প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তার চীনের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি শ্রমবাজারে তৈরি করছে গভীর উদ্বেগ। উৎপাদন, সফটওয়্যার, গণমাধ্যম, অনুবাদ, কনটেন্ট তৈরি থেকে শুরু করে খাবার সরবরাহের মতো বিভিন্ন কাজে এআই ও রোবটের ব্যবহার বাড়ছে। এতে একদিকে উৎপাদনশীলতা ও কাজের গতি বাড়ছে, অন্যদিকে একই ধরনের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করা বিপুলসংখ্যক মানুষের সামনে চাকরি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের কম্পিউটার প্রোগ্রামার ফেই ঝাওজুনের অভিজ্ঞতা এ পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তার কর্মস্থলে একসময় আলোচনা শুরু হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষের বিকল্প হিসেবে কোডিংয়ের কাজ করতে পারবে কি না। এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। আলোচনার মাত্র দুই সপ্তাহ পর ফেইসহ প্রায় ১৬০ জন কর্মী চাকরি হারান বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ফেইয়ের মতো কর্মীদের অভিজ্ঞতা এখন চীনের প্রযুক্তিনির্ভর শ্রমবাজারে বড় একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে। যে প্রযুক্তি একসময় মানুষের কাজকে সহজ করার হাতিয়ার হিসেবে দেখা হতো, সেটিই এখন কিছু ক্ষেত্রে মানুষের কাজের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে এমন কাজ, যেগুলো নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে বারবার করা যায় এবং যেগুলোর জন্য তুলনামূলকভাবে সীমিত দক্ষতা প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে এআইয়ের প্রভাব দ্রুত দৃশ্যমান হচ্ছে।
চীনে শুধু কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়েই এআইয়ের ব্যবহার সীমাবদ্ধ নেই। স্ক্রিপ্ট লেখা, অনুবাদ, সংবাদ ও অন্যান্য গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট কাজেও প্রযুক্তিটির ব্যবহার বাড়ছে। একই সঙ্গে শারীরিক শ্রমের ক্ষেত্রেও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির বিস্তার ঘটছে। খাবার সরবরাহের কাজে রোবট ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ায় লাখ লাখ ডেলিভারি কর্মীর ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। প্রযুক্তি যত বেশি সক্ষম হচ্ছে, তত বেশি কাজ মানুষের পরিবর্তে যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
চীনা সরকারও অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়াতে সক্রিয়ভাবে উৎসাহ দিচ্ছে। ‘এআই প্লাস’ উদ্যোগের মাধ্যমে উৎপাদন, পরিষেবা ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রযুক্তিগত ও শিল্প পরিকল্পনাতেও এআইকে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সরকারের দৃষ্টিতে এআইয়ের বিস্তার উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, শিল্পের দক্ষতা উন্নত করা এবং অর্থনীতির প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে প্রযুক্তির এই অগ্রগতির সঙ্গে কর্মসংস্থানের ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ মনে করছেন, এআই উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে অর্থনীতিতে নতুন মূল্য সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু একই সময়ে নির্দিষ্ট ধরনের কাজের ওপর নির্ভরশীল কর্মীদের জন্য এর প্রভাব কঠিন হতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠান যখন একই কাজ কম কর্মী দিয়ে দ্রুত ও কম খরচে করতে সক্ষম হয়, তখন কর্মীসংখ্যা কমিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
চীনের শ্রমবাজারে তরুণদের পরিস্থিতি এই উদ্বেগকে আরও তীব্র করে তুলেছে। দেশটির সামগ্রিক নগর বেকারত্বের হার প্রায় ৫ শতাংশের কাছাকাছি থাকলেও ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের বেকারত্বের হার এর তুলনায় প্রায় তিন গুণ। শিক্ষা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশের অপেক্ষায় থাকা তরুণদের জন্য এআইয়ের দ্রুত বিস্তার তাই নতুন ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরিতে নতুন কর্মীরা অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান, সেসব কাজ যদি ক্রমেই স্বয়ংক্রিয় হয়ে যায়, তাহলে তরুণদের কর্মজীবনে প্রবেশ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে এআইয়ের প্রভাবকে শুধু চাকরি ধ্বংসের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন না অনেক বিশেষজ্ঞ। চীন বর্তমানে দ্রুত বয়স্ক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশটির কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমছে। এই পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে বিভিন্ন শিল্পে শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের ঘাটতি পূরণে সহায়ক হতে পারে।
অর্থাৎ যে প্রযুক্তি আজ কিছু কর্মীর চাকরি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে, দীর্ঘমেয়াদে সেটিই আবার শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। উৎপাদন খাত থেকে শুরু করে পরিবহন, গুদাম ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা ও বয়স্কদের যত্নের মতো ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে মানুষের ওপর শারীরিক শ্রমের চাপও কমতে পারে।
তবে প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। এআইয়ের যুগে শুধু চাকরি হারানোর ঝুঁকি নয়, কর্মীদের দক্ষতার ধরন পরিবর্তনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আগে যে দক্ষতা একজন কর্মীকে চাকরি পেতে সহায়তা করত, ভবিষ্যতে সেটি হয়তো যথেষ্ট নাও হতে পারে। ফলে নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন হবে।
চীনের কিছু কর্মী অবশ্য এআইকে কেবল হুমকি হিসেবে দেখছেন না। চাকরি হারানোর পর কেউ কেউ এই প্রযুক্তিকেই নতুন আয়ের পথ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন। এআইনির্ভর সেবা, স্বাধীনভাবে কাজ করা এবং ছোট পরিসরে নতুন ব্যবসা শুরু করার মতো সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে তাদের সামনে। ফলে একই প্রযুক্তি কারও জন্য চাকরি হারানোর কারণ হলেও অন্য কারও জন্য নতুন কাজের দরজা খুলে দিতে পারে।
এই পরিবর্তন শ্রমবাজারের প্রচলিত ধারণাকেও বদলে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে সরাসরি প্রতিযোগিতার পরিবর্তে মানুষ কতটা কার্যকরভাবে এআইকে নিজের কাজের সঙ্গে যুক্ত করতে পারছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যে কর্মী প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে নিজের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারবেন, তার জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে পরিবর্তনের এই সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে কর্মীদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এআইয়ের কারণে কোনো খাতে কর্মসংস্থান কমে গেলে নতুন খাতে কর্মীদের স্থানান্তর, পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা না থাকলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুফল বৈষম্য বাড়াতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ও কম দক্ষ কর্মীদের জন্য এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের বর্তমান অভিজ্ঞতা তাই শুধু দেশটির শ্রমবাজারের গল্প নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির সামনে আসন্ন পরিবর্তনেরও একটি ইঙ্গিত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যত দ্রুত উন্নত হচ্ছে, ততই বিভিন্ন দেশের সরকার, প্রতিষ্ঠান ও কর্মীদের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন বাড়ছে। প্রযুক্তিকে থামিয়ে রাখা সম্ভব নয়, কিন্তু প্রযুক্তির কারণে যেন বিপুলসংখ্যক মানুষ অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে না পড়েন, সেই ভারসাম্য তৈরি করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
চীনের শ্রমবাজারে এআইয়ের বর্তমান বিস্তার সেই পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরছে। কোথাও এটি মানুষের কাজ কেড়ে নিচ্ছে, কোথাও কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে, আবার কোথাও নতুন সুযোগও তৈরি করছে। ফলে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের লড়াই হয়তো মানুষ বনাম মেশিনের লড়াই হবে না; বরং প্রযুক্তির সঙ্গে নিজেকে কত দ্রুত মানিয়ে নেওয়া যায়, সেটিই হয়ে উঠবে সাফল্যের অন্যতম প্রধান শর্ত।