ইউক্রেনকে সহায়তায় কিয়েভে ইউরোপীয় মিত্রদের বৈঠক

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার
ইউক্রেনকে সহায়তায় কিয়েভে ইউরোপীয় মিত্রদের বৈঠক

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার হামলা ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠার মধ্যে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় মিত্ররা সোমবার কিয়েভে বৈঠকে বসছেন। যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো, রাশিয়ার ওপর আরও চাপ সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপায় নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’ নামে পরিচিত এই জোটের বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন রুশ হামলায় ইউক্রেনের বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি আবারও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বৈঠকে যৌথভাবে সভাপতিত্ব করবেন যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির নেতারা। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর প্রথম আন্তর্জাতিক সফর হিসেবে কিয়েভে যাচ্ছেন। ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশের নেতা সরাসরি উপস্থিত হওয়ার পরিবর্তে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠকে যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কোস্তাও বৈঠকে অংশ নিতে কিয়েভে যাওয়ার কথা রয়েছে।

এই বৈঠকের তাৎপর্য শুধু কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউক্রেনের স্বাধীনতা দিবসেই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একই সঙ্গে ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর সাড়ে চার বছরের কাছাকাছি সময় পেরিয়ে গেছে। দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধ ইউক্রেনের অবকাঠামো, অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে রুশ হামলার মাত্রা আবারও বেড়ে যাওয়ায় ইউরোপীয় মিত্রদের সামনে ইউক্রেনকে কীভাবে আরও কার্যকর সহায়তা দেওয়া যায়, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা বেড়েছে। এসব হামলায় আবাসিক ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রাণ হারিয়েছেন বহু বেসামরিক নাগরিক। যুদ্ধ শুরুর প্রথম কয়েক মাসের পর সাম্প্রতিক সময়েই ইউক্রেনে বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

প্রতিটি বড় হামলার পর কিয়েভের মেট্রো স্টেশনগুলোতে আশ্রয় নিতে দেখা যায় হাজারো মানুষকে। শহরের বিভিন্ন বেসমেন্ট ও নির্ধারিত আশ্রয়কেন্দ্রেও মানুষ রাত কাটাচ্ছেন। শিশু, বয়স্ক ও পরিবারগুলোকে নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে হচ্ছে অনেককে। দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধের ক্লান্তির মধ্যেও নতুন করে হামলার আশঙ্কা সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

এই পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নিয়মিতভাবেই মিত্র দেশগুলোর কাছে আরও উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চেয়ে আসছেন। তাঁর সরকারের মতে, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো এখন ইউক্রেনের অন্যতম জরুরি প্রয়োজন। বিশেষ করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সক্ষমতার ঘাটতি নিয়ে কিয়েভ দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত দ্রুতগতিতে লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যায় এবং তুলনামূলকভাবে উচ্চ গতিপথ ব্যবহার করে। ফলে এগুলো শনাক্ত ও মাঝপথে ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন। ইউক্রেনের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সব ধরনের এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলা করতে সক্ষম নয়। এ কারণে দেশটি উন্নত প্রযুক্তির বিদেশি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত বাড়ার কারণে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার চাহিদাও বেড়েছে। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় সরঞ্জামের ঘাটতি ইউক্রেনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই বাস্তবতায় ইউরোপীয় মিত্রদের বৈঠকে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। পাশাপাশি যুদ্ধের সামরিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাশিয়ার ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টির সম্ভাব্য উপায় নিয়েও আলোচনা হতে পারে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম কিয়েভে যাওয়ার আগে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, রাশিয়ার যেন ইউরোপীয় মিত্রদের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কোনো সন্দেহ না থাকে। ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারা পিছিয়ে যাবেন না বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে ইউক্রেনের প্রতি যুক্তরাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি সমর্থনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

ফ্রান্সও ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। শনিবার ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইউক্রেনকে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ব্যবস্থা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি ইউক্রেনের আকাশ রক্ষা এবং রুশ আগ্রাসন প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা দেওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন।

তবে সামরিক সহায়তার পাশাপাশি যুদ্ধের রাজনৈতিক সমাধানও এখন ইউরোপের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে বড় সংঘাত হিসেবে বিবেচিত এই যুদ্ধ বন্ধে বিভিন্ন সময়ে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনা কার্যত স্থবির হয়ে আছে। রাশিয়া ইউক্রেনের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার বিষয়ে দাবি জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে কিয়েভ এসব শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইউক্রেনের অবস্থান হলো, রাশিয়ার দাবির কাছে নতি স্বীকার করলে তা কার্যত আত্মসমর্পণের শামিল হবে এবং ভবিষ্যতে আবারও হামলার ঝুঁকি তৈরি হবে। তাই কিয়েভ এমন একটি শান্তিচুক্তি চায়, যেখানে দেশটির সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকবে।

ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যেও এখন প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ইউক্রেনকে কতদিন এবং কী মাত্রায় সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া সম্ভব। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক এবং ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামো কীভাবে পুনর্গঠন করা হবে, সেটিও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

কিয়েভে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠক তাই ইউক্রেনের জন্য শুধু তাৎক্ষণিক সামরিক সহায়তা নিশ্চিত করার একটি উদ্যোগ নয়; বরং যুদ্ধের পরবর্তী পর্যায় নিয়ে ইউরোপের রাজনৈতিক অবস্থানও এতে স্পষ্ট হতে পারে। আকাশ প্রতিরক্ষা থেকে শুরু করে রাশিয়ার ওপর চাপ, সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা এবং ইউক্রেনের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে বৈঠকটি ইউরোপীয় কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে যুদ্ধের ময়দানে পরিস্থিতি যতটা কঠিন হচ্ছে, সাধারণ ইউক্রেনীয়দের প্রত্যাশাও ততটাই বাড়ছে। দীর্ঘ সময় ধরে হামলা, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামোগত সংকট এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকা মানুষ এখন এমন একটি সমাধান চান, যা তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিতে পারে। ইউরোপীয় নেতাদের বৈঠক সেই প্রত্যাশা পূরণে কতটা বাস্তব ফল বয়ে আনতে পারে, সেটিই এখন কিয়েভসহ পুরো ইউরোপের নজরের বিষয়।

রাশিয়ার হামলা অব্যাহত থাকা এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ সংকুচিত হওয়ার মধ্যে ইউক্রেনের মিত্রদের এই সমন্বিত বৈঠক থেকে সামরিক সহায়তার পাশাপাশি শান্তির জন্য নতুন কোনো উদ্যোগের ইঙ্গিত আসে কি না, সেদিকেও আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত