প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজীপুরের টঙ্গীতে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে এক প্রবাসী যুবককে অপহরণের পর হত্যার অভিযোগ উঠেছে তাঁরই বন্ধুর বিরুদ্ধে। প্রায় এক মাস নিখোঁজ থাকার পর টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানের একটি পরিত্যক্ত ড্রেন থেকে ওই যুবকের গলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় অভিযুক্ত বন্ধুকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মরদেহের সন্ধান পাওয়া যায়।
নিহত যুবকের নাম আকাশ সরদার। তাঁর বয়স ২১ বছর। তিনি ফরিদপুর সদর উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের মো. করিম সরদারের ছেলে। জীবিকার সন্ধানে তিনি দীর্ঘদিন কম্বোডিয়ায় ছিলেন। তাঁর সঙ্গে একই সময়ে কম্বোডিয়ায় ছিলেন অভিযুক্ত মাজহারুল ইসলাম মিঠু। মিঠুর বয়স ৩০ বছর এবং তাঁর বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার নাজিরপুর গ্রামে। দুজনের মধ্যে আগে থেকেই বন্ধুত্ব ও পরিচয় ছিল বলে মামলার তথ্য থেকে জানা গেছে।
পুলিশ ও মামলার নথি অনুযায়ী, প্রায় আড়াই বছর আগে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ এলাকার অপু মিয়ার মাধ্যমে আকাশ ও মিঠু কম্বোডিয়ায় যান। সেখানে তাঁরা প্রবাসজীবন কাটান। প্রায় তিন মাস আগে তাঁরা দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফেরার পর আকাশ কর্মহীন হয়ে পড়েন এবং নতুন একটি চাকরির সন্ধান করছিলেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েই তাঁকে ডেকে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত ২৭ জুলাই মিঠু চাকরি দেওয়ার কথা বলে আকাশকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ এলাকায় ডেকে আনেন। এরপর সেখান থেকে তাঁকে অপহরণ করে টঙ্গীতে নিয়ে আসা হয় বলে অভিযোগ। ওই দিন সন্ধ্যার পর ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়। রাত প্রায় ৭টার দিকে আকাশের স্ত্রী জেরিনের মোবাইল ফোনে হোয়াটসঅ্যাপে কল করেন সুমন নামে এক ব্যক্তি। তিনি আকাশকে আটকে রাখার কথা জানান। এরপরই আকাশের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর উদ্বেগ বাড়তে থাকে জেরিনের। পরিবারের সদস্যরাও সম্ভাব্য বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ শুরু করেন। কিন্তু কোথাও আকাশের সন্ধান পাওয়া যায়নি। একসময় পরিবারের কাছে বিষয়টি নিখোঁজ থাকার চেয়ে আরও গুরুতর বলে মনে হতে থাকে। দীর্ঘ সময় কোনো সন্ধান না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত আকাশের বাবা করিম সরদার ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন।
মামলায় মাজহারুল ইসলাম মিঠু, মো. অপু মিয়া ও মো. সুমন মিয়াকে এজাহারভুক্ত আসামি করা হয়। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও দুই থেকে তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ ছিল, পরিকল্পিতভাবে আকাশকে ডেকে এনে আটকে রাখা হয়েছে এবং পরবর্তীতে তাঁর কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। পুলিশ মামলাটি তদন্ত শুরু করার পর বিভিন্ন তথ্য ও সম্ভাব্য অবস্থান যাচাই করতে থাকে।
তদন্তের একপর্যায়ে মিঠুর অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা শুরু হয়। ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার তদন্তকারী কর্মকর্তার চাহিদাপত্রের ভিত্তিতে উত্তরা র্যাব-১-এর একটি দল গত ২৩ আগস্ট টঙ্গী পশ্চিম থানা এলাকায় অভিযান চালায়। ওই অভিযানে মাজহারুল ইসলাম মিঠুকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই তদন্তকারীরা আকাশের মরদেহের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এরপর সোমবার সকালে টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে অভিযান চালানো হয়। টঙ্গী পশ্চিম থানা পুলিশের উপপরিদর্শক মেহেদী হাসানের সহযোগিতায় ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার একদল পুলিশ ময়দানের ২১ নম্বর টয়লেটের কাছে একটি পরিত্যক্ত ড্রেনে তল্লাশি চালায়। সেখান থেকেই আকাশ সরদারের গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর আকাশের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তাঁর পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। যে তরুণটি বিদেশে গিয়ে কাজ করেছেন, দেশে ফিরে নতুন কর্মসংস্থানের আশায় ছিলেন, তাঁর জীবন এভাবে থেমে যাওয়ার ঘটনায় স্বজনদের মধ্যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। চাকরির আশ্বাসে পরিচিত একজনের ডাকে সাড়া দেওয়ার পর তাঁর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বিশেষ করে পরিচিত ও বন্ধুর ওপর আস্থার বিষয়টি এই ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রবাসে একই দেশের মানুষের সঙ্গে পরিচয় এবং দীর্ঘ সময় একসঙ্গে থাকার পর দেশে ফিরে চাকরির সুযোগের আশ্বাসে আকাশ মিঠুর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলে মামলার তথ্য থেকে জানা যায়। ফলে পরিবারের কাছে এটি কেবল একজন স্বজনকে হারানোর ঘটনা নয়, বরং বিশ্বাস ও নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে এনেছে।
তবে পুলিশি তদন্ত শেষ হওয়ার আগে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত উদ্দেশ্য, এতে কতজন জড়িত ছিলেন এবং কীভাবে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া তথ্য তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হলেও আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই ঘটনার পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার করা মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হত্যার ধরন ও মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। একই সঙ্গে মরদেহ শনাক্তকরণ, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত এবং অভিযুক্তদের বক্তব্য তদন্তকে আরও এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।
টঙ্গী পশ্চিম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইয়ানুর রহমান জানিয়েছেন, মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পুলিশ একই সঙ্গে মামলার অন্যান্য আসামি এবং অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখছে।
এ ঘটনায় মিঠুর পাশাপাশি মামলায় নাম থাকা অপু মিয়া ও সুমন মিয়ার ভূমিকা নিয়েও তদন্তকারীদের সামনে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে আকাশকে চাকরির কথা বলে ডেকে আনার বিষয়টি, তাঁকে টঙ্গীতে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া, আটকে রাখার ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন এবং পরে তাঁকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছে—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আসবে। অজ্ঞাতনামা আসামিদের পরিচয় শনাক্ত করাও এখন পুলিশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
আকাশের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে যে অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল, মরদেহ উদ্ধারের পর অন্তত তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পেরেছে। কিন্তু সেই নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও গভীর শোক। নিখোঁজ একজন স্বজনকে ফিরে পাওয়ার আশায় যে পরিবার দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছে, শেষ পর্যন্ত তাদের হাতে এসেছে তাঁর মরদেহ।
এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, দেশে ফিরে কর্মসংস্থানের সন্ধানে থাকা তরুণদের সামনে থাকা ঝুঁকিগুলো কতটা ভয়াবহ হতে পারে। পরিচিত ব্যক্তি বা বন্ধুর দেওয়া চাকরির আশ্বাস যাচাই না করে তার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করার ক্ষেত্রে যে ঝুঁকি রয়েছে, আকাশ সরদারের করুণ পরিণতি সেই বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। তবে এই মামলার ক্ষেত্রে কোনো পক্ষকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করার আগে তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়া শেষ হওয়া জরুরি।
এখন তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আকাশের নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে মরদেহ উদ্ধারের আগ পর্যন্ত প্রতিটি ঘটনার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। কারা তাঁকে সোনারগাঁ থেকে টঙ্গীতে নিয়ে এসেছিল, কোথায় তাঁকে রাখা হয়েছিল, হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল এবং মরদেহ পরিত্যক্ত ড্রেনে ফেলে রাখার সঙ্গে কারা জড়িত—এসব প্রশ্নের উত্তরই ঘটনার পূর্ণ রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
একজন তরুণের স্বপ্ন ছিল দেশে ফিরে একটি কাজ পাওয়া, নিজের ভবিষ্যৎ গড়া এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। সেই স্বপ্নের পরিবর্তে তাঁর পরিবারকে এখন অপেক্ষা করতে হচ্ছে ময়নাতদন্ত, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য। আকাশ সরদারের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং এর সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির ভূমিকা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত প্রকাশ পাবে—এটাই এখন তাঁর পরিবারের প্রধান প্রত্যাশা।