দুই দিনে ঘুষের অভিযোগ ৮০৪, দাবি ১৩ কোটি ৬৫ লাখ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ বার
দুই দিনে ঘুষের অভিযোগ ৮০৪, দাবি ১৩ কোটি ৬৫ লাখ

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা অনেক নাগরিকের কাছেই পরিচিত এক বাস্তবতা। কোথাও সেবা দ্রুত দেওয়ার কথা বলে, কোথাও নথি অনুমোদনের অজুহাতে, আবার কোথাও নিয়মিত সেবার জন্যও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করার অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগ সাধারণত বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে থাকে। এবার সেই বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতাগুলোকে এক জায়গায় এনে একটি উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘ঘুষ.সাইট’ নামে নতুন একটি ওয়েবসাইট চালুর পর মাত্র দুই দিনে সেখানে ৮০৪টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগে ঘুষ হিসেবে চাওয়া অর্থের মোট পরিমাণ ১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা।

গত ২১ আগস্ট ওয়েবসাইটটি চালু করা হয়। উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্য, সরকারি সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকেরা কোথায়, কী ধরনের সেবার জন্য এবং কত টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ করছেন—সেই তথ্য এক জায়গায় তুলে ধরা। তবে সাইটে প্রকাশিত অভিযোগকে যাচাই করা তথ্য বা কোনো ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে না বলে স্পষ্ট করেছেন উদ্যোক্তারা।

‘ঘুষ.সাইট’ তৈরি করেছেন দুই বন্ধু সাইফ কবির ও শাহেদ শরিফ। বিদেশের একটি ওয়েবসাইট থেকে ধারণা নিয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁরা প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করেন। তাঁদের লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে চিহ্নিত করা নয়; বরং কোন সরকারি দপ্তর বা সেবার ক্ষেত্রে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ বেশি আসছে, সেই চিত্র সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরা।

ওয়েবসাইটটিতে অভিযোগ জানাতে ব্যবহারকারীকে কয়েকটি মৌলিক তথ্য দিতে হয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নাম, সেবার ধরন, এলাকা, ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ এবং শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল—এসব তথ্যের পাশাপাশি ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগ জানানোর জন্য কোনো অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন নেই। উদ্যোক্তাদের দাবি, পুরো প্রক্রিয়াটি দুই মিনিটেরও কম সময়ে সম্পন্ন করা সম্ভব।

তবে অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের সুযোগ রাখা হয়নি। কোনো ব্যক্তির নাম, পদবি কিংবা ফোন নম্বর উল্লেখ করা যায় না। এর ফলে প্ল্যাটফর্মটির মূল মনোযোগ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরার পরিবর্তে সরকারি সেবা ও দপ্তরকেন্দ্রিক প্রবণতা শনাক্ত করার দিকে রাখা হয়েছে।

অভিযোগ জমা দেওয়ার পর তা সঙ্গে সঙ্গে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় না। প্রথমে মডারেশনের মাধ্যমে অভিযোগ পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে ব্যক্তিগত তথ্য থাকলে তা সরিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আক্রমণাত্মক, অস্পষ্ট কিংবা ওয়েবসাইটের নীতিমালা লঙ্ঘন করে এমন অভিযোগ বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর অভিযোগ ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

প্রকাশিত তথ্যগুলো বিভিন্ন দিক থেকে দেখার সুযোগ রয়েছে। কোন বিভাগ থেকে কত অভিযোগ এসেছে, কোন দপ্তর বা সেবাকে ঘিরে অভিযোগ বেশি, কত টাকা ঘুষ চাওয়া হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত অভিযোগকারী ঘুষ দিয়েছেন কি না—এসব তথ্যের ভিত্তিতে একটি সামগ্রিক চিত্র তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে।

চালুর প্রথম দুই দিনের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে ঢাকা বিভাগ থেকে। এই বিভাগে ৪৩০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬৭টি, রাজশাহীতে ৪৪টি, খুলনায় ৪৩টি, সিলেটে ৩৮টি, রংপুরে ৩৭টি, ময়মনসিংহে ৩০টি এবং বরিশালে ১৫টি অভিযোগ জমা হয়েছে। অর্থাৎ প্রথম দুই দিনের তথ্যেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি সেবা ঘিরে ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতার বিস্তৃতি সম্পর্কে একটি প্রাথমিক চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।

তবে এসব সংখ্যাকে দেশের সামগ্রিক দুর্নীতির চূড়ান্ত পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ওয়েবসাইটটি এখনো নতুন এবং সেখানে অভিযোগ জানানো মানুষের সংখ্যা ও তাঁদের ভৌগোলিক অবস্থানও বিভিন্ন হতে পারে। একইভাবে যাঁরা ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন, তাঁদের সবাই যে ওয়েবসাইটে অভিযোগ করবেন, এমন নিশ্চয়তাও নেই। ফলে এই তথ্য মূলত নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে জমা দেওয়া অভিজ্ঞতার একটি প্রাথমিক ডেটাসেট হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

অভিযোগগুলোর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, ১৮ শতাংশ অভিযোগকারী জানিয়েছেন যে তাঁরা ঘুষ দিতে অস্বীকার করেছেন। এই তথ্যটি নাগরিকদের প্রতিরোধের একটি দিকও সামনে আনে। সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানানো সবসময় সহজ নয়। অনেক নাগরিক দ্রুত সেবা পাওয়ার প্রয়োজন, হয়রানির আশঙ্কা কিংবা প্রক্রিয়া আরও দীর্ঘ হওয়ার ভয়ে ঘুষ দিতে বাধ্য হন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর বিপরীতে যারা ঘুষ দিতে অস্বীকার করেছেন, তাঁদের অভিজ্ঞতাও এই প্ল্যাটফর্মে আলাদাভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে।

তবে ‘ঘুষ.সাইট’-এর তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতা। সাইটে থাকা প্রতিটি অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত করে সত্যতা নিশ্চিত করা হয়নি। উদ্যোক্তারাও বিষয়টি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওয়েবসাইটটি কোনো তদন্তকারী সংস্থা নয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের বিকল্প হিসেবেও কাজ করার দাবি করছে না।

অর্থাৎ কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা দপ্তরের বিরুদ্ধে ওয়েবসাইটে অভিযোগ পাওয়া গেলে সেটিকে সরাসরি প্রমাণিত দুর্নীতির ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। এটি অভিযোগকারীর বর্ণিত অভিজ্ঞতা। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত, নথিপত্র পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংগ্রহের মতো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হবে।

এই সীমাবদ্ধতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনলাইনে প্রকাশিত যেকোনো অভিযোগ দ্রুত জনমনে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কোনো নির্দিষ্ট সরকারি দপ্তর বা সেবা সম্পর্কে অভিযোগ বেশি দেখা গেলে সেটিকে প্রাথমিক সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে স্বাধীনভাবে তথ্য যাচাই করা জরুরি।

উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ‘ঘুষ.সাইট’ এখন পর্যন্ত নিজেদের অর্থেই পরিচালনা করা হচ্ছে। কোনো এনজিও বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত নয় প্ল্যাটফর্মটি। বাইরের কোনো অর্থায়নও নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন তাঁরা। সাইটে স্বেচ্ছা অনুদানের সুযোগ রাখা হয়েছে।

উদ্যোক্তাদের কাছে এই উদ্যোগের সাফল্যের অর্থ শুধু ওয়েবসাইটে কত মানুষ প্রবেশ করলেন কিংবা কত অভিযোগ জমা হলো, তা নয়। তাঁদের লক্ষ্য আরও বিস্তৃত। একজন নাগরিক সরকারি সেবা নেওয়ার আগে যদি জানতে পারেন সংশ্লিষ্ট সেবা বা দপ্তর নিয়ে অন্য নাগরিকদের কী ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাহলে তিনি পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছুটা প্রস্তুতি নিতে পারবেন। একই সঙ্গে কোথায় কত টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে, সেই তথ্য প্রকাশ্যে আসার ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও জবাবদিহির চাপ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশে দুর্নীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। সরকারি সেবায় ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ সাধারণ মানুষের আস্থা ও সেবা পাওয়ার অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করে। ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে এখন নাগরিকদের অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ ও বিশ্লেষণের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। ‘ঘুষ.সাইট’ সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর একটি বেসরকারি উদ্যোগ।

তবে এমন উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে তথ্যের মান, মডারেশন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা, ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এবং অভিযোগের অপব্যবহার ঠেকানোর সক্ষমতার ওপর। একই সঙ্গে অভিযোগের তথ্য যেন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন জনমত তৈরির হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে বাস্তব অভিযোগগুলো যেন যথাযথভাবে নথিবদ্ধ হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে, সেই ব্যবস্থাও ভবিষ্যতে এই ধরনের প্ল্যাটফর্মকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে।

মাত্র দুই দিনে ৮০৪টি অভিযোগ এবং ১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা ঘুষ চাওয়ার দাবি—সংখ্যাগুলো নিঃসন্দেহে নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। তবে এর প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে হলে সময়ের সঙ্গে আরও তথ্য জমা হওয়া এবং সেগুলো বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। কোন খাতে অভিযোগ ধারাবাহিকভাবে বেশি থাকে, কোন অঞ্চলে প্রবণতা বেশি, কতজন ঘুষ দিতে অস্বীকার করেন এবং অভিযোগগুলোর কী পরিণতি হয়—এসব তথ্য ভবিষ্যতে আরও স্পষ্ট চিত্র দিতে পারে।

শেষ পর্যন্ত ‘ঘুষ.সাইট’ কতটা কার্যকর নাগরিক উদ্যোগে পরিণত হবে, তা নির্ভর করবে এর তথ্যভান্ডার কতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে গড়ে ওঠে এবং সংশ্লিষ্টরা সেই তথ্য কীভাবে ব্যবহার করেন তার ওপর। অভিযোগ প্রকাশের পাশাপাশি যথাযথ যাচাই, দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে এমন উদ্যোগ সরকারি সেবা নিয়ে নাগরিক অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠতে পারে। আর যদি নাগরিকেরা নিজেদের অভিজ্ঞতা জানাতে থাকেন, তাহলে বিচ্ছিন্ন অভিযোগগুলো একসময় দুর্নীতির প্রবণতা বোঝার একটি বড় সামাজিক তথ্যভান্ডারেও পরিণত হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত