তৃতীয় অধিবেশনে উত্তাপ ছড়াতে পারে সাত ইস্যুতে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ২১ বার
তৃতীয় অধিবেশনে উত্তাপ ছড়াতে পারে সাত ইস্যুতে

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হচ্ছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার। সংক্ষিপ্ত পরিসরের এই অধিবেশন ঘিরে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে আগ্রহ। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন ইস্যুতে অধিবেশন উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিল উত্থাপন ও পাস এবং দীর্ঘদিন ধরে অসম্পূর্ণ থাকা সংসদীয় কমিটিগুলোর গঠনও এই অধিবেশনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে দুপুর ২টায় স্পিকারের সভাপতিত্বে কার্যউপদেষ্টা কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকেই অধিবেশনের মেয়াদ, আলোচ্যসূচি, বিল উত্থাপন ও পাস, প্রশ্নোত্তর পর্ব এবং সংসদের কার্যপ্রণালির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অধিবেশনটি প্রায় ১১ কার্যদিবস চলতে পারে।

সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে। গত ১৫ জুলাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হয়। সংবিধান অনুযায়ী, দুটি অধিবেশনের মধ্যবর্তী বিরতি ৬০ দিনের বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। সেই হিসাবে আগামী ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন অধিবেশন শুরু করার বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘের সম্মেলনে যোগ দেওয়ার কর্মসূচি থাকায় এবার কিছুটা আগেভাগেই অধিবেশন শুরু করা হচ্ছে।

এবারের অধিবেশনে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিতে পারে জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বিভিন্ন সংকট। দেশে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহের সমস্যা, কৃষিতে সারের সংকট, পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে মানুষের মধ্যে যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তার প্রতিফলন সংসদেও দেখা যেতে পারে। বিরোধী দল এসব বিষয়কে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরতে পারে।

বিরোধী দল সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে সংসদে একাধিক মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের প্রস্তুতি রয়েছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার সংকটের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়েও তারা সরকারের বক্তব্য চাইতে পারে। ফলে স্বল্পমেয়াদি হলেও অধিবেশনে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কও অধিবেশনে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। বিশেষ করে সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এবং অবৈধ পুশইনের অভিযোগ নিয়ে আগের অধিবেশনে আলোচনা চাওয়া হলেও সময়স্বল্পতার কারণে তা এগোয়নি। ঢাকা-১৪ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান) এ বিষয়ে নোটিশ দিয়েছিলেন। এবার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে বলে সংসদ সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

অন্যদিকে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও তৃতীয় অধিবেশনটি গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। সংসদ সচিবালয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন আইন ইতোমধ্যে জমা হয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত ব্যাংক রেজল্যুশন সংশোধন আইন এবং র‌্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে নতুন বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের জন্য প্রস্তাবিত স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি আইনও সংসদে উত্থাপনের প্রস্তুতি চলছে।

বিলগুলো সংসদে উত্থাপনের পর সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া শেষ করে এই অধিবেশনেই কয়েকটি আইন পাস হতে পারে। এসব আইন নিয়ে বিরোধী দলের অবস্থান কী হয়, তা অধিবেশনের পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে মানবাধিকার, গুম প্রতিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা কাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনগুলো নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তৃতীয় অধিবেশনের আরেকটি বড় কাজ হতে পারে সংসদীয় কমিটিগুলোর গঠন সম্পন্ন করা। জাতীয় সংসদে মোট ৫০টি সংসদীয় কমিটি রয়েছে। এর মধ্যে ৩৯টি মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি এবং ১১টি বিষয়ভিত্তিক কমিটি। প্রথম দুই অধিবেশনে মাত্র ১৫টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত নয়টি এবং বিষয়ভিত্তিক ছয়টি কমিটি রয়েছে। ফলে বাকি ৩৫টি কমিটি গঠনের বিষয়টি এখনো ঝুলে আছে।

সংসদীয় কার্যপ্রণালি অনুযায়ী, সংসদের প্রথম তিনটি অধিবেশনের মধ্যে কমিটিগুলো গঠনের কথা রয়েছে। ফলে তৃতীয় অধিবেশনেই অধিকাংশ কমিটি গঠনের কাজ শেষ করার চাপ রয়েছে। এসব কমিটির মাধ্যমে মন্ত্রণালয় ও সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডের ওপর সংসদীয় নজরদারি জোরদার হওয়ার কথা। ফলে কমিটিতে কারা সভাপতি হচ্ছেন, বিরোধী দল কতটা প্রতিনিধিত্ব পাচ্ছে এবং কমিটিগুলো কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে—এসব বিষয়ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদে আসনসংখ্যার অনুপাতে বিরোধী দলের ৫০টি সংসদীয় কমিটির মধ্যে ১১টির সভাপতির পদ পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত গঠিত ১৫টি কমিটির মধ্যে মাত্র একটিতে বিরোধী দল থেকে সভাপতি করা হয়েছে। বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে সরকারি হিসাবসম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। বাকি কমিটিগুলোতে বিরোধী দলের সদস্যদের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

সংবিধান সংশোধন কমিটি নিয়েও সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বিরোধী দলের সদস্যদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে শর্ত দেওয়ার পর তারা ওই কমিটি বর্জন করেছিল। এর প্রভাব সংসদীয় কমিটিগুলোর সভাপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সংসদ অধিবেশনকে ঘিরে সরকারি দলের প্রস্তুতিও শেষ পর্যায়ে। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, সংক্ষিপ্ত অধিবেশন হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হতে পারে। বিরোধী দল কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু উত্থাপন করলে সরকার তা নিয়ে আলোচনা করবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। সংসদীয় কমিটিগুলোর গঠনও এই অধিবেশনে সম্পন্ন করার প্রস্তুতি রয়েছে।

এদিকে অধিবেশন শুরুকে কেন্দ্র করে সংসদ ভবন ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ সংসদ ভবন এবং নির্ধারিত আশপাশের এলাকায় সভা, সমাবেশ, মিছিল, শোভাযাত্রা ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছে। একই সঙ্গে অস্ত্র, বিস্ফোরক এবং ক্ষতিকর দ্রব্য বহনের ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বুধবার রাত ১২টা থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার কথা।

সংসদ অধিবেশনকে ঘিরে এমনিতেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা ও প্রস্তুতি বাড়ছে। সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে জনজীবনের সংকট মোকাবিলায় নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করা। অন্যদিকে বিরোধী দলের সামনে থাকবে সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা এবং জনগণের বিভিন্ন সমস্যা সংসদে তুলে ধরার সুযোগ। ফলে সময়ের হিসাবে অধিবেশনটি সংক্ষিপ্ত হলেও রাজনৈতিক উত্তাপের দিক থেকে এটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।

সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ-গ্যাস ও সার সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, সীমান্ত ও পুশইন, গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন, সংসদীয় কমিটি গঠন এবং বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব—এসব ইস্যুতে আগামী দিনের সংসদীয় রাজনীতির দিকনির্দেশনা স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অধিবেশন কতটা প্রাণবন্ত হয় এবং সরকার ও বিরোধী দল কতটা গঠনমূলক বিতর্কে অংশ নেয়, তার ওপরই নির্ভর করবে তৃতীয় অধিবেশনের রাজনৈতিক গুরুত্ব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত