এ-চালানে সরাসরি সরকারি কোষাগারে ভূমি নিবন্ধনের টাকা

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩ বার
এ-চালানে সরাসরি সরকারি কোষাগারে ভূমি নিবন্ধনের টাকা

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

জমি কেনাবেচা ও দলিল নিবন্ধনের সঙ্গে যুক্ত রাজস্ব জমা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিনের পে-অর্ডারনির্ভর ম্যানুয়াল ব্যবস্থার পরিবর্তে এখন এ-চালানের মাধ্যমে ভূমি নিবন্ধন ফি ও সংশ্লিষ্ট কর সরাসরি এবং রিয়েল টাইমে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর ফলে ভূমি নিবন্ধনের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ব্যাংকিং প্রক্রিয়ায় আটকে থাকার সময় কমবে এবং সরকারি কোষাগারে অর্থ জমার ব্যবস্থাপনায় আরও গতি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি তৈরি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মঙ্গলবার মানিকগঞ্জ সদর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে এ ব্যবস্থার পাইলটিং কার্যক্রম শুরু হয়। অনলাইন জুম প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হয়ে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক, নিবন্ধন শামীমা আফরোজ। নতুন এই ব্যবস্থাকে ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাইলটিং সফলভাবে সম্পন্ন হলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়েও এ-চালানের মাধ্যমে ভূমি নিবন্ধন ফি ও কর জমা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হবে।

এতদিন জমির দলিল নিবন্ধনের পর সংশ্লিষ্ট ফি ও কর সোনালী ব্যাংকের পে-অর্ডারের মাধ্যমে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে জমা দেওয়া হতো। অর্থ জমা দেওয়ার পর সেটি সরকারি কোষাগারে পৌঁছাতে নির্দিষ্ট সময় প্রয়োজন হতো। ফলে রাজস্বের অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থার একটি পর্যায়ে অবস্থান করত এবং সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার প্রক্রিয়ায় সময়ের ব্যবধান তৈরি হতো। নতুন এ-চালান ব্যবস্থায় সেই দীর্ঘসূত্রতা অনেকটাই কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন ব্যবস্থার ফলে একজন নাগরিক জমি নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত ফি ও কর পরিশোধ করার সময় অর্থ সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার ডিজিটাল প্রক্রিয়ার মধ্যে আসবেন। এতে অর্থ জমার পর তা কোথায় আছে বা সরকারি কোষাগারে পৌঁছাতে কত সময় লাগছে—এ ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা কমার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্বের অর্থের হিসাব সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ আরও সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন।

উদ্বোধনী বক্তব্যে নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক শামীমা আফরোজ বলেন, ভূমি নিবন্ধন ফি ও অন্যান্য কর এ-চালানের মাধ্যমে রিয়েল টাইমে সরকারি কোষাগারে জমার মধ্য দিয়ে নিবন্ধন অধিদপ্তরের কার্যক্রমে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভূমি নিবন্ধন থেকে আসা বড় অঙ্কের রাজস্ব এখন আর সরকারি কোষাগারের বাইরে অবস্থান করবে না। একই সঙ্গে নাগরিকদের দ্রুত ও সহজে ভূমি নিবন্ধন সেবা দেওয়ার সুযোগও বাড়বে।

ভূমি নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি সেবার সঙ্গে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ জমি কেনাবেচা, হস্তান্তর ও অন্যান্য কারণে দলিল নিবন্ধনের জন্য সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে যান। তাদের জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়া যত দ্রুত ও স্বচ্ছ হবে, ততই সরকারি সেবার প্রতি আস্থা বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। এ-চালান ব্যবস্থা সেই জায়গায় প্রযুক্তিনির্ভর একটি পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

নতুন ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর সম্ভাবনা। ম্যানুয়াল প্রক্রিয়ায় অর্থ জমা দেওয়ার পর বিভিন্ন ধাপে হিসাব সংরক্ষণ ও সরকারি কোষাগারে অর্থ পৌঁছানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতো। ডিজিটাল ব্যবস্থায় সেই তথ্য দ্রুত সংরক্ষণ ও যাচাই করা সম্ভব হবে। ফলে রাজস্ব আদায় ও জমার ক্ষেত্রে তথ্যের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি কর্তৃপক্ষের জন্য রাজস্ব প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করাও তুলনামূলকভাবে সহজ হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মানিকগঞ্জ সদর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে পাইলটিং কার্যক্রম সফল হলে দ্রুত দেশের অন্যান্য সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে এই ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে। এর মধ্য দিয়ে ভূমি নিবন্ধন খাতে দীর্ঘদিনের ম্যানুয়াল রাজস্ব জমা ব্যবস্থাপনা থেকে আরও আধুনিক, ডিজিটাল ও রিয়েল টাইম ব্যবস্থাপনার দিকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

এ-চালান ব্যবস্থার সঙ্গে ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থাপনা সিস্টেমের আন্তঃসংযোগ সম্পন্ন হলে পুরো প্রক্রিয়াটি আরও সহজ ও নির্ভুল হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে পাইলটিংয়ের মাধ্যমে ব্যবস্থাটির বাস্তব কার্যকারিতা যাচাই করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে দুই ব্যবস্থার মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রযুক্তিগত সমন্বয় হলে নিবন্ধন ফি জমার প্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয়তা আরও বাড়তে পারে। এতে নাগরিকদের একাধিক ধাপে অর্থ জমা বা তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

এই উদ্যোগের সঙ্গে ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থাপনা অটোমেশনের বিষয়টিও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। সরকারি সেবা ডিজিটাল করার ক্ষেত্রে শুধু অনলাইনে আবেদন বা তথ্য প্রদানের সুযোগ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; অর্থ পরিশোধ, রাজস্ব হিসাব এবং সরকারি কোষাগারে জমার পুরো প্রক্রিয়াকেও একই ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনা প্রয়োজন। এ-চালানের মাধ্যমে ভূমি নিবন্ধন ফি ও কর জমার উদ্যোগ সেই বৃহত্তর অটোমেশন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মানিকগঞ্জে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলা রেজিস্ট্রার মো. জাহিদ হোসেনের সঞ্চালনায় নিবন্ধন অধিদপ্তরের এআইজিআর (অর্থ) মহসীন আলম, ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক মুনিরুল হাসান এবং সহকারী প্রকল্প পরিচালক মো. জুবায়ের হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থাপনা দ্রুততম সময়ে আরও অটোমেশনের আওতায় আনার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

পাইলটিংয়ের প্রথম দিনেই নতুন ব্যবস্থার বাস্তব প্রয়োগও করা হয়। অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে সোনালী ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট ইউজারদের উপস্থিতিতে দুটি দলিলের নিবন্ধন ফি এ-চালানের মাধ্যমে জমা দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে নতুন ব্যবস্থায় রাজস্ব আদায়ের কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করার বাস্তব উদাহরণ তৈরি হয়।

ভূমি নিবন্ধনের সঙ্গে যুক্ত সাধারণ মানুষের জন্য এ পরিবর্তনের গুরুত্বও কম নয়। জমি কেনা বা বিক্রির মতো বড় আর্থিক সিদ্ধান্তের সময় মানুষ সাধারণত দ্রুত ও নির্ভুলভাবে সরকারি ফি ও কর পরিশোধ করে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে চান। অর্থ জমা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় যদি অতিরিক্ত সময় বা জটিলতা তৈরি হয়, তাহলে পুরো নিবন্ধন কার্যক্রমেই তার প্রভাব পড়ে। ডিজিটাল পদ্ধতিতে অর্থ সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হলে সেই জটিলতা কমার পাশাপাশি সেবাগ্রহীতার সময়ও সাশ্রয় হতে পারে।

তবে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা সফল করতে হলে এর কারিগরি সক্ষমতা, ব্যবহারকারীদের প্রশিক্ষণ এবং নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সব সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে ব্যবস্থা চালুর আগে পাইলটিং পর্যায়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তিগত ত্রুটি ও ব্যবহারিক জটিলতা দূর করার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিকদের সহজ ভাষায় নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে জানানো হলে পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াও সহজ হবে।

সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল রূপান্তরের বৃহত্তর উদ্যোগের মধ্যেই ভূমি নিবন্ধন ফি ও কর এ-চালানের মাধ্যমে জমার এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর আগে সরকারি রাজস্ব ও প্রাপ্তি জমার ক্ষেত্রেও এ-চালান ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে ভূমি নিবন্ধন খাতকে এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল কাঠামো আরও বিস্তৃত করার একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

মানিকগঞ্জ সদর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে শুরু হওয়া এই পাইলটিং তাই শুধু একটি কার্যালয়ের প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে এটি দেশের ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থায় বড় ধরনের ডিজিটাল পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। পে-অর্ডারনির্ভর দীর্ঘ প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে সরাসরি সরকারি কোষাগারে রিয়েল টাইমে অর্থ জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় গতি ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি নাগরিক সেবাকেও আরও সহজ করার সুযোগ তৈরি করছে। এখন পাইলটিংয়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সারাদেশে এই ব্যবস্থা কতটা দ্রুত, নির্ভুল ও নির্বিঘ্নভাবে সম্প্রসারণ করা যায়, সেটিই হবে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত