প্রাডো জিপে ঢাকায় যাচ্ছিল ৩ লাখ ইয়াবা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৫ বার
প্রাডো জিপে ঢাকায় যাচ্ছিল ৩ লাখ ইয়াবা

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কক্সবাজার থেকে রাজধানী ঢাকার উদ্দেশে যাচ্ছিল একটি বিলাসবহুল প্রাডো জিপ। বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ একটি ব্যক্তিগত গাড়ি বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু কুমিল্লার জাগুরঝুলি বিশ্বরোড এলাকায় পৌঁছানোর পর গোয়েন্দা পুলিশের তল্লাশিতে বেরিয়ে আসে বিপুল পরিমাণ মাদক। গাড়িটির ভেতরে থাকা একটি লাগেজ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় তিন লাখ পিস ইয়াবা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাবে, জব্দ করা ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা।

সোমবার দুপুরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার জাগুরঝুলি বিশ্বরোড এলাকায় অভিযান চালিয়ে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ইয়াবার এই বড় চালানটি জব্দ করে। এ সময় গাড়িতে থাকা দুজনকে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিরা হলেন কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ফয়সাল হোসেন, বয়স ২৫ বছর, এবং একই এলাকার গাড়িচালক আমান উল্লাহ, বয়স ৩৫ বছর।

তবে এত বড় চালানটি কার নির্দেশে বা কার কাছে পৌঁছে দিতে কক্সবাজার থেকে ঢাকার উদ্দেশে নেওয়া হচ্ছিল, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত কোনো তথ্য জানাতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আটক দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে চালানের উৎস, গন্তব্য এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শামছুল আলম শাহ জানান, রাজধানীতে ইয়াবার বড় একটি চালান যাওয়ার গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ডিবির একটি দল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের জাগুরঝুলি এলাকায় অবস্থান নেয়। কিছু সময় পর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী একটি সাদা রঙের প্রাডো জিপকে সন্দেহ হলে সেটি থামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়।

তল্লাশির একপর্যায়ে গাড়ির ভেতরে থাকা একটি লাগেজের সন্ধান পান ডিবি সদস্যরা। লাগেজটি খুলতেই স্কচটেপ দিয়ে মোড়ানো অবস্থায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবা পাওয়া যায়। পরে গণনা করে ইয়াবার পরিমাণ প্রায় তিন লাখ পিস বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়। উদ্ধার করা মাদকের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা বলে জানিয়েছে পুলিশ।

অভিযানের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান। তিনি সাংবাদিকদের জানান, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এই এলাকায় উদ্ধার হওয়া ইয়াবার চালানগুলোর মধ্যে এটি বড় একটি চালান। বিপুল পরিমাণ মাদক একসঙ্গে পরিবহনের ঘটনায় সংঘবদ্ধ একটি চক্র জড়িত থাকার সম্ভাবনাও দেখছে পুলিশ।

পুলিশ সুপার বলেন, উদ্ধার হওয়া প্রাডো জিপটির মালিকানা যাচাই করা হবে। গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করে প্রকৃত মালিকের পরিচয় জানার চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ইয়াবার চালানটির সঙ্গে আরও কারা জড়িত, কোথা থেকে এটি সংগ্রহ করা হয়েছে এবং ঢাকায় কার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল—এসব তথ্য বের করার চেষ্টা করা হবে।

কক্সবাজার থেকে ঢাকার দিকে মাদক পরিবহনের অভিযোগ নতুন নয়। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে মাদক বিভিন্ন পথে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালালেও মাদক পরিবহনের সঙ্গে জড়িত চক্রগুলো নানা কৌশলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে চালান সরানোর চেষ্টা করে। এবারও একটি ব্যক্তিগত ব্যবহারের উপযোগী বিলাসবহুল গাড়ির ভেতরে করে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা বহনের ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।

মাদক পরিবহনে গাড়ি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পাচারকারীরা বিভিন্ন সময় গাড়ির ভেতরের বিভিন্ন অংশকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। তবে এই ঘটনায় বিপুল পরিমাণ ইয়াবা একটি লাগেজে রেখে বহন করা হচ্ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। এতে ধারণা করা হচ্ছে, চালানটি দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এমনভাবে পরিবহন করা হচ্ছিল। যদিও চালান পরিবহনের পুরো প্রক্রিয়া এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বড় চালান জব্দের ঘটনাগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য যেমন সাফল্যের বিষয়, তেমনি এসব চালানের পেছনে থাকা নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ। একটি চালান জব্দ করলেই মাদক ব্যবসার পুরো চক্র ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয় না। সাধারণত সরবরাহকারী, পরিবহনকারী, অর্থদাতা এবং গন্তব্যে গ্রহণকারীদের মধ্যে একাধিক স্তরের যোগাযোগ থাকতে পারে। তাই আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং উদ্ধার হওয়া গাড়ি ও মাদকের উৎস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

এ ঘটনায় আটক দুজনের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত করছে পুলিশ। তাঁরা নিজেরা মাদকের মালিক, নাকি শুধু পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিলেন—তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। একইভাবে গাড়িটির প্রকৃত মালিকের সঙ্গে চালানের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। কারণ বিপুল পরিমাণ মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত গাড়ির মালিকানা ও ব্যবহারের ইতিহাস তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।

কুমিল্লার জাগুরঝুলি বিশ্বরোড এলাকাটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল থেকে রাজধানীর দিকে আসা বিপুলসংখ্যক যানবাহন এই মহাসড়ক ব্যবহার করে। ফলে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি অপরাধী চক্রও কখনো কখনো এই দীর্ঘ মহাসড়ককে মাদক পরিবহনের রুট হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গোয়েন্দা নজরদারি ও তল্লাশি কার্যক্রম এ ধরনের চালান শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এদিকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাদক শুধু একটি আইনগত অপরাধের বিষয় নয়; এর সঙ্গে তরুণ সমাজ, পরিবার, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত। একটি বড় চালান দেশের বাজারে পৌঁছাতে না পারা মাদক নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও দীর্ঘমেয়াদে মাদকের চাহিদা কমানো, সরবরাহ চক্র ভাঙা এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু সীমান্ত বা মহাসড়কে অভিযান চালিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের উৎস, পরিবহন ব্যবস্থা, অর্থের প্রবাহ এবং বাজারজাতকরণের সঙ্গে যুক্ত পুরো নেটওয়ার্ককে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হয়। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল করতে আর্থিক লেনদেনের তদন্তও গুরুত্বপূর্ণ। বড় চালান আটকের পর তদন্ত যদি শুধু পরিবহনকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে মূল হোতারা আড়ালে থেকে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

কুমিল্লার এই ঘটনায়ও পুলিশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—প্রায় তিন লাখ ইয়াবার চালানটি কোথা থেকে সংগৃহীত হয়েছিল এবং ঢাকায় কার কাছে যাওয়ার কথা ছিল। কক্সবাজার থেকে যাত্রা শুরু করে কুমিল্লায় এসে চালানটি ধরা পড়ায় এর পেছনে থাকা যোগাযোগের চেইন খুঁজে বের করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, গাড়ির মালিকানা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট মোবাইল বা আর্থিক যোগাযোগের তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেতে পারেন।

পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উদ্ধার হওয়া মাদক ও প্রাডো জিপটি পরবর্তী তদন্তে আলামত হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করার পাশাপাশি চালানের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা করা হবে।

তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে আটক ব্যক্তিদের অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টি বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে। একইভাবে গাড়িটির মালিক বা অন্য কোনো ব্যক্তির সম্পৃক্ততার বিষয়েও তদন্তে প্রমাণ পাওয়ার পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

কুমিল্লার এই অভিযানে প্রায় তিন লাখ পিস ইয়াবা জব্দ হওয়া আবারও দেখিয়ে দিল, দেশের মহাসড়কগুলো দিয়ে কত বড় পরিসরে মাদক পরিবহনের চেষ্টা হতে পারে। একটি গাড়ি থামিয়ে দেওয়া এবং একটি চালান জব্দ করার মধ্য দিয়ে অভিযানের তাৎক্ষণিক সাফল্য মিললেও এর প্রকৃত গুরুত্ব নির্ভর করবে তদন্ত কতটা গভীরে যায় তার ওপর। শুধু চালান নয়, এর পেছনে থাকা পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা গেলে তবেই এই অভিযানের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে।

এখন পুলিশের নজর আটক দুজনের জিজ্ঞাসাবাদ, প্রাডো জিপের মালিকানা যাচাই এবং ইয়াবা চালানের উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত করার দিকে। প্রায় ১৫ কোটি টাকা মূল্যের বলে ধারণা করা এই চালান ঢাকার বাজারে পৌঁছানোর আগেই আটকে যাওয়ায় বড় ধরনের একটি মাদক সরবরাহ ঠেকানো গেছে। তবে এর পেছনের মূল চক্র কতটা বিস্তৃত এবং কারা এই চালানের সঙ্গে জড়িত, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেই প্রশ্নের উত্তর মিলছে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত