প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির প্রভাবে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষিজমি প্লাবিত হয়েছে। রবিবার বিকেল থেকে সীমান্তবর্তী এই উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে পানি বাড়তে শুরু করে। একপর্যায়ে অন্তত ২৫০ হেক্টর কৃষিজমি পানির নিচে চলে যায়। তবে সোমবার দুপুরের পর কয়েকটি এলাকায় পানি কমতে শুরু করায় আপাতত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা কিছুটা কমেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আখাউড়ার হাওড়া নদীসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকা দিয়ে উজানের পানি প্রবেশ করে। রবিবার বিকেল থেকে পানি বাড়তে থাকায় দক্ষিণ ইউনিয়ন ও মোগড়া ইউনিয়নের বেশ কিছু কৃষিজমি তলিয়ে যায়। মাঠে থাকা ফসল পানিতে ডুবে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে শুরু হয় উদ্বেগ। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলের জমিতে পানি দীর্ঘসময় জমে থাকলে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
সোমবার সকাল থেকে হাওড়া নদীর আশপাশের এলাকায় পানির উচ্চতা কমতে শুরু করে। দুপুর নাগাদ বেশ কিছু জমি থেকে পানি নামতে দেখা যায়। তবে কালন্দী খালসংলগ্ন এলাকার পরিস্থিতি তখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ওই এলাকার কৃষিজমিতে পানি আগের মতোই অবস্থান করছিল বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
আখাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা জানিয়েছেন, হঠাৎ পানি বাড়ায় দক্ষিণ ইউনিয়ন ও মোগড়া ইউনিয়নের কিছু কৃষিজমি তলিয়ে গেছে। তবে পানি দ্রুত নেমে গেলে ফসলের বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা কম বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
উজানের পানিতে জমি তলিয়ে যাওয়ার ঘটনায় কৃষকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একটি কৃষিজমি শুধু ফসল উৎপাদনের জায়গা নয়, গ্রামীণ পরিবারের আয় ও খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। ধানসহ বিভিন্ন ফসলের জমিতে কয়েকদিন পানি জমে থাকলে গাছের শিকড়ে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে এবং ফলন কমে যেতে পারে। তবে পানি দ্রুত নেমে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই ফসল বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে পারে।
আখাউড়া উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাপসী রাবেয়া সোমবার দুপুরে জানান, হাওড়া নদীর আশপাশের এলাকার পানি কমতে শুরু করেছে। তবে কালন্দী খাল এলাকার কৃষিজমিতে পানি আগের মতোই রয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো বাড়িঘরে পানি ওঠেনি এবং আশ্রয়কেন্দ্র খোলার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নতুন করে পানি বাড়তে পারে কি না, সে বিষয়েও পর্যবেক্ষণ চলছে। স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করছে।
আখাউড়ার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ভারতের ত্রিপুরা থেকে নেমে আসা পানির প্রভাব সীমান্তবর্তী নিম্নাঞ্চলে দ্রুত পড়ে। ত্রিপুরার পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টি হলে বিভিন্ন ছড়া, খাল ও নদী দিয়ে পানি নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। সীমান্ত অতিক্রম করে সেই পানি বাংলাদেশের আখাউড়া ও আশপাশের এলাকায় প্রবেশ করলে অল্প সময়ের মধ্যে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এবারও কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির পর একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ত্রিপুরার বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে। রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে পানি বাড়ার পাশাপাশি বহু মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন হয়েছে। এরই মধ্যে ত্রিপুরার ১৭টি আশ্রয়শিবিরে চার শতাধিক পরিবারের সদস্য আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ত্রিপুরায় বৃষ্টি আরও অব্যাহত থাকলে উজানের পানির প্রবাহ বাড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে আখাউড়ার সীমান্তবর্তী নিম্নাঞ্চলেও নতুন করে পানি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে বর্তমানে হাওড়া নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। ফলে আপাতত বড় ধরনের বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি।
স্থানীয় কৃষকদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন জমিতে জমে থাকা পানি দ্রুত নেমে যাওয়া। কারণ পানি যত দ্রুত সরে যাবে, ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা তত কম থাকবে। কৃষি কর্মকর্তারাও মনে করছেন, পানি দ্রুত নেমে গেলে অধিকাংশ জমির ফসল বড় ধরনের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। তবে নিচু জমিতে পানি বেশি সময় ধরে থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
কৃষি খাতে এমন আকস্মিক জলাবদ্ধতা কৃষকের জন্য আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করে। ফসল নষ্ট হলে একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যাহত হয়, অন্যদিকে কৃষককে পুনরায় জমি প্রস্তুত, বীজ ও সার সংগ্রহ এবং শ্রমিকের পেছনে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে। অনেক কৃষক মৌসুমি ফসলের ওপর নির্ভর করে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করেন। তাই কয়েক দিনের জলাবদ্ধতাও তাঁদের পারিবারিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে আখাউড়ার বর্তমান পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত কোনো বসতবাড়ি প্লাবিত হয়নি বলে প্রশাসন জানিয়েছে। ফলে মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়নি। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখায় হঠাৎ পানি বাড়লে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
সীমান্তবর্তী অঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উজানের বৃষ্টিপাতের তথ্য দ্রুত পাওয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে তা পৌঁছে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাহাড়ি ঢলের পানি অনেক সময় খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিচু এলাকায় প্রবেশ করে। আগে থেকে সতর্কতা পাওয়া গেলে কৃষকরা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারেন এবং প্রশাসনও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের জন্য আগাম ব্যবস্থা নিতে পারে।
আখাউড়ার কৃষিজমি প্লাবনের ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দিয়েছে সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা কতটা আন্তঃসীমান্ত নদী ও পানিপ্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। এক দেশের পাহাড়ি এলাকায় কয়েক দিনের অতিরিক্ত বৃষ্টির প্রভাব কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অন্য দেশের সীমান্তবর্তী জনপদে এসে পড়তে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে এসব এলাকার পানি প্রবাহ, নদী-খাল, জলাধার ও নিষ্কাশনব্যবস্থার সমন্বিত ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ঘটনা বাড়তে থাকলে সীমান্তবর্তী নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক প্লাবনের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নত করা, নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
আখাউড়ায় বর্তমানে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক হওয়ার পথে থাকলেও নজরদারি কমানোর সুযোগ নেই। ত্রিপুরায় বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতি এবং উজান থেকে পানির প্রবাহের ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে পরবর্তী অবস্থার গতিপথ। হাওড়া নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে থাকা স্বস্তির বিষয় হলেও নিম্নাঞ্চলের জমিতে পানি থাকা কৃষকদের জন্য এখনো উদ্বেগের কারণ।
সবশেষে কৃষি বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের পর্যবেক্ষণই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পানি দ্রুত নেমে গেলে বড় ধরনের ফসলহানি এড়ানো সম্ভব হবে। কিন্তু নতুন করে উজানের ঢল নামলে পরিস্থিতি আবার বদলে যেতে পারে। তাই কৃষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পরিস্থিতির নিয়মিত তথ্য দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
ত্রিপুরার টানা বৃষ্টির প্রভাবে আখাউড়ায় যে সাময়িক জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে, তা আপাতত বড় বন্যায় রূপ নেয়নি। তবে অন্তত ২৫০ হেক্টর কৃষিজমি প্লাবিত হওয়ার ঘটনা সীমান্তবর্তী কৃষিনির্ভর মানুষের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। নদীর পানি দ্রুত কমে গিয়ে কৃষকের জমি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে—এটাই এখন স্থানীয় মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।