতি ঘটাচ্ছে এবং জনদুর্ভোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই অচলাবস্থা নিরসন এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর একাধিকবার দাপ্তরিক চিঠি পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম জানান যে, প্রাথমিকভাবে একটি নির্দিষ্ট পতিত জমির কথা মাথায় রেখে প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন করা হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে নিচু জমিতে স্থান পরিবর্তন করায় পুরো নকশাই নতুন করে সংশোধন করতে হয়। সংশোধিত প্রাক্কলন অনুযায়ী অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন না আসায় ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। মেসার্স আদিল এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি আমিনুর রহমান বলেছেন যে, প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত বরাদ্দের সরকারি অনুমোদন পাওয়া মাত্রই তারা পুনরায় পুরোদমে নির্মাণকাজ শুরু করতে প্রস্তুত রয়েছেন। কুড়িগ্রাম জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হারুনুর রশিদও একই কথা জানিয়ে বলেছেন যে, জমির সাইট পরিবর্তন, বিদ্যুতের খুঁটি অপসারণের জটিলতা এবং সংশোধিত ব্যয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন ঝুলিয়ে থাকার কারণেই মূলত কাজটিতে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হয়েছে। তবে ইতোমধ্যে অতিরিক্ত বরাদ্দের জন্য অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে বিশেষ আবেদন পাঠানো হয়েছে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক এটিএম আরিফ আশাবাদ ব্যক্ত করে জানিয়েছেন যে, নকশা পরিবর্তনের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ইতোমধ্যে মিলেছে এবং খুব দ্রুতই আটকে থাকা অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যাবে। অর্থপ্রাপ্তি নিশ্চিত হলেই বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণ প্রকল্পের বাকি কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে পৌরবাসীকে এই স্থায়ী দুর্ভোগ থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত