২,৮২২ ভবনের পয়ঃবর্জ্য পড়ছে লেকে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৮ বার
২,৮২২ ভবনের পয়ঃবর্জ্য পড়ছে লেকে

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজধানীর গুলশান, বনানী, বারিধারা ও হাতিরঝিল এলাকার লেকগুলোতে পয়ঃবর্জ্য দূষণের বড় একটি উৎস হয়ে উঠেছে আশপাশের ভবনগুলো। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাম্প্রতিক পরিদর্শনে দেখা গেছে, লেকপাড়ের ৪ হাজার ৪০৯টি ভবনের মধ্যে ২ হাজার ৮২২টি ভবনে সেপটিক ট্যাঙ্ক নেই। একই সঙ্গে ৪ হাজার ৬৮টি ভবনে পাওয়া যায়নি সোকওয়েল। ফলে এসব ভবনের পয়ঃবর্জ্য যথাযথ ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে সরাসরি আশপাশের জলাশয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে দূষণে জর্জরিত রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ লেকগুলোকে ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

রাজউকের পরিদর্শন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, লেকপাড়ের ভবনগুলোর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে মালিকদের নিজ উদ্যোগে স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বা এসটিপি স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভবন মালিকদের বড় অংশই এই দায়িত্ব নিজেদের ওপর নিতে নারাজ। তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স, স্যুয়ারেজ বিলসহ বিভিন্ন ধরনের সরকারি কর ও ফি পরিশোধ করেন। ফলে এত বড় একটি নগর অবকাঠামোগত সমস্যা ব্যক্তিগত ভবন মালিকদের অর্থে সমাধান করা উচিত নয়।

দুই পক্ষের এই অবস্থানের মধ্যে আটকে গেছে রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লেকের দূষণ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ। একদিকে রাজউক বলছে, অনুমোদিত নকশা ও লিজের শর্ত অনুযায়ী ভবন মালিকদের নিজস্ব পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার দায়িত্ব রয়েছে। অন্যদিকে ভবন মালিকরা চাইছেন, গুলশান-বনানী-বারিধারা এলাকার জন্য সরকার ও ঢাকা ওয়াসা কেন্দ্রীয়ভাবে স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার সমাধান করুক। এর মধ্যে ঢাকা ওয়াসা নতুন একটি বড় প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে, যার মাধ্যমে এসব এলাকার পয়ঃবর্জ্য কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় নিয়ে শোধনের ব্যবস্থা করার লক্ষ্য রয়েছে।

রাজউকের সাম্প্রতিক পরিদর্শনের তথ্য পরিস্থিতির ব্যাপ্তি স্পষ্ট করেছে। গত দুই মাসে সংস্থাটি লেকপাড়ের ৪ হাজার ৪০৯টি ভবন পরিদর্শন করে। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৮৭টি ভবনে সেপটিক ট্যাঙ্ক পাওয়া গেছে। বিপরীতে ২ হাজার ৮২২টি ভবনে কোনো সেপটিক ট্যাঙ্ক ছিল না। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ৪ হাজার ৬৮টি ভবনে সোকওয়েলের অস্তিত্বও পাওয়া যায়নি। সেপটিক ট্যাঙ্ক ও সোকওয়েল না থাকলে বাসাবাড়ির পয়ঃবর্জ্য ও ব্যবহৃত পানি নিরাপদভাবে শোধন বা মাটিতে নিষ্কাশনের সুযোগ থাকে না। ফলে অপরিশোধিত বর্জ্য পাশের খাল, নালা কিংবা লেকে গিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

গুলশান, বনানী ও বারিধারার লেকগুলো রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাধার। অন্যদিকে হাতিরঝিল দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার নগর পরিকল্পনা, বিনোদন ও জলাধার ব্যবস্থাপনার একটি আলোচিত প্রকল্প। প্রায় দেড় দশক আগে হাতিরঝিল প্রকল্প বাস্তবায়নের পর এর আশপাশের পরিবেশ ও নগরজীবনে বড় পরিবর্তন এলেও লেকের পানি দূষণমুক্ত রাখার চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি কাটেনি। পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সেই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

লেকের পানি দূষিত হলে শুধু জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রাতেও এর প্রভাব পড়ে। দুর্গন্ধ, মশার বিস্তার, পানির গুণগত মানের অবনতি এবং জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব সংকটের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানির সঙ্গে বিভিন্ন উৎসের বর্জ্য লেকে মিশলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে রাজধানীর জলাধার রক্ষা এখন শুধু সৌন্দর্য বা বিনোদনের বিষয় নয়; এটি নগরবাসীর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

এই পরিস্থিতিতে লেকপাড়ের ভবন মালিকদের এসটিপি স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছে রাজউক। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট ভবন মালিক ও আবাসিক সোসাইটিগুলোর সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকও হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ভবন মালিক এসটিপি স্থাপন করেননি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

গত ৩ আগস্ট গুলশান সোসাইটি লেকপার্কে এ বিষয়ে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান, রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সভায় ভবন মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, তাঁরা নিজস্ব অর্থায়নে এসটিপি স্থাপনের উদ্যোগ নেবেন না। তাঁদের মতে, একটি ভবনে এসটিপি স্থাপনে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। একই এলাকায় অসংখ্য ভবন থাকায় প্রতিটি ভবনে আলাদা আলাদা প্লান্ট স্থাপন করলে ব্যবস্থাপনাগত জটিলতাও তৈরি হতে পারে। এর পরিবর্তে পুরো এলাকার জন্য একটি কেন্দ্রীয় স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

তবে রাজউকের অবস্থান হলো, ভবন নির্মাণের অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট লিজের শর্তে পয়ঃনিষ্কাশনের নিজস্ব ব্যবস্থা রাখার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। নকশা অনুমোদনের সময়ও এসটিপি স্থাপনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে সংস্থাটি জানিয়েছে। তাই এখন ভবন মালিকদের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করছে রাজউক।

বিষয়টি শুধু গুলশান বা বনানীর কয়েকটি ভবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে কেন্দ্রীয় পয়ঃনিষ্কাশন অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। ফলে অনেক এলাকায় ভবনভিত্তিক সেপটিক ট্যাঙ্ক, সোকওয়েল বা বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কোনো ভবনে সেই ব্যবস্থাও না থাকলে বর্জ্য শেষ পর্যন্ত উন্মুক্ত নালা কিংবা জলাশয়ে গিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

ঢাকা ওয়াসা ইতোমধ্যে দাসেরকান্দিতে পয়ঃশোধনাগার স্থাপন করেছে। গুলশান, বনানীসহ রাজধানীর কয়েকটি এলাকার পয়ঃবর্জ্য সেখানে নিয়ে গিয়ে শোধনের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু শোধনাগার থাকলেও সংশ্লিষ্ট এলাকার বর্জ্য সেখানে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় পাইপলাইন ও সংযোগ নেটওয়ার্ক পুরোপুরি তৈরি না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। এখন সেই সংযোগ নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে ঢাকা ওয়াসা।

ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, গুলশান এলাকার পয়ঃবর্জ্য কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় যুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় সংযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করা গেলে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথে যাওয়া সম্ভব হবে। তবে প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নের পরও পুরো কাজ শেষ হতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য বড় প্রকল্প সামনে থাকলেও লেকের বর্তমান দূষণ বন্ধে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা জরুরি হয়ে পড়েছে।

রাজউক চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলামও জানিয়েছেন, ভবন মালিকরা তাৎক্ষণিকভাবে এসটিপি স্থাপন করতে না পারলেও অন্তত সেপটিক ট্যাঙ্ক ও সোকওয়েল স্থাপন করতে পারেন। ভবিষ্যতে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত এটি অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে কাজ করতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েক বছর অপেক্ষা করতে করতে লেকগুলোর পরিবেশগত ক্ষতি আরও বাড়তে দেওয়া যায় না।

অন্যদিকে আবাসিক সোসাইটির প্রতিনিধিদের দাবি, শুধু বাড়ির মালিকদের ওপর দায় চাপালে সমস্যার সমাধান হবে না। তাঁদের মতে, লেকের দূষণের উৎস একাধিক। আশপাশের বিভিন্ন এলাকা, অবৈধ সংযোগ, নালা ও অন্যান্য উৎস থেকেও বর্জ্য জলাশয়ে প্রবেশ করতে পারে। তাই পুরো এলাকার পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করে একটি কেন্দ্রীয় সমাধান তৈরি করা প্রয়োজন।

এখানেই মূল প্রশ্ন—দূষণের দায় কার এবং সমাধানের দায়িত্ব কে নেবে? ভবন মালিকদের নিজস্ব ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা হবে, নাকি রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে—এই বিতর্কের মধ্যেই সময় পার হচ্ছে। এর মধ্যে প্রতিদিনই লেকের পানিতে বর্জ্য মেশার অভিযোগ থাকলে পরিবেশগত ক্ষতি আরও বাড়বে।

রাজধানীর জলাধারগুলো শুধু শহরের সৌন্দর্য বাড়ায় না; এগুলো বৃষ্টির পানি ধারণ, স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই লেক দূষণকে কেবল একটি পরিচ্ছন্নতাজনিত সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জনস্বাস্থ্যের বিষয় জড়িত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিচ্ছিন্ন ও ভবনভিত্তিক উদ্যোগের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় অবকাঠামোও প্রয়োজন। একই সঙ্গে যেসব ভবনে আইন ও নকশার শর্ত অনুযায়ী স্যুয়ারেজ ব্যবস্থাপনার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি। শুধু প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না; কোথা থেকে বর্জ্য আসছে, কোথায় যাচ্ছে এবং কীভাবে শোধন হচ্ছে—পুরো ব্যবস্থাকে নজরদারির আওতায় আনতে হবে।

গুলশান, বনানী, বারিধারা ও হাতিরঝিলের লেকগুলোকে ঘিরে এখন তাই দ্রুত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন। একদিকে হাজার হাজার ভবনের পয়ঃবর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক তৈরিতে কয়েক বছর সময় লাগার সম্ভাবনা—এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জলাধারগুলো। সমন্বিত উদ্যোগ না এলে রাজধানীর একসময়ের নান্দনিক জলাশয়গুলো ধীরে ধীরে বর্জ্যের আধারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

নগরবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও ভবন মালিকরা নিজেদের অবস্থান থেকে বেরিয়ে একটি কার্যকর সমাধানে পৌঁছাবেন। কারণ লেকের পানি দূষিত হওয়ার পর তা পুনরুদ্ধার করা অনেক বেশি ব্যয়বহুল ও কঠিন। তাই ভবিষ্যতের বড় প্রকল্পের পাশাপাশি এখনই বর্জ্য সরাসরি লেকে পড়া বন্ধ করা এবং অন্তর্বর্তী পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত