রংপুরে শিক্ষক পরিবার হত্যা: দুই আসামির স্বীকারোক্তি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১০ বার
রংপুরে শিক্ষক পরিবার হত্যা: দুই আসামির স্বীকারোক্তি

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রংপুর নগরীতে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া এই জবানবন্দির পর আদালত তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। ভয়াবহ এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দুই তরুণের স্বীকারোক্তির খবর সামনে আসার পর পুরো ঘটনায় নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রংপুর কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মিলন চ্যাটার্জি জানিয়েছেন, রোববার বিকাল ৫টার দিকে গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে রংপুরের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হয়। পরে বিচারক মো. রফিকুল ইসলামের আদালতে তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। জবানবন্দি গ্রহণের পর বিচারক দুই আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মুগ্ধ দাসের বয়স ২৩ বছর এবং সিদ্ধার্থ দাসের বয়স ১৯ বছর। তারা দুজনই নিহত পরিবারের বাড়ির আশপাশের এলাকার বাসিন্দা এবং পরস্পরের আত্মীয়। সিদ্ধার্থ রংপুর নগরীর একটি স্বর্ণের দোকানে কাজ করেন। মুগ্ধ কাজ করেন সিটি বাজারের একটি মাছের দোকানে।

তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুই আসামি আদালতে হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। এ কারণে তাদের আর রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। তবে আদালতে দেওয়া জবানবন্দির পূর্ণাঙ্গ বিষয়বস্তু তদন্তের স্বার্থে পুলিশ যাচাই করছে। মামলার তদন্তও অব্যাহত রয়েছে।

এর আগে শনিবার রাতে রংপুর নগরীর কামাল কাছনা মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহতরা হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী এবং স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী। একই পরিবারের চারজনের এমন মৃত্যু এলাকায় গভীর শোক ও আতঙ্কের সৃষ্টি করে।

ঘটনার পরপরই হত্যাকাণ্ডের কারণ এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত—এ নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। পরিবারের সদস্যদের মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। এরপর আশপাশের লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়। রোববার ভোরে মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে আটক করে পুলিশ।

পরে রোববার দুপুরে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্য তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি ভবনের ওপর দিয়ে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ওঠেন। সেখানে তারা মাদক সেবন করছিলেন বলে পুলিশের কাছে দেওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে।

ছাদে তাদের উপস্থিতির বিষয়টি টের পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী সেখানে যান এবং তারা কেন ছাদে অবস্থান করছেন, তা জানতে চান। এ সময় দুজনের সঙ্গে তাঁর কথা কাটাকাটি বা বিরোধের একপর্যায়ে তাঁকে গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। এরপর ঘটনাটি আরও ভয়াবহ দিকে গড়ায়।

গণপতির চিৎকার শুনে তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী সিঁড়ি দিয়ে ছাদে উঠে আসেন। পুলিশ বলছে, তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর মায়ের চিৎকার শুনে এগিয়ে আসেন তাঁদের মেয়ে আগামী চক্রবর্তী। তাকেও গামছা ও রশি ব্যবহার করে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

পরিবারের একের পর এক সদস্যকে হত্যার পরও হামলাকারীরা থামেনি বলে পুলিশের বক্তব্য। ঘরে থাকা ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী তখন ঘুমিয়ে ছিল। পুলিশ জানিয়েছে, ঘুমন্ত অবস্থায় তাকেও কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয় বলে আসামিরা জবানবন্দিতে জানিয়েছেন।

একটি পরিবারের চারজন মানুষের এমন নির্মম মৃত্যু শুধু একটি অপরাধের ঘটনা নয়, এটি একটি পরিবারের সম্পূর্ণ অস্তিত্বকে মুহূর্তের মধ্যে বিপর্যস্ত করে দেওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা। অবসরজীবনে থাকা একজন শিক্ষক, তাঁর স্ত্রী, পড়াশোনায় থাকা তরুণী মেয়ে এবং স্কুলপড়ুয়া ছোট ছেলে—চারজনের জীবন একই ঘটনায় থেমে গেছে। স্থানীয় মানুষের কাছে পরিবারটি পরিচিত হওয়ায় ঘটনাটি তাদের মধ্যে আরও গভীর প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।

বিশেষ করে পরিবারের শিশু সদস্যের মৃত্যু স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে। যে বয়সে একটি শিশুর স্কুল, বন্ধু, পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সেই তাকে নির্মম হত্যার শিকার হতে হয়েছে। একইভাবে পরিবারের তরুণী সদস্যের মৃত্যুও স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছে অত্যন্ত বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের যে চিত্র উঠে এসেছে, তাতে ঘটনাটি আকস্মিক বিরোধ থেকে শুরু হয়ে একপর্যায়ে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞে পরিণত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে হত্যার পেছনে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য কী ছিল, আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে বাড়িতে ঢুকেছিল কি না এবং ঘটনাটির সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না—এসব বিষয় এখনো তদন্তের আওতায় রয়েছে।

দুই আসামির আদালতে দেওয়া জবানবন্দি তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে কোনো আসামির স্বীকারোক্তিই মামলার চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণ করে না। তদন্তের অন্যান্য আলামত, সাক্ষ্য, ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত তথ্য এবং ফরেনসিক পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে জবানবন্দির তথ্য মিলিয়ে দেখার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বলছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন করাই তদন্তের মূল লক্ষ্য। নিহতদের পরিবারের স্বজন ও স্থানীয় মানুষের মধ্যেও এখন একটাই প্রত্যাশা—ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আসুক এবং দায়ীদের আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত হোক।

রংপুর নগরীর মতো জনবহুল এলাকায় একটি পরিবারের চার সদস্যের হত্যাকাণ্ড নাগরিক নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে বসতবাড়ির নিরাপত্তা, মাদকাসক্তি, অপরাধপ্রবণতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একটি অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়; ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে সামাজিক ও আইনগত প্রতিরোধ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়ও আতঙ্ক তৈরি করেছে। প্রতিবেশী একটি বাড়িতে এমন হত্যাকাণ্ড ঘটায় অনেকেই নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। একই সঙ্গে নিহত পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানাতে স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা এগিয়ে এসেছেন।

এদিকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুই আসামির জবানবন্দি রেকর্ড হওয়ার পর তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তদন্তের পরবর্তী ধাপে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য তথ্য যাচাই করা হবে। প্রয়োজনীয় আলামত পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য সংগ্রহের মাধ্যমে মামলাটির তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

রংপুরের এই হত্যাকাণ্ডে দুই আসামির স্বীকারোক্তি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হলেও পুরো ঘটনার রহস্য উদঘাটনে এখনো আরও কাজ বাকি। কেন চারজনকে হত্যা করা হলো, ঘটনার সময় আসামিদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল এবং হত্যার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা ব্যক্তি ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন তদন্তের কেন্দ্রবিন্দু।

চারটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার এই ঘটনায় নিহতদের স্বজনদের কাছে কোনো তদন্তই হারানো মানুষগুলোকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। তবে সুষ্ঠু তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং দায়ীদের উপযুক্ত শাস্তি হয়তো স্বজনদের জন্য কিছুটা হলেও ন্যায়বিচারের অনুভূতি তৈরি করতে পারে। রংপুরের এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড তাই শুধু একটি মামলার তদন্ত নয়, একই সঙ্গে নিরাপদ সমাজ ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত