এআই বিনিয়োগে ১০.২ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার বিক্রি আলিবাবার

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৭ বার
এআই বিনিয়োগে ১০.২ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার বিক্রি আলিবাবার

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিনিয়োগ আরও বাড়াতে বড় অঙ্কের নতুন শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দিয়েছে চীনের প্রযুক্তি জায়ান্ট আলিবাবা। আর এই ঘোষণার পরই হংকংয়ের শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির শেয়ারে বড় ধরনের দরপতন দেখা দিয়েছে। সোমবার লেনদেনের একপর্যায়ে আলিবাবার শেয়ারের দাম ১০ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। এআই অবকাঠামো, চিপ এবং নতুন প্রজন্মের এআই মডেল তৈরিতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যেমন উদ্বেগ তৈরি করেছে, তেমনি শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে পাওয়া অর্থের চাহিদাও যে প্রবল, সেটিও সামনে এসেছে।

আলিবাবা জানিয়েছে, তারা প্রায় ৮ হাজার কোটি হংকং ডলার বা ১০ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নতুন শেয়ার বিক্রি করবে। প্রতিটি শেয়ারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১১২ দশমিক ৭০ হংকং ডলার, যা গত শুক্রবারের বাজারদরের তুলনায় ৮ দশমিক ৪ শতাংশ কম। নতুন করে প্রায় ৭১ কোটি শেয়ার বাজারে আসবে। এতে শেয়ারসংখ্যা বৃদ্ধির পর কোম্পানিটির মোট শেয়ারের প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ নতুন শেয়ার হিসেবে যুক্ত হবে।

শেয়ার বিক্রির ঘোষণার পর বাজারে তাৎক্ষণিক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও নতুন শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ছিল উল্লেখযোগ্য। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলারের অর্ডার জমা পড়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারী ও সার্বভৌম বিনিয়োগকারীদের অর্ডারের পরিমাণ প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বাজারে আলিবাবার এআই-কেন্দ্রিক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও বড় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এখনো কোম্পানিটির দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা নিয়ে আস্থা রাখছে।

আলিবাবার এই বিপুল অর্থ সংগ্রহের মূল লক্ষ্য এআই খাত। কোম্পানিটি জানিয়েছে, শেয়ার বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ এআই চিপ, এআই অবকাঠামো এবং বিভিন্ন এআই মডেল তৈরিতে ব্যয় করা হবে। বর্তমান প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় এআইকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে আলিবাবাও নিজেদের ব্যবসার ভবিষ্যৎ অবস্থান শক্তিশালী করতে এ খাতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।

বিশেষ করে আলিবাবার কিউয়েন বা Qwen এআই মডেল চীনের বাজারে উল্লেখযোগ্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এআই-ভিত্তিক সেবা ও প্রযুক্তির চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানিটির এআই ব্যবসা রাজস্ব বৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে। তবে এই সম্ভাবনার পাশাপাশি এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের আর্থিক চাপও এখন কোম্পানিটির জন্য বড় বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক প্রান্তিক আর্থিক প্রতিবেদনে সেই চাপের প্রতিফলনও দেখা গেছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আলিবাবার নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৫ শতাংশ কমেছে। এআই কার্যক্রম সম্প্রসারণ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে বাড়তি ব্যয় কোম্পানির মুনাফায় বড় প্রভাব ফেলেছে বলে বাজার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। ফলে একদিকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে কোম্পানিটি, অন্যদিকে স্বল্পমেয়াদে মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

আলিবাবার জন্য এ পরিস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্তের প্রতিফলন। প্রযুক্তি খাতে এখন এআই নিয়ে প্রতিযোগিতা শুধু নতুন সফটওয়্যার বা মডেল তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শক্তিশালী কম্পিউটিং অবকাঠামো, উন্নত এআই চিপ, ডেটা সেন্টার এবং বড় আকারের মডেল প্রশিক্ষণের জন্য বিপুল মূলধনের প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও আর্থিক শক্তি বাড়াতে হচ্ছে।

আলিবাবাও সেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকতে চাইছে না। কোম্পানিটি চলতি বছর তাদের এআই কার্যক্রমকে ক্লাউড ব্যবসা থেকে আলাদা করেছে। এর মাধ্যমে এআইকে একটি স্বতন্ত্র ও কৌশলগত ব্যবসা হিসেবে আরও গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে চিপ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান টি-হেডকে ভবিষ্যতে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার প্রস্তুতিও নিচ্ছে আলিবাবা।

কোম্পানিটির মূলধন ব্যয়ের পরিকল্পনাও এআইকে ঘিরে তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয়টি স্পষ্ট করছে। আলিবাবা তিন বছরের জন্য ৩৮ হাজার কোটি ইউয়ানের মূলধন ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। এর প্রায় অর্ধেক অর্থ ইতোমধ্যে বরাদ্দ করা হয়েছে। অর্থাৎ আগামী কয়েক বছর এআই অবকাঠামো ও প্রযুক্তি উন্নয়নে কোম্পানিটির বড় ধরনের ব্যয় অব্যাহত থাকবে।

আলিবাবার প্রধান নির্বাহী এডি উ মনে করছেন, এআই অবকাঠামোয় এসব বিনিয়োগ থেকে তুলনামূলক দ্রুত সুফল পাওয়া সম্ভব। তাঁর প্রত্যাশা, বিনিয়োগের অর্থ তিন বছরের মধ্যে ফেরত আসতে পারে, এমনকি আড়াই বছরেও এর সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ ধরনের প্রত্যাশা বাস্তবে কতটা পূরণ হবে, সেটিই এখন বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় প্রশ্ন।

বাজারে শেয়ারের দরপতনের পেছনে মূল উদ্বেগের একটি কারণ হলো নতুন শেয়ার ইস্যুর ফলে বিদ্যমান শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানার অংশ কিছুটা কমে যাওয়া। নতুন শেয়ার বাজারে আসায় কোম্পানির মোট শেয়ারের সংখ্যা বাড়বে। ফলে পুরোনো বিনিয়োগকারীদের মালিকানার অনুপাত কমে যাবে। একই সঙ্গে বাজারদরের তুলনায় কম দামে শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্তও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি করেছে।

তবে আলিবাবার জন্য বিষয়টি শুধু শেয়ারমূল্যের সাময়িক ওঠানামার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং কোম্পানিটি এখন এমন এক প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় প্রবেশ করেছে, যেখানে ভবিষ্যতের বাজার নেতৃত্ব নির্ধারণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই গবেষণা, অবকাঠামো ও মডেল উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। আলিবাবার নতুন শেয়ার বিক্রিও সেই বৃহত্তর প্রতিযোগিতার অংশ।

বিশ্বব্যাপী এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক কৌশলও বদলে দিচ্ছে। আগে ক্লাউড কম্পিউটিং, ই-কমার্স বা ডিজিটাল সেবাকে প্রবৃদ্ধির প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হলেও এখন এআই সেই কেন্দ্রীয় অবস্থান দখল করছে। আলিবাবার মতো একটি বিশাল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্য এআইয়ে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

তবে বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের বাস্তব ফল। এআই খাতে বিনিয়োগ বাড়ালেই যে আয় ও মুনাফা একই গতিতে বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রযুক্তির বাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং প্রতিযোগীরাও একই সময়ে নতুন মডেল ও অবকাঠামো তৈরি করছে। ফলে আলিবাবাকে শুধু অর্থ ব্যয় করলেই হবে না, সেই বিনিয়োগকে কার্যকর ব্যবসায়িক ফলাফলে রূপান্তর করতে হবে।

বিশেষ করে Qwen-এর জনপ্রিয়তা ধরে রাখা, নতুন এআই সেবা বাজারজাত করা, ক্লাউড ও এআই ব্যবসার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং চিপ ও অবকাঠামো সক্ষমতা শক্তিশালী করা কোম্পানিটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এসব ক্ষেত্রে সফলতা এলে বর্তমান বড় বিনিয়োগ ভবিষ্যতে আলিবাবার প্রবৃদ্ধির নতুন ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত সুফল দ্রুত না এলে কোম্পানির মুনাফার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। তখন শেয়ারহোল্ডারদের আস্থা ধরে রাখাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। সোমবারের বাজার প্রতিক্রিয়া অন্তত এটুকু দেখিয়েছে যে বিনিয়োগকারীরা আলিবাবার এআই পরিকল্পনা নিয়ে আগ্রহী হলেও এর আর্থিক ঝুঁকিও গভীরভাবে বিবেচনা করছেন।

১০ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের নতুন শেয়ার বিক্রি তাই আলিবাবার জন্য একই সঙ্গে বড় সুযোগ ও বড় পরীক্ষা। একদিকে এই অর্থ কোম্পানিকে এআই দৌড়ে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরির সুযোগ দেবে, অন্যদিকে বিনিয়োগের ফল দ্রুত দেখানোর চাপও তৈরি করবে। আগামী কয়েক বছরে এআই ব্যবসা থেকে কতটা রাজস্ব ও মুনাফা তৈরি করতে পারে, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করবে এই বিশাল মূলধন ব্যয়ের সাফল্য।

সব মিলিয়ে আলিবাবার শেয়ারবাজারে তাৎক্ষণিক ধাক্কা এলেও কোম্পানিটির দীর্ঘমেয়াদি কৌশল স্পষ্ট। এআইকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির কেন্দ্র হিসেবে ধরে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এখন সেই বিনিয়োগ কতটা কার্যকর হয় এবং Qwenসহ এআই ব্যবসা কত দ্রুত লাভজনকভাবে সম্প্রসারিত হতে পারে, সেটিই হবে আলিবাবার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং এআই প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থান তৈরি—দুই লক্ষ্যই একসঙ্গে অর্জন করতে হবে চীনা এই প্রযুক্তি জায়ান্টকে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত