গঙ্গার পানি বাড়ায় ফারাক্কার সব গেট খোলার আহ্বান

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার
গঙ্গার পানি বাড়ায় ফারাক্কার সব গেট খোলার আহ্বান

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বিহারে গঙ্গা নদীর পানি বাড়তে থাকায় এবং বিভিন্ন এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় ফারাক্কা ব্যারেজের সব গেট খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী। রোববার পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে তিনি এ অনুরোধ জানান। সম্রাট চৌধুরীর দাবি, ফারাক্কার গেট খুলে দিলে গঙ্গার পানির প্রবাহ স্বাভাবিক হতে পারে এবং বিহারের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। বিষয়টি নিয়ে দুই রাজ্যের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে সামনে এসেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় বিহারের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গঙ্গার পানির উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বিহারের বন্যা পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় নিয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। এ সময় তিনি ফারাক্কা ব্যারেজের সব গেট খুলে দেওয়ার অনুরোধ জানান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, শুভেন্দু অধিকারী বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

গঙ্গার পানির প্রবাহ, বন্যার ঝুঁকি এবং নদীর তীরবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকা—সবকিছু মিলিয়ে বিহারে বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিচু অঞ্চলগুলোতে জলাবদ্ধতা ও বন্যার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গঙ্গার পানি বক্সার, বেগুসরাই, মুঙ্গের ও পাটনাসহ বিভিন্ন এলাকায় উচ্চস্তরে প্রবাহিত হচ্ছে। কোথাও কোথাও নদীর পানি সতর্কসীমার ওপরে উঠে বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে।

পাটনা ও আশপাশের নদীতীরবর্তী এলাকাতেও গঙ্গার পানি বৃদ্ধির প্রভাব দেখা যাচ্ছে। নদীর ঘাটগুলোর কিছু অংশ পানিতে তলিয়ে গেছে এবং নিম্নাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। মুঙ্গেরে নদীর পানি মন্দির চত্বর পর্যন্ত প্রবেশ করার খবরও এসেছে। বেগুসরাইয়ের কিছু এলাকায় বন্যার কারণে মানুষের চলাচল ও দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ফলে নদীর পানির প্রবাহ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়টি বিহার সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে ফারাক্কা ব্যারেজকে ঘিরে বিহার সরকারের নতুন দাবি তাৎপর্যপূর্ণ। ফারাক্কা ব্যারেজ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় গঙ্গার ওপর নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। নদীর পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং হুগলি নদীর নাব্যতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে এর ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ। তবে গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে এর প্রভাব শুধু পশ্চিমবঙ্গ বা বিহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশও সরাসরি যুক্ত।

গঙ্গা একটি আন্তঃসীমান্ত নদী হওয়ায় এর পানির প্রবাহ ভারত ও বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা ব্যারেজ থেকে পানির বণ্টন দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক আলোচনার বিষয়। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটির মেয়াদ ৩০ বছর এবং পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এর নবায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। সেই হিসাবে চলতি বছরের ডিসেম্বরেই চুক্তিটির বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা।

চুক্তিতে ফারাক্কার কাছে গঙ্গার পানির প্রবাহের ভিত্তিতে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পানি বণ্টনের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে গঙ্গার পানিপ্রবাহ বৃদ্ধির জন্য দুই দেশের সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ রয়েছে। ফলে ২০২৬ সালের শেষ দিকে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি সামনে আসায় গঙ্গার পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এরই মধ্যে বিহারের পক্ষ থেকে গঙ্গার পানি বণ্টন ও ফারাক্কা ব্যারেজ নিয়ে আরও জোরালো অবস্থান সামনে এসেছে। জনতা দল ইউনাইটেডের (জেডিইউ) জাতীয় কার্যকরী সভাপতি ও রাজ্যসভার সদস্য সঞ্জয় কুমার ঝা সম্প্রতি ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়নের আগে বিহারের স্বার্থ যথাযথভাবে বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নতুন কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আগে গঙ্গা অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল রাজ্যগুলোর ভবিষ্যৎ পানির প্রয়োজন বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

সঞ্জয় ঝার বক্তব্যে বিশেষভাবে উঠে এসেছে বিহারের কৃষি, সেচ, শিল্প ও পানীয় জলের প্রয়োজনীয়তা। তার দাবি, গত তিন দশকের অভিজ্ঞতায় বিহার গঙ্গার পানির ব্যবস্থাপনা থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি ভবিষ্যতে ২০৫০ সাল পর্যন্ত বিহারের পানির চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে নতুন কাঠামো তৈরির পক্ষে মত দিয়েছেন। জেডিইউর এই অবস্থান ভারত-বাংলাদেশ গঙ্গা পানি চুক্তির সম্ভাব্য নবায়নকে আরও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

ভারতের সরকারি নীতিবিষয়ক বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তি চলতি বছরের ডিসেম্বরেই ৩০ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করবে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গঙ্গা অববাহিকার পানিবিজ্ঞান ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ায় ভবিষ্যৎ পানি ব্যবস্থাপনায় নতুন বাস্তবতা বিবেচনা করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ফলে চুক্তির নবায়ন শুধু পুরোনো শর্ত পুনর্বহালের বিষয় নয়; বরং পরিবর্তিত জলবায়ু, জনসংখ্যা, কৃষি ও নদীর প্রবাহের বাস্তবতাকেও আলোচনায় আনতে হবে।

বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক আহ্বান তাই শুধু একটি রাজ্যের বন্যা নিয়ন্ত্রণের তাৎক্ষণিক উদ্যোগ হিসেবে দেখার পাশাপাশি বৃহত্তর গঙ্গা অববাহিকার পানি ব্যবস্থাপনার আলোচনার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে বর্ষায় গঙ্গার পানি বেড়ে গেলে বিহারের মতো নদী অববাহিকাভিত্তিক রাজ্যে বন্যার ঝুঁকি বাড়ে, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি নিয়ে একই অঞ্চলে উদ্বেগ দেখা দেয়। এই দুই বিপরীত পরিস্থিতির মধ্যে পানি ব্যবস্থাপনার ভারসাম্য রক্ষা করা নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের জন্যও গঙ্গার পানির প্রবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা নদীর মাধ্যমে গঙ্গার পানি বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌপরিবহন ও পরিবেশব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ফারাক্কা ব্যারেজের পানিপ্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তার প্রভাব ভাটির দেশ বাংলাদেশেও পড়তে পারে। একই কারণে ভারতীয় আন্তঃরাজ্য পানি ব্যবস্থাপনা এবং ভারত-বাংলাদেশ পানি কূটনীতি—দুটি বিষয়ই পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এর মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে ১৯৯৬ সালের চুক্তি দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামোগুলোর একটি। তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে, যদিও এ বিষয়ে এখনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নতুন করে পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হলে সেটি দুই দেশের ভবিষ্যৎ নদী কূটনীতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বিহারের মুখ্যমন্ত্রীর ফারাক্কার সব গেট খুলে দেওয়ার আহ্বান মূলত রাজ্যটির বন্যা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার তাৎক্ষণিক প্রয়োজন থেকে এসেছে। তবে ফারাক্কা ব্যারেজের পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্তের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, বাংলাদেশ এবং গঙ্গা অববাহিকার বিস্তৃত পরিবেশগত বাস্তবতা জড়িত। ফলে এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নদীর প্রবাহ, ভাটির প্রভাব, বন্যার ঝুঁকি এবং আন্তঃদেশীয় পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

গঙ্গার পানি বাড়ার এই সময়ে বিহারের মানুষের জন্য দ্রুত বন্যা নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে জরুরি হলেও ফারাক্কা নিয়ে নতুন বিতর্ক একই সঙ্গে আগামী দিনের পানি কূটনীতির দিকেও ইঙ্গিত করছে। ডিসেম্বরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনায় বিহারসহ গঙ্গা অববাহিকার বিভিন্ন অংশীজনের স্বার্থ কতটা প্রতিফলিত হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নদীর পানি শেষ পর্যন্ত শুধু কূটনীতি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এর সঙ্গে কোটি মানুষের জীবন, কৃষি, জীবিকা এবং পরিবেশের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে রয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত