প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) তাদের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় শিল্পকারখানা বন্ধ ও কর্মসংস্থান হারানোর যে তথ্য উপস্থাপন করেছিল, সেটিকে ভুল ও বিভ্রান্তিকর হিসেবে স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করে তথ্যটি উপস্থাপন করা হলেও ওই প্রতিবেদনের মূল উৎস যাচাই করা হয়নি। পরে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর সিপিডি তথ্যের উৎস পুনরায় যাচাই করে ভুলটি শনাক্ত করে।
গত সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীতে ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক মিডিয়া সংলাপ আয়োজন করে সিপিডি। সেখানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ছয় মাসে দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের পরিবর্তন, শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ, রাজস্ব আহরণ, কর্মসংস্থানসহ নানা বিষয়ে একটি মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়। ওই উপস্থাপনার ১১ নম্বর স্লাইডে শিল্প ও বাণিজ্য খাতের পরিস্থিতি তুলে ধরতে বলা হয়, জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬ সময়ে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী—এই তিনটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মহীন হয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়।
তথ্যটি প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে খবর প্রকাশিত হয়। শিল্প খাতে কারখানা বন্ধ এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হারানোর এই পরিসংখ্যান স্বাভাবিকভাবেই অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা, উৎপাদন সক্ষমতা এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন সামনে আসে।
তবে পরদিন তথ্যটির উৎস ও সময়কাল নিয়ে অসঙ্গতি ধরা পড়ে। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান ও প্রশ্ন ওঠার পর সিপিডি নিজেদের উপস্থাপিত তথ্যের বিষয়ে ব্যাখ্যা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, ৯৫টি কারখানা বন্ধ এবং ৬১ হাজার ৮৮১ জনের কর্মসংস্থান হারানোর তথ্যটি তারা সরাসরি কোনো প্রাথমিক উৎস থেকে সংগ্রহ করেনি। বরং ২২ আগস্ট প্রকাশিত ঢাকা ট্রিবিউনের একটি প্রতিবেদনের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল। গবেষণা দল সেই প্রতিবেদনের মূল উৎস যাচাই না করেই তথ্যটি নিজেদের পর্যালোচনায় অন্তর্ভুক্ত করে।
পরে যাচাই করে দেখা যায়, ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে ব্যবহৃত তথ্যটি নতুন কোনো ঘটনা হিসেবে উপস্থাপিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করলেও এর মূল তথ্য আরও পুরোনো। সিপিডির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ঢাকা ট্রিবিউনের ওই প্রতিবেদনের তথ্য ২০২৫ সালের ৫ মার্চ প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। ফলে ২০২৫ সালের একটি তথ্যকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট সময়ের ঘটনা হিসেবে ধরে নেওয়ার কারণে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।
সিপিডি তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রতিবেদনের গবেষণাপদ্ধতিতে সংসদীয় ও মন্ত্রী পর্যায়ের বক্তব্য, জাতীয় বাজেট, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, সংবাদ বিজ্ঞপ্তি এবং ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উৎস ব্যবহার করা হয়েছিল। তবে নির্দিষ্ট ওই তথ্যের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের মূল উৎস যাচাই না করায় ভুলটি তাদের উপস্থাপনায় চলে আসে।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, অসাবধানতাবশত এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়ায় তারা দুঃখিত। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের তথ্যগত ভুল এড়াতে গবেষণা দল আরও সতর্ক থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিষয়টি নজরে আনার জন্য অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম দ্য ডিসেন্টকেও ধন্যবাদ জানিয়েছে সিপিডি।
সিপিডির এই ব্যাখ্যার ফলে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন শিল্পাঞ্চলে ঠিক ৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং ৬১ হাজার ৮৮১ জন কর্মহীন হয়েছেন—এমন দাবি এখন আর সিপিডির বৈধ তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে দেশের শিল্প খাতে কারখানা বন্ধ, উৎপাদন কমে যাওয়া বা কর্মসংস্থানের চাপ নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই। বরং সিপিডির মূল অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় শিল্প উৎপাদন ও বেসরকারি বিনিয়োগসহ কয়েকটি সূচকে দুর্বলতার কথা আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছিল।
কারখানা বন্ধের মতো সংবেদনশীল অর্থনৈতিক তথ্যের ক্ষেত্রে সময়কাল ও উৎসের যথার্থতা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। একটি কারখানা কখন বন্ধ হয়েছে, কতজন শ্রমিক সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন এবং ঘটনাটি কোন সময়ের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে নির্দেশ করছে—এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভুল না হলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক চিত্রও ভুলভাবে প্রতিফলিত হতে পারে। বিশেষ করে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উপস্থাপনায় এমন তথ্য প্রকাশিত হলে তা দ্রুত গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের কাছে সেটিই বাস্তব পরিস্থিতির প্রতিচ্ছবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
এই ঘটনাটি সেই জায়গাতেই তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব সামনে এনেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত কোনো তথ্যকে গবেষণা, নীতি বিশ্লেষণ বা অর্থনৈতিক মূল্যায়নের অংশ করার আগে তার মূল উৎস, প্রকাশের তারিখ এবং তথ্যের প্রেক্ষাপট যাচাই করা জরুরি। পুরোনো কোনো প্রতিবেদন নতুন সময়ের ঘটনা হিসেবে পুনরায় প্রকাশিত হলে শুধু সংখ্যাগুলো সঠিক থাকলেই যথেষ্ট নয়; তথ্যটি কোন সময়ের, কোন পরিস্থিতিতে সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং বর্তমানে সেটি প্রযোজ্য কি না—সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সিপিডির মতো নীতি গবেষণা ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য সাধারণত নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী, গবেষক, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে তাদের কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশের পর সেটি নিয়ে জনমত ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন তৈরি হতে পারে। এই কারণে ভুল ধরা পড়ার পর দ্রুত তা স্বীকার করে সংশোধন করার পদক্ষেপকে তথ্যগত জবাবদিহিতার অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাটি একই সঙ্গে গণমাধ্যমের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তৈরি করেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম বা অন্য কোনো উৎস থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান প্রকাশের আগে তার সময়কাল ও মূল উৎস পুনরায় যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষ করে পুরোনো প্রতিবেদন নতুন করে প্রকাশিত হলে তার মূল প্রকাশের তারিখ এবং প্রতিবেদনের ভাষ্য পরীক্ষা না করলে একই তথ্য ভিন্ন সময়ের ঘটনা হিসেবে পাঠকের সামনে চলে আসতে পারে।
সিপিডির পক্ষ থেকে ভুল স্বীকার ও দুঃখ প্রকাশের মধ্য দিয়ে অন্তত বিভ্রান্তির বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান প্রকাশের আগে আরও কঠোর তথ্য যাচাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। কারণ একটি সংখ্যার ভুল শুধু একটি প্রতিবেদনের ভুল নয়; তা মানুষের কর্মসংস্থান, শিল্পের অবস্থা এবং দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে জনমনে ভুল ধারণাও তৈরি করতে পারে।