রাশিয়ার উপকূলে মার্কিন সাবমেরিন ,ট্রাম্পের জয়ের কৌশল, না কূটনৈতিক ব্যর্থতা?

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ৬ আগস্ট, ২০২৫
  • ১৫৮ বার

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি সামরিক নির্দেশনা। ইউক্রেন যুদ্ধ ও বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে যখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে, ঠিক তখনই উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের একটি অংশে রাশিয়ার উপকূলের কাছাকাছি আমেরিকার একটি পরমাণু শক্তিসম্পন্ন সাবমেরিন পাঠানো হয়। এই ঘটনাটি একদিকে যেমন কূটনৈতিক স্তরে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ বাড়িয়েছে—এই পদক্ষেপ ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে সফল হয়েছে, নাকি উল্টো তার অবস্থানকে আরও সংকটময় করেছে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত সপ্তাহে, যখন মার্কিন নৌবাহিনীর “USS Michigan” নামক একটি ট্রাইডেন্ট মিসাইলবাহী সাবমেরিন রাশিয়ার মুরমানস্ক উপকূল থেকে মাত্র কয়েকশো কিলোমিটার দূরে অবস্থান নেয়। এই সাবমেরিনের উপস্থিতির বিষয়টি রুশ গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রথমে গোপন রাখলেও পরে একটি টেলিগ্রাম পোস্ট ও সামরিক পর্যবেক্ষণ রিপোর্টে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, সাবমেরিনটি “অত্যন্ত কাছাকাছি এবং শত্রুতাপূর্ণ ঘাঁটি গঠন করে” উপস্থিত ছিল। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানিয়ে জানায়, তারা এটিকে একটি “চরম উস্কানি” এবং “মার্কিন আঞ্চলিক আগ্রাসনের চেষ্টা” হিসেবে দেখছে।

অন্যদিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, যিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে পুনরায় প্রার্থী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এই পদক্ষেপকে তার প্রশাসনের “কঠোর শক্তির প্রদর্শনী” হিসেবে তুলে ধরেছেন। ফ্লোরিডার একটি র‍্যালিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি যা বলেছি, সেটাই করেছি। আমেরিকা দুর্বলতা নয়, শক্তির প্রতীক। পুতিন জানেন, আমি থাকলে তিনি বাড়াবাড়ি করতে পারেন না।”

কিন্তু এই সিদ্ধান্তে ট্রাম্প আদৌ জয় পেয়েছেন, নাকি বিপদের দ্বার খুলেছেন—তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে মার্কিন অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে। ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমস ও দ্য ইকোনমিস্টসহ একাধিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম এই পদক্ষেপকে “হঠকারী”, “অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টিকারী” এবং “বিপজ্জনক সামরিক প্রদর্শনী” হিসেবে বর্ণনা করেছে। এমনকি মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যদের অনেকেই অভিযোগ তুলেছেন, এই ধরনের সিদ্ধান্ত কংগ্রেসের সঙ্গে আলোচনা না করে নেওয়া উচিত হয়নি এবং এটি মার্কিন রাজনীতির ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ তার নির্বাচনী জনসমর্থন বাড়াতে সাহায্য করতে পারে, বিশেষত রক্ষণশীল ভোটারদের মধ্যে। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত পরিস্থিতি ও বৈদেশিক হুমকি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বিরাজ করছে। ট্রাম্প সেই উদ্বেগকে কাজে লাগিয়ে আবারো ‘স্ট্রংম্যান’ ইমেজ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন, যেখানে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে বিশ্ব নেতাদের চাপে রাখার নীতি প্রাধান্য পায়।

তবে এ ঘটনাটি কেবল একটি সামরিক কৌশল ছিল না, বরং এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য এক বড় ধাক্কা বলেও অনেকে মনে করছেন। ইউক্রেন যুদ্ধের তৃতীয় বর্ষে প্রবেশের প্রাক্কালে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক এমনিতেই টানটান। এই অবস্থায় ট্রাম্পের সাবমেরিন মোতায়েনের সিদ্ধান্ত রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি সামরিক উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। রাশিয়া ইতোমধ্যেই নিজেদের উত্তরাঞ্চলে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করার কথা জানিয়েছে এবং “যেকোনো বহিরাগত আগ্রাসনের জবাব দিতে প্রস্তুত” বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে।

বিশ্বে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রশ্নে এই ঘটনার প্রভাব আরও সুদূরপ্রসারী হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক কূটনীতিক। একাধিক সূত্র জানায়, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই বিষয়ের উপর একটি বিশেষ বৈঠক আহ্বান করা হতে পারে। তাছাড়া চীন, তুরস্ক ও ভারতসহ মধ্যপন্থী শক্তিগুলো এই উত্তেজনা নিরসনে মধ্যস্থতা করার আগ্রহ দেখিয়েছে।

সবমিলিয়ে, সাবমেরিন মোতায়েনের মধ্য দিয়ে ট্রাম্প নিজেকে শক্তিশালী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করলেও, এ সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কতটা ফলপ্রসূ হবে—তা এখনও অনিশ্চিত। কারণ এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন ভেতরে ভেতরে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী রাজনীতিকে উত্তপ্ত করেছে, তেমনি বাইরের দুনিয়ায় একটি অশান্ত, দুশ্চিন্তায় ভরা বার্তা পাঠিয়েছে।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—সাবমেরিন পাঠিয়ে ট্রাম্প আদৌ জিতলেন, না কূটনৈতিকভাবে একপ্রকার হেরে গেলেন? এর উত্তর সময়ই দেবে, তবে বর্তমানে বিশ্ব যেভাবে নতুন এক উত্তেজনার দিকে ধাবিত হচ্ছে, তাতে করে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ হয়তো তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সুবিধা আনতে পারে, কিন্তু বিশ্বশান্তির ক্ষেত্রে এটি যে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com