ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রুবিওকে সক্রিয় হতে বলবে জার্মানি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রুবিওকে সক্রিয় হতে বলবে জার্মানি

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও কার্যকর করতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে সরাসরি ও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানাতে যাচ্ছেন জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ভাদেফুল। এ বিষয়ে সোমবার রুবিওর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। বার্লিন মনে করছে, যুদ্ধ বন্ধে চলমান কূটনৈতিক উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে ওয়াশিংটনের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।

জার্মানির রেডিও সম্প্রচারমাধ্যম ডয়চল্যান্ডফাঙ্ককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভাদেফুল এসব কথা বলেন। সম্প্রতি ইউক্রেন সফর করে দেশটির পরিস্থিতি সম্পর্কে সরাসরি ধারণা নেওয়ার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদারের উদ্যোগের কথা জানান। তাঁর বক্তব্যে ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধানে ইউরোপীয় দেশগুলোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের আরও ঘনিষ্ঠ ও প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।

ভাদেফুল বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতার বড় একটি অংশ এখন পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্টের দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ পরিচালনা করেছেন। তবে তাঁর মতে, এই প্রক্রিয়ায় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আরও সরাসরি যুক্ত হতে পারেন। এ কারণেই তিনি রুবিওকে যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করতে চান।

জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা ধরনের আলোচনা চললেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে কূটনৈতিক যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা সাম্প্রতিক সময়ে অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন করে আলোচনা এগিয়ে নিতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ নিজেদের কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

ভাদেফুলের সাম্প্রতিক ইউক্রেন সফরও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেনের নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি যুদ্ধের বাস্তবতা ও দেশটির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার পর জার্মানি এখন কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা বাড়াতে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। বার্লিনের দৃষ্টিতে, শুধু ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি যোগাযোগই যথেষ্ট নয়; রাশিয়ার সঙ্গে তুলনামূলক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা দেশগুলোকেও আলোচনার প্রক্রিয়ায় কাজে লাগানো প্রয়োজন।

এ কারণে তুরস্ক, উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ এবং মিসরের সঙ্গে যোগাযোগ করছে জার্মানি। ভাদেফুল জানিয়েছেন, এসব দেশের সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু করার বিষয়ে কথা বলছে বার্লিন। জার্মানির হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ার সঙ্গে এসব দেশের সম্পর্ক ইউরোপের অধিকাংশ দেশের তুলনায় ঘনিষ্ঠ। ফলে মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্ভাব্য আলোচনার ক্ষেত্রে তারা মধ্যস্থতাকারী কিংবা গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগের সেতু হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষ করে তুরস্ক অতীতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ের যোগাযোগ এবং আলোচনায় ভূমিকা রেখেছে। তাই যুদ্ধ বন্ধের নতুন কোনো উদ্যোগে আঙ্কারার সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে ইউরোপের আগ্রহ রয়েছে। একইভাবে উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ এবং মিসরের সঙ্গে রাশিয়ার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ থাকায় তাদের মাধ্যমেও মস্কোর অবস্থান সম্পর্কে ধারণা নেওয়া কিংবা আলোচনার পরিবেশ তৈরির সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে জার্মানি।

ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে ইউরোপের ওপরও এর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাব পড়ছে। যুদ্ধের শুরু থেকে ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনকে সামরিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, জ্বালানি সরবরাহ, অভিবাসন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে ইউরোপকে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। ফলে যুদ্ধের একটি টেকসই ও রাজনৈতিক সমাধান ইউরোপীয় দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তবে যুদ্ধ বন্ধের যেকোনো উদ্যোগের ক্ষেত্রে ইউক্রেনের স্বার্থ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কিয়েভের অবস্থানকে পাশ কাটিয়ে কোনো সমঝোতা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে পারবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন রয়েছে। জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ তাই কূটনৈতিক সমাধানের পাশাপাশি ইউক্রেনের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়ে আসছে।

অন্যদিকে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচনার গতি কমে যাওয়ায় কূটনৈতিক উদ্যোগের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফের রাশিয়া সফর নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছে ক্রেমলিন। গত সপ্তাহে রুশ কর্তৃপক্ষ জানায়, তাঁদের পরবর্তী সম্ভাব্য রাশিয়া সফর সম্পর্কে মস্কোর কাছে তখনও কোনো নির্দিষ্ট তথ্য ছিল না।

তবে এর অর্থ এই নয় যে রাশিয়া আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। রুশ উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কোনো প্রস্তাব শুনতে এবং আলোচনার প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে মস্কো প্রস্তুত। তাঁর এই বক্তব্য কূটনৈতিক যোগাযোগের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি—এমন একটি বার্তা দিয়েছে।

জার্মানির জন্য এখন বড় প্রশ্ন হলো, কীভাবে এই সীমিত কূটনৈতিক সুযোগকে আবার কার্যকর আলোচনায় রূপ দেওয়া যায়। ভাদেফুলের রুবিওর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের উদ্যোগ সেই প্রচেষ্টারই অংশ। বার্লিন মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির শীর্ষ পর্যায়ের সরাসরি সম্পৃক্ততা আলোচনাকে আরও রাজনৈতিক গুরুত্ব দিতে পারে এবং বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ বাড়াতে পারে।

মার্কো রুবিও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ। ইউক্রেন যুদ্ধের মতো জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ক্ষেত্রে তাঁর সরাসরি সম্পৃক্ততা ইউরোপের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা এবং রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতার কাঠামো নিয়ে আরও সমন্বিত কূটনৈতিক অবস্থান তৈরির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

তবে শান্তি আলোচনার পথ যে সহজ নয়, সেটিও স্পষ্ট। রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধের লক্ষ্য, ভূখণ্ড, নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ সামরিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা নিয়ে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে। এসব বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ পুনরায় শুরু করাই যথেষ্ট হবে না। ইউক্রেন এবং ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোকেও আলোচনার কাঠামোর মধ্যে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে।

এ কারণেই জার্মানি একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে তুলনামূলক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা দেশগুলোর সঙ্গেও আলোচনা করছে। বার্লিনের এই কৌশলের লক্ষ্য হতে পারে সম্ভাব্য আলোচনার জন্য আরও বিস্তৃত একটি আন্তর্জাতিক পরিসর তৈরি করা, যেখানে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের প্রভাব ও যোগাযোগ ব্যবহার করে যুদ্ধ বন্ধের পথ খুঁজে বের করতে পারে।

ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রত্যাশা যত বাড়ছে, ততই কূটনীতির গুরুত্ব সামনে আসছে। দীর্ঘ সংঘাতের ফলে সাধারণ মানুষের জীবন, অবকাঠামো ও অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়েছে, তার পরিমাণও ক্রমেই বেড়েছে। তাই যুদ্ধক্ষেত্রের পাশাপাশি কূটনৈতিক টেবিলেও সমাধানের পথ খোঁজা জরুরি হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতিতে জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর রুবিওকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা। এতে শুধু ওয়াশিংটনের ভূমিকা নয়, ইউরোপের নিজস্ব কূটনৈতিক সক্রিয়তার বিষয়টিও প্রতিফলিত হচ্ছে। তুরস্ক, উপসাগরীয় দেশ ও মিসরের মতো রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে জার্মানি যে বৃহত্তর কূটনৈতিক পরিসর তৈরির চেষ্টা করছে, সেটি ভবিষ্যতের আলোচনায় নতুন কোনো সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও ইউক্রেনের রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং আলোচনায় বসার বাস্তব প্রস্তুতির ওপর। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ না থাকাটাই আন্তর্জাতিক কূটনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জার্মানি সেই দরজাটি আরও কিছুটা খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকা চাইছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত