প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী বা গণনাকারী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই নিয়োগ বিতর্ককে কেন্দ্র করে স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও চাকরিপ্রার্থীরা ফুঁসে উঠেছেন এবং গত বুধবার দুপুরে লালপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় ঘেরাও করে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। উত্তপ্ত পরিস্থিতির একপর্যায়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া একাধিক সাংবাদিকের ওপর হামলা চালানো হয়, যা নিয়ে পুরো জেলাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্বচ্ছতা ও মেধার মূল্যায়ন না করে একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অস্বচ্ছ উপায়ে গণনাকারী নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, যা থেকেই মূলত এই তীব্র ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে।
ঘটনার দিন বুধবার দুপুর গড়ালে নাটোরের লালপুর উপজেলা চত্বর এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। শত শত বিক্ষুব্ধ মানুষ ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে এসে জড়ো হতে থাকেন। এ সময় তারা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলেন। বিক্ষুব্ধ জনতা সরাসরি উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেন বা নিয়োগ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন। তাদের দাবি, যোগ্য ও বঞ্চিত তরুণ-তরুণীদের বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু পন্থায় তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা স্লোগানে স্লোগানে পুরো চত্বর প্রকম্পিত করে তোলেন এবং অবিলম্বে এই বিতর্কিত নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে পুনরায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে গণনাকারী নিয়োগ সম্পন্ন করার জোর দাবি জানান।

উত্তপ্ত এই পরিস্থিতির মধ্যে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত ও ন্যাক্কারজনক হামলার শিকার হন বেশ কয়েকজন সংবাদকর্মী। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সংবাদ সংগ্রহকারী ও ভিডিও ধারণকারী গণমাধ্যমকর্মীরা যখন চলমান পরিস্থিতির দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করছিলেন, ঠিক তখনই বিক্ষোভকারীদের একটি উশৃঙ্খল অংশ তাদের ওপর চড়াও হয়। এনটিভি অনলাইনের লালপুর-বাগাতিপাড়া প্রতিনিধি সজিবুল ইসলাম, দৈনিক মানবজমিনের লালপুর উপজেলা প্রতিনিধি রশিদুল ইসলাম এবং নেক্সাস টিভির প্রতিনিধি শরিফুল ইসলামসহ কয়েকজন সাংবাদিক এই হামলার শিকার হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, হামলাকারীরা অত্যন্ত চড়াও হয়ে সংবাদকর্মীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায় এবং তাদের পেশাগত কাজে ব্যবহৃত মোবাইল ফোনগুলো জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়। পরবর্তীতে মোবাইল ফোনে ধারণ করা সমস্ত ভিডিও ফুটেজ ও ছবিজাগতিক প্রমাণসমূহ মুছে দেওয়া হয়। এই বর্বরোচিত ঘটনার পরপরই স্থানীয় গণমাধ্যম মহলে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।
ঘটনার শিকার এনটিভি অনলাইনের প্রতিনিধি সজিবুল হৃদয় অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সাংবাদিকরা সবসময় সমাজের সত্য ঘটনা তুলে ধরতে নিরলসভাবে কাজ করে যান। কিন্তু সম্পূর্ণ পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাদের ওপর এমন নৃশংস হামলা চালানো অত্যন্ত নিন্দনীয়, অনভিপ্রেত ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি চরম হস্তক্ষেপ। তিনি অবিলম্বে এই ন্যক্কারজনক ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। একই সুরে দৈনিক মানবজমিনের প্রতিনিধি রাশেদুল ইসলাম বলেন, সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের টার্গেট করে হামলা চালানো কোনোভাবেই একটি সুস্থ সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। জনগণের বাকস্বাধীনতা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এই ধরনের ঘটনার দ্রুত বিচার হওয়া অত্যন্ত জরুরি। তিনি দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানান।
এদিকে খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম পলাশ একদল পুলিশ ফোর্স নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতায় দীর্ঘ সময় পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয় এবং বিক্ষুব্ধ জনতা ধীরে ধীরে উপজেলা চত্বর ত্যাগ করেন। লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সক্ষম হয়েছে। বর্তমানে এলাকার সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং শান্ত রয়েছে। তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সঙ্গে জড়িতদের সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে তিনি জানান।

সামগ্রিক এই ঘটনাটি স্থানীয় রাজনীতি ও সাধারণ মানুষের মাঝে এক বিরাট প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমে ফ্যামিলি কার্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। সেই কার্ডের সঠিক সুফল নিশ্চিত করার জন্য তথ্য সংগ্রহ বা গণনার মতো প্রাথমিক কাজটি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হওয়া বাঞ্ছনীয়। কিন্তু নিয়োগের শুরুতেই যদি এমন অস্বচ্ছতা এবং স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠে, তবে তা পুরো প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতাকেই দারুণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে। স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, দ্রুত এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কাজে যাতে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বা অনিয়ম স্থান না পায়, সে বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও বেশি সতর্কতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় জনরোষ আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকরা।