প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। এ বছর মাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাশের হার দাঁড়িয়েছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে। গত ১৯ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন পাশের হার। অর্থাৎ ২০০৭ সালের পর এবারই সবচেয়ে কম হারে শিক্ষার্থীরা এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।
গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাশের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে এবার পাশের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ পয়েন্ট। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এবার এক লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল এক লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে সর্বোচ্চ ফল অর্জনকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন।
সোমবার (১০ আগস্ট) সকাল ১০টায় দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল একযোগে প্রকাশ করা হয়। রাজধানীর সচিবালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন ফলাফলের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
ফলাফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইট এবং মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে ফলাফল জানতে পারছেন। বহুদিনের অপেক্ষার পর ফল হাতে পেয়ে যারা সফল হয়েছে, তাদের মধ্যে যেমন স্বস্তি এসেছে, তেমনি কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকের মধ্যেই হতাশা তৈরি হয়েছে।
চলতি বছরের ফলাফলের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো দীর্ঘ সময়ের তুলনায় পাশের হার কমে যাওয়া। ২০০৭ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাশের হার ছিল ৫৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এরপর বিভিন্ন বছরে পাশের হার কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে। বিশেষ করে করোনাকালীন পরিস্থিতিতে পরীক্ষার ধরন ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তনের কারণে ২০২১ সালে পাশের হার রেকর্ড ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছিল।
এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাশের হারও ধীরে ধীরে আগের ধারায় ফিরতে শুরু করে। তবে এবারের ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ পাশের হার গত প্রায় দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে নিচে নেমে এসেছে। এর ফলে ফলাফলের মান, মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর একটি বড় অংশ এবার উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
বোর্ডভিত্তিক ফলাফলেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে গড় পাশের হার ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন দাখিল পরীক্ষায় পাশের হার ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি ও ভোকেশনাল পরীক্ষায় পাশের হার ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশ।
ফলাফলে এবারও ছাত্রীদের সাফল্য তুলনামূলকভাবে বেশি। ছাত্রদের পাশের হার যেখানে ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ, সেখানে ছাত্রীদের পাশের হার ৬৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ পাশের হারে ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীরা ৮ দশমিক ৮২ শতাংশ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে।
এবার ৯ লাখ ১৭ হাজার ৬৯৪ জন ছাত্র এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৯৩৮ জন। অন্যদিকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯ লাখ ১১ হাজার ৭৯১ জন ছাত্রীর মধ্যে পাস করেছে ৬ লাখ ৭ হাজার ৯৩৯ জন।
জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও মেয়েদের এগিয়ে থাকার চিত্র পাওয়া গেছে। এবার পূর্ণাঙ্গ জিপিএ-৫ পেয়েছে মোট এক লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ছাত্রী ৬৩ হাজার ৮৯৬ জন এবং ছাত্র ৫২ হাজার ৭৮০ জন। অর্থাৎ জিপিএ-৫ অর্জনেও মেয়েরা সংখ্যাগতভাবে ছেলেদের ছাড়িয়ে গেছে।
তবে এবারের ফলাফলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো কেন পাশের হার এতটা কমে গেল। শুধু একটি কারণ দিয়ে এর ব্যাখ্যা করা কঠিন। পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের কাঠামো, মূল্যায়নের কঠোরতা, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির মান, দীর্ঘদিনের শিক্ষাগত ঘাটতি এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার বাস্তব পরিস্থিতি—সবগুলো বিষয়ই ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিন স্বাভাবিক শ্রেণিকক্ষের বাইরে থাকতে হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা স্বাভাবিক হলেও সেই সময়ের শিক্ষাগত ঘাটতি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন ছিল। এবারের ফলাফলের নিম্নমুখী প্রবণতা সেই প্রশ্নকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
তবে পাশের হার কমেছে বলেই পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ব্যর্থ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একটি পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও সম্ভাবনার সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। একই সঙ্গে পাশের হার অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে কোন পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা বেশি সমস্যায় পড়েছে, কোন বিষয়ে অকৃতকার্যের হার বেশি এবং অঞ্চল বা প্রতিষ্ঠানভেদে ফলাফলের পার্থক্য কোথায়—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করাও জরুরি।
এবারের ফল প্রকাশের সময় নিয়েও শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা করতে হয়েছে। এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয়েছিল গত ২১ এপ্রিল। এসএসসির তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হয় ২০ মে। দাখিল এবং এসএসসি ও ভোকেশনালের তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হয় ২৪ মে। সাধারণত তত্ত্বীয় পরীক্ষা শেষ হওয়ার দুই মাসের মধ্যে ফল প্রকাশের প্রচলিত রেওয়াজ থাকলেও এবার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
অবশেষে সোমবার দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ড একযোগে ফল প্রকাশ করে। ফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শুরু হয় ফল জানার ব্যস্ততা। কারও জন্য দিনটি পরিণত হয়েছে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের দিনে, আবার কারও জন্য এসেছে নতুন করে পথচলার চ্যালেঞ্জ।
জিপিএ-৫ পাওয়া এক লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ শিক্ষার্থী নিঃসন্দেহে বড় একটি অর্জন করেছে। তবে গত বছরের তুলনায় এই সংখ্যা কমে যাওয়াও এবারের ফলাফলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ২০২৫ সালে যেখানে এক লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল, সেখানে এবার সেই সংখ্যা নেমে এসেছে এক লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জনে।
ফলাফলের সামগ্রিক চিত্র বলছে, এবার শুধু পাশের হারই কমেনি, সর্বোচ্চ গ্রেড অর্জনকারীর সংখ্যাও কমেছে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের ভিত্তিগত জ্ঞান শক্তিশালী করা এবং পরীক্ষার আগে কার্যকর প্রস্তুতি নিশ্চিত করার বিষয়গুলো নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
অন্যদিকে ছাত্রীদের ধারাবাহিক ভালো ফলও এবারের ফলাফলের একটি ইতিবাচক দিক। পাশের হার ও জিপিএ-৫—দুই ক্ষেত্রেই মেয়েরা এগিয়ে রয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ ও সাফল্য যে দীর্ঘদিন ধরে বাড়ছে, এবারের ফলাফলও তার ধারাবাহিকতা দেখিয়েছে।
সব মিলিয়ে চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাশের হার শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষার সামগ্রিক মান নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে। একই সঙ্গে ফলাফলে ভালো করা শিক্ষার্থীদের সাফল্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি যারা অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের জন্য পুনরায় শেখার ও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ নিশ্চিত করাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি ধাপ মাত্র। যারা সফল হয়েছে, তাদের সামনে উচ্চশিক্ষার নতুন পথ খুলেছে। আর যারা এবার কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি, তাদের জন্যও শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ থেমে যায়নি। যথাযথ সহায়তা, পুনর্মূল্যায়ন এবং পরবর্তী সুযোগের মাধ্যমে তারাও নতুন করে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে। এবারের ফলাফল তাই একই সঙ্গে সাফল্যের উদ্যাপন এবং শিক্ষা ব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।