ছয় মাসে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রবণতা বেশি: সিপিডি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৫ বার
ছয় মাসে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রবণতা বেশি: সিপিডি

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও সামগ্রিক চিত্রে নেতিবাচক প্রবণতাই বেশি বলে মনে করছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণে রাজস্ব আদায়, শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সরকারি ঋণনির্ভরতার মতো গুরুত্বপূর্ণ সূচকে চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রত্যাশিত স্বস্তি এখনো ফেরেনি বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।

সোমবার ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক মিডিয়া সংলাপে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে সিপিডি। রাজধানীতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানের সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খানসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

সিপিডির হিসাবে, চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। সরকারের নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে যে মাত্রার প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, বর্তমান প্রবণতায় তা অর্জন করা কঠিন বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি। রাজস্ব ঘাটতি বাড়লে সরকারের উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক ব্যয় পরিচালনায় চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতাও বাড়তে পারে বলে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা।

সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতিতে রাজস্ব আহরণের গতি সেই লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এনবিআরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে। মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধিও ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতার পাশাপাশি সরকারের ব্যাংকনির্ভরতাও বেড়েছে। সিপিডির হিসাবে, ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার নির্ভরতা ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৩ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। এ ধরনের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ সরকারি ঋণগ্রহণ বাড়লে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ও আগ্রহে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।

অন্যদিকে বৈদেশিক সহায়তার ক্ষেত্রেও কিছুটা দুর্বলতা দেখা গেছে। নিট বৈদেশিক সহায়তা ৭৭১ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৩৪ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে বলে সিপিডির পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। বৈদেশিক অর্থায়নের প্রবাহ কমে গেলে উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।

শিল্প খাতের পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছে সিপিডি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদীর তিন প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এসব কারখানা বন্ধ হয়ে সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন। অর্থনীতির জন্য এই সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কয়েক লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা, পরিবার ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা।

একটি কারখানা বন্ধ হওয়ার অর্থ শুধু একজন শ্রমিকের চাকরি হারানো নয়। এর প্রভাব পড়ে শ্রমিকের পরিবারের খাদ্য, বাসস্থান, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর। শিল্পাঞ্চলগুলোতে যখন একের পর এক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ করে দেয়, তখন স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, আবাসন ও ক্ষুদ্র সেবাখাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে শিল্পে কর্মসংস্থান কমে যাওয়া সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা যায়, শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে শূন্যে নেমেছে। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে। এর অর্থ হলো শিল্প খাতে নতুন গতি সৃষ্টির বদলে উৎপাদন কার্যক্রম অনেকটা স্থবির অবস্থায় রয়েছে। শিল্প উৎপাদনে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। একই সময়ে নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার প্রবৃদ্ধিও ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। এসব সূচককে বিনিয়োগ পরিবেশে দুর্বলতার গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখছে সিপিডি।

শিল্প খাতে জ্বালানি সংকটও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, এলএনজি সংগ্রহে জটিলতা এবং কার্গো গ্রহণের সমস্যার কারণে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট তৈরি হয়েছে বলে সিপিডির পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়। টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেলবোর্ড ও সিরামিকের মতো গ্যাসনির্ভর শিল্পে এর প্রভাব পড়েছে। শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার ১ হাজার ১৮৬ এমএমসিএফ থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ এমএমসিএফে নেমেছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধিতেও দুর্বলতা দেখা গেছে। এ খাতের প্রবৃদ্ধি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। শিল্প উৎপাদন বাড়াতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে অর্থনীতির সব সূচকই যে নেতিবাচক, তা নয়। মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে সিপিডির পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে এসেছে। যদিও এই হ্রাসকে স্বস্তির একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতির বর্তমান হার এখনো সাধারণ মানুষের জন্য যথেষ্ট চাপের। বিশেষ করে খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় যখন পরিবারের বাজেটে বড় অংশ দখল করে, তখন মূল্যস্ফীতির সামান্য কমতিও তাৎক্ষণিকভাবে মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে না।

অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়নের পাশাপাশি সরকারের সংস্কার ও সুশাসন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সিপিডি। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি সমন্বিত ও তথ্যভিত্তিক দলিল তৈরি না করায় বর্তমানে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ এবং অগ্রগতি মূল্যায়ন করা কঠিন হচ্ছে। তাঁর মতে, সরকার যে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নিয়েছিল, সেটি বারবার বলা হলেও সেই সময়কার বাস্তব অবস্থার একটি পূর্ণাঙ্গ ভিত্তিচিত্র তৈরি করা হয়নি।

নতুন সরকারের কাছে প্রধান প্রত্যাশার মধ্যে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিকে গতিশীল করার প্রত্যাশা থাকলেও এসব ক্ষেত্রে এখনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে সিপিডির পর্যবেক্ষণ।

সংস্কার কর্মসূচির ক্ষেত্রেও সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি। নতুন সরকারের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি ও পদক্ষেপ মূল্যায়নের জন্য সিপিডি প্রায় ৩৬২টি পদক্ষেপের তালিকা তৈরি করেছে। এসব উদ্যোগকে নয়টি ভাগে বিভক্ত করে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’-এর আওতায় মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

সুশাসনের ক্ষেত্রে ১০৫টি ঘটনা মূল্যায়নের আওতায় রাখা হয়েছে। সরকারি সংসদ সদস্যদের প্লট ও গাড়ি না নেওয়ার সিদ্ধান্ত, রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে সিপিডি। তবে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচ্চপদে নিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার সরকারি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে কিছু নিয়োগের অসামঞ্জস্য রয়েছে বলেও মন্তব্য করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে সিপিডির মূল্যায়ন বলছে, নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হলেও সামগ্রিকভাবে চ্যালেঞ্জের পাল্লা এখনো ভারী। রাজস্ব আদায় বাড়ানো, শিল্পে উৎপাদন ও বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান রক্ষা, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার মতো বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের দাবি রাখে।

অর্থনীতির এই সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। বিনিয়োগকারী যখন নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেবেন, উদ্যোক্তা যখন কারখানা সম্প্রসারণের কথা ভাববেন কিংবা একজন শ্রমিক যখন নিশ্চিত হতে চাইবেন তাঁর কর্মসংস্থান আগামীকালও থাকবে—তখন অর্থনৈতিক নীতির বাস্তব সাফল্য নির্ধারিত হবে। তাই শুধু সামষ্টিক সূচকের উন্নতি নয়, অর্থনীতির সেই সুফল সাধারণ মানুষের জীবন ও কর্মসংস্থানে কতটা পৌঁছাচ্ছে, সেটিই আগামী দিনের বড় পরীক্ষার জায়গা বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত