ইতিহাসের উষ্ণতম জুন-জুলাই পেরোল ইউরোপ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬
  • ৮ বার
ইতিহাসের উষ্ণতম জুন-জুলাই পেরোল ইউরোপ
প্রকাশ:  ১০ আগস্ট  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব এখন অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বিপদের সংকেত দিয়ে চলেছে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এর আগে কখনো এত দীর্ঘস্থায়ী ও প্রাণঘাতী গরমের মুখোমুখি হতে হয়নি বিশ্ববাসীকে। গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্রাতিরিক্ত নির্গমন এবং বায়ুমণ্ডলের লাগাতার উষ্ণায়নের ফলে গোটা পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থা আজ এক ভয়াবহ সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। এর সবচেয়ে বড় ও মারাত্মক শিকার হয়েছে বিশ্বের মধ্যে অন্যতম দ্রুতগতিতে উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ ইউরোপ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের মর্যাদাপূর্ণ জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের সদ্য প্রকাশিত এক চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, তীব্র তাপপ্রবাহ, নজিরবিহীন খরা এবং প্রলয়ঙ্করী দাবানলের করাল গ্রাসে পড়ে অঞ্চলটি তার ইতিহাসের উষ্ণতম জুন ও জুলাই মাস পার করে এসেছে। গ্রীষ্মের প্রথম এই দুই মাসে গোটা ইউরোপ যেন এক জীবন্ত উনুনে পরিণত হয়েছিল, যা সাধারণ মানুষের জনজীবনকে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিসের (সিসিএস) সুনির্দিষ্ট তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, চলতি বছরের জুন থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত পশ্চিম ইউরোপের গড় তাপমাত্রা অতীতের সব রেকর্ডকে পেছনে ফেলে পৌঁছে গিয়েছিল ২১ দশমিক ৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। এর আগে ইউরোপ মহাদেশে ২০২২ সালে গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড হয়েছিল, যা এবারের এই নতুন ও ভয়ংকর রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। কোপার্নিকাস কর্তৃপক্ষের মতে, এ বছরের গ্রীষ্মে দীর্ঘ সময় ধরে একটানা অস্বাভাবিক ও অসহনীয় গরম আবহাওয়া বিরাজ করার ফলেই তাপমাত্রার পারদ এভাবে সর্বকালের সর্বোচ্চ উচ্চতায় গিয়ে ঠেকেছে। পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যেমন ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, ইতালি কিংবা যুক্তরাজ্যজুড়ে যে চরম শুষ্ক ও দাবদাহপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা মানব ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্ট জলবায়ু বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা গভীর শঙ্কা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, পরিস্থিতি এখানেই শেষ নয়, বরং এই চরম আবহাওয়ার কারণে সামনে আরও ভয়ংকর সব তাপপ্রবাহ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে পারে ইউরোপ।
এই নজিরবিহীন উষ্ণতার পেছনে প্রাকৃতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনোর একটি অত্যন্ত বড় এবং প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশিষ্ট জলবায়ুবিজ্ঞানীরা। ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্টসের (ইসিএমডব্লিউএফ) প্রখ্যাত জলবায়ুবিজ্ঞানী সামান্থা বার্গেস এই পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে দিনের পর দিন চরম তাপপ্রবাহকে আরও মারাত্মক ও প্রাণঘাতী করে তুলছে, বর্তমান ইউরোপীয় পরিস্থিতি তার একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও বেদনাদায়ক উদাহরণ। একই সঙ্গে তীব্র তাপপ্রবাহ এবং দীর্ঘমেয়াদী খরা একে অপরকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তুলছে, যার ফলে সামগ্রিক পরিবেশগত সংকট বহুগুণ বেড়ে গেছে। কোপার্নিকাস সংস্থার পক্ষ থেকে আরও সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, পশ্চিম ইউরোপে সর্বশেষ ২০২২ সালের জুলাই মাসে যে ভয়ংকর ও সর্বগ্রাসী খরা দেখা দিয়েছিল, বর্তমান মাটির আর্দ্রতার মাত্রা তার চাইতেও অনেক বেশি নিচে নেমে গেছে। মাটির নিচের আর্দ্রতা বিপজ্জনক হারে কমে যাওয়ার অর্থ হলো সামনের দিনগুলোতে ওই অঞ্চলে খনার প্রকোপ আরও দীর্ঘস্থায়ী ও সর্বনাশা রূপ নিতে পারে।
তীব্র খরা এবং চরম দাবদাহের কারণে ইউরোপের প্রধান প্রধান নদীগুলোর পানির প্রবাহ মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা ওই অঞ্চলের অর্থনীতি, পরিবহন এবং কৃষিকাজের ওপর গভীর কালো ছায়া ফেলেছে। বিশেষ করে ফ্রান্সের বিখ্যাত সেইন নদী, জার্মানির অর্থনৈতিক লাইফলাইনখ্যাত রাইন নদী এবং সমগ্র ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দানিউব নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। নদীগুলোর পানিপ্রবাহ অস্বাভাবিক রকম কমে যাওয়ার ফলে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ব্যবস্থা প্রায় পঙ্গু হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের অভ্যন্তরের বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন, কৃষিজমির সেচব্যবস্থা এবং সর্বপরি জ্বালানি উৎপাদন কার্যক্রমে। নদীমাতৃক এই অঞ্চলগুলোতে পানির এমন তীব্র সংকট মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের এক ভয়াল রূপ ফুটিয়ে তুলেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই প্রচণ্ড গরম ও বৃষ্টিহীন শুষ্ক আবহাওয়া দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার জন্য এক আদর্শ ও অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যা ইউরোপের অগ্নিনির্বাপক বাহিনীর সদস্যদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
ইতিমধ্যে ফ্রান্স ও স্পেনসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ সাম্প্রতিককালের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ও সর্বনাশা দাবানলের মুখোমুখি হয়েছে। দাবানলের লেলিহান শিখা দ্রুত গ্রাস করে নিচ্ছে একের পর এক বিশাল বনাঞ্চল এবং লোকালয়ের দিকে ধেয়ে আসছে আগুনের ভয়াল স্রোত। শুধু ইউরোপই নয়, এর পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো এবং পার্শ্ববর্তী কানাডার বিশাল বনাঞ্চলেও স্মরণকালের সবচেয়ে বড় সব দাবানলের ঘটনা ঘটেছে। ইউরোপের আকাশ আজ দাবানলের ধোঁয়া আর ছাইয়ে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। কোপার্নিকাস জানিয়েছে যে, ইউরোপের আশপাশের বিস্তীর্ণ সমুদ্রাঞ্চলে ঘটে চলা সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ এবং ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনোর যৌথ প্রভাবে জুলাই মাসে টানা দ্বিতীয় মাসের মতো বিশ্বের সমস্ত মহাসাগরগুলোর গড় তাপমাত্রা রেকর্ডের নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত জুলাই মাসে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা ছিল ২০ দশমিক ৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা বিগত ২০২৩ সালের সমস্ত আগের রেকর্ডকে পেছনে ফেলে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
কোপার্নিকাসের পরিচালক এবং বিশিষ্ট জলবায়ুবিজ্ঞানী কার্লো বুয়োনতেম্পো সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের বিস্তীর্ণ অংশে যে অস্বাভাবিক উষ্ণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তার পেছনে মূল চালিকা শক্তি হলো ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনো নামক প্রাকৃতিক জলবায়ুচক্র। এল নিনো হলো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের জলবায়ুর একটি উষ্ণ পর্যায়, যা সাময়িকভাবে ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ভয়াবহ খরা, আকস্মিক বন্যা এবং নানা ধরনের চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের সৃষ্টি হয়। এর সঙ্গে মানবসভ্যতার মাত্রাতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলে পুঞ্জীভূত হওয়া গ্রিনহাউস গ্যাস পৃথিবী গ্রহটিকে যে স্থায়ী উষ্ণতার দিকে ঠেলে দিয়েছে, এল নিনো তাতে আরও অতিরিক্ত ও অসহনীয় তাপ যোগ করছে। সাধারণত এল নিনো চক্রটি বছরের একদম শেষভাগে এসে তার সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছায় এবং এর ফলে সমুদ্রে জমে থাকা অতিরিক্ত তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
বিজ্ঞানীরা গভীরভাবে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে, এল নিনোর এই শক্তিশালী প্রভাবে চলতি বছরের শেষ দিক কিংবা আগামী ২০২৭ সালের শুরুর দিকে পৃথিবীর বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রার সমস্ত পুরোনো রেকর্ড ভেঙে চুরমার হয়ে যেতে পারে। কোপার্নিকাসের তথ্য বলছে, বিশ্বজুড়ে গত জুলাই মাসটি ছিল মানব ইতিহাসের রেকর্ডের দ্বিতীয় উষ্ণতম জুলাই মাস, যেখানে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি বায়ুর গড় তাপমাত্রা প্রাক্‌-শিল্পযুগের (১৮৫০-১৯০০ সাল) তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। কার্লো বুয়োনতেম্পো অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে, মানব ইতিহাসের বিগত ১১ বছরের মধ্যেই পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ বছরগুলো রেকর্ড করা হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান মানবসভ্যতার জীবদ্দশায় বা সম্ভবত পুরো মানবজাতির ইতিহাসেই এর আগে কখনো এত উষ্ণ ও রৌদ্রোজ্জ্বল জলবায়ু প্রত্যক্ষ করা যায়নি। এই ক্রমবর্ধমান উষ্ণায়নের একমাত্র এবং প্রধান কারণ হলো আধুনিক সভ্যতার অপরিকল্পিত বিকাশ এবং বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের ক্রমবর্ধমান বিষাক্ত উপস্থিতি।
শিল্পায়ন ও মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের ফলে উৎপাদিত মানবসৃষ্ট কার্বন নিঃসরণের ফলে যে অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন হয়, তার অর্ধেকেরও বেশি বা সিংহভাগই শোষণ করে নেয় পৃথিবীর বিশাল সব মহাসাগর। জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষায় এবং অতিরিক্ত তাপ শুষে নিয়ে পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে সমুদ্রগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অনন্য। তবে মহাসাগরগুলো দিনের পর দিন যেভাবে অতিরিক্ত তাপ শোষণ করে নিজেদের উষ্ণ করে তুলছে, তার সুদূরপ্রসারী ও ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব এখন বিশ্ববাসীর চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সমুদ্রের পানি অতিরিক্ত মাত্রায় গরম হয়ে যাওয়ার কারণে প্রমত্ত সব সামুদ্রিক ঝড়, সুপার সাইক্লোন এবং প্রলয়ঙ্করী অতিবৃষ্টির তীব্রতা ও ঘনত্ব ভয়ংকরভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পাশাপাশি সামুদ্রিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক প্রবালপ্রাচীর বা কোরাল রিফগুলোর ব্যাপক মাত্রায় ক্ষয় ও ভয়াবহ বিবর্ণতা বা কোরাল ব্লিচিং দেখা দিচ্ছে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কোপার্নিকাস সংস্থা মহাকাশ থেকে উপগ্রহ এবং ভূপৃষ্ঠের স্থলভাগ ও সমুদ্রের তলদেশ থেকে সংগৃহীত কোটি কোটি নির্ভরযোগ্য আবহাওয়া-সংক্রান্ত তথ্য ও উপাত্ত নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করে এই আশঙ্কাজনক চিত্র তুলে ধরেছে। ১৯৪০ সাল থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘদিনের জলবায়ু তথ্যের বৈজ্ঞানিক ভান্ডার পর্যালোচনা করে বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, এখনই যদি বিশ্বনেতৃত্ব কার্বন নিঃসরণ কমানোর বিষয়ে কঠোর ও তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে আগামী দিনে মানবসভ্যতাকে আরও এক অপূরণীয় ও সুদূরপ্রসারী প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত