নুসরাত হত্যা মামলার আপিলের রায় আজ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১০ বার
নুসরাত হত্যা মামলার আপিলের রায় আজ

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের আবেদন এবং আসামিদের আপিল ও জেল আপিলের রায় আজ সোমবার ঘোষণা হওয়ার কথা রয়েছে। বহুল আলোচিত এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ এই ধাপকে ঘিরে আদালতপাড়া ও নুসরাতের পরিবারে আবারও তৈরি হয়েছে প্রত্যাশা ও অপেক্ষার আবহ।

বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে মামলাটির শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গত ২০ আগস্ট উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলে আদালত রায়ের জন্য আজকের দিন ধার্য করেন। এর মধ্য দিয়ে প্রায় সাত বছর আগে দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা নুসরাত হত্যা মামলাটি উচ্চ আদালতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

নুসরাত জাহান রাফি ছিলেন ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। ২০১৯ সালের মার্চে তাঁর বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে মাদ্রাসাটির অধ্যক্ষ সিরাজ-উদদৌলার বিরুদ্ধে। ওই অভিযোগে নুসরাতের মা শিরীন আখতার ২৭ মার্চ থানায় মামলা করেন। মামলার পর অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করা হয়।

অধ্যক্ষ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর অনুসারীদের একটি অংশ তাঁকে মুক্ত করার জন্য বিভিন্নভাবে তৎপরতা চালায় বলে মামলার তদন্তে উঠে আসে। নুসরাতের পরিবারের অভিযোগ ছিল, মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাঁকে চাপ দেওয়া হচ্ছিল। একই সঙ্গে তাঁর ওপর ভয়ভীতি ও নানা ধরনের চাপ প্রয়োগের অভিযোগও সামনে আসে।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ৩ এপ্রিল কারাগারে থাকা অধ্যক্ষ সিরাজ-উদদৌলার সঙ্গে তাঁর অনুসারীদের কয়েকজন দেখা করেন। পরদিন ৪ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে তদন্তে উঠে আসে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ৬ এপ্রিল নুসরাত আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসায় গেলে তাঁকে কৌশলে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে তাঁর গায়ে আগুন ধরিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় নুসরাতকে উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে ফেনী জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তাঁকে ভর্তি করা হয়।

প্রচণ্ড শারীরিক যন্ত্রণা ও মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর ১০ এপ্রিল ২০১৯ নুসরাত মারা যান। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে ওঠে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। নুসরাতের পরিবারের পক্ষ থেকেও হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।

নুসরাতের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান সোনাগাজী থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলার তদন্তে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, হামলায় অংশগ্রহণ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির ভূমিকার বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তদন্ত শেষে ১৬ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

মামলাটির বিচার শেষে ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ১৬ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। দেশের বিচারিক ইতিহাসে দ্রুততম সময়ে আলোচিত কোনো হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন হওয়ার অন্যতম উদাহরণ হিসেবেও তখন মামলাটি আলোচনায় আসে।

ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হলে আইন অনুযায়ী উচ্চ আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন। সে কারণে নিম্ন আদালতের রায়ের পর মামলার নথিপত্র হাইকোর্টে পাঠানো হয়। একই সময়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা তাঁদের সাজা চ্যালেঞ্জ করে জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিল করেন।

হাইকোর্টে একদিকে মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের আবেদন এবং অন্যদিকে আসামিদের আপিলের শুনানি হয়। দীর্ঘ শুনানি শেষে চলতি মাসের ২০ আগস্ট উভয় পক্ষের আইনজীবীরা তাঁদের যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন। এরপর আদালত আজ রায় ঘোষণার জন্য দিন নির্ধারণ করেন।

এই রায় নুসরাতের পরিবারের জন্যও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর উচ্চ আদালত কী সিদ্ধান্ত দেন, সে অপেক্ষায় রয়েছে পরিবারটি। একই সঙ্গে দেশবাসীর দৃষ্টি রয়েছে মামলাটির পরবর্তী আইনি পরিণতির দিকে।

নুসরাত হত্যাকাণ্ড শুধু একটি হত্যার ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি নারী নির্যাতন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনার জন্ম দেয়। একজন শিক্ষার্থীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে যে চাপ, ভয়ভীতি ও সহিংসতার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা নিয়ে সে সময় ব্যাপক উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

নুসরাতের মৃত্যুর পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্তের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। তাঁর হত্যার বিচার দ্রুত শেষ করার দাবিও বিভিন্ন মহল থেকে জোরালোভাবে ওঠে। নিম্ন আদালতের রায় দ্রুত ঘোষণা হওয়ায় তখন বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন অনেকে।

তবে মৃত্যুদণ্ডের মামলায় উচ্চ আদালতের অনুমোদন একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি ধাপ। হাইকোর্ট মামলার নথি, সাক্ষ্যপ্রমাণ, আইনগত বিষয় এবং নিম্ন আদালতের রায় পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত দেবেন। ফলে আজকের রায়ে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে কি না, সাজা পরিবর্তন হবে কি না কিংবা অন্য কোনো আইনগত সিদ্ধান্ত আসবে কি না, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্টদের।

এদিকে একই বেঞ্চে মাগুরার আট বছর বয়সী শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের আবেদন এবং আসামির আপিলের শুনানিও চলছে। গতকাল রোববার মামলাটিতে আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী হাফিজুর রহমান খান শুনানি করেন। গত ১১ আগস্ট থেকে মামলাটির শুনানি শুরু হয়েছে।

শিশু আছিয়াকে হত্যার দায়ে ২০২৫ সালের ১৭ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল মামলার প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই রায়ে অন্য তিন আসামি—আছিয়ার বোনের জামাই সজীব শেখ, সজীবের ভাই রাতুল শেখ এবং তাঁদের মা জাহেদা বেগমকে খালাস দেওয়া হয়। ওই মামলার শুনানিও হাইকোর্টে চলমান রয়েছে।

নুসরাত হত্যা মামলার আজকের রায় তাই শুধু একটি মামলার পরবর্তী আইনি ধাপ নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নুসরাতের পরিবার, মামলার আসামিপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষেরও নজর থাকবে হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের দিকে। রায়ের মাধ্যমে মামলাটির পরবর্তী পথ কোন দিকে এগোয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত