প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার প্রস্তাবিত চুক্তি মার্কিন কংগ্রেসে পাঠিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে চুক্তিটির ভবিষ্যৎ কার্যকর হওয়ার সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শর্ত জুড়ে দিয়েছেন তিনি—সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাকারী ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এ যোগ দিতে হবে। মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো।
জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়। চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু জ্বালানি ও প্রযুক্তি সৌদি আরবে রপ্তানির জন্য আইনি কাঠামো তৈরি করবে। এর আওতায় মার্কিন কোম্পানিগুলো সৌদি আরবের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে এবং দেশটিতে মার্কিন প্রযুক্তিনির্ভর পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের পথ তৈরি হবে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, চুক্তিটি বহু বছরের এবং বহু বিলিয়ন ডলারের অংশীদারত্বের ভিত্তি তৈরি করবে।
তবে চুক্তির রাজনৈতিক দিকটিই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান হলো, সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক না করলে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি এগোবে না। অর্থাৎ, ওয়াশিংটনের কাছে সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি শুধু জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রশ্ন নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর কূটনৈতিক সমীকরণের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই অবস্থান সৌদি আরবের জন্য একটি জটিল কূটনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে আসছে। একই সঙ্গে সৌদি নেতৃত্ব নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে পারমাণবিক শক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছে। সৌদি আরবের জন্য পারমাণবিক বিদ্যুৎ কর্মসূচি শুধু প্রযুক্তিগত প্রকল্প নয়; এটি দেশটির দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনারও অংশ।
চুক্তির আওতায় মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য বড় ধরনের বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শিল্পের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সৌদি আরবের সম্ভাব্য পারমাণবিক অবকাঠামো নির্মাণে অংশ নিতে পারবে। মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প, শ্রমবাজার ও সরবরাহব্যবস্থাও উপকৃত হতে পারে।
চুক্তিটি এখন মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনার পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু সহযোগিতা আইনের অধীনে কংগ্রেসের সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোকে প্রস্তাবটি পর্যালোচনার জন্য ৯০ কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কংগ্রেস আপত্তি জানালে চুক্তিটির বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন রাজনৈতিক লড়াই শুরু হতে পারে। তবে কংগ্রেসের বিরোধিতার পরও প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
চুক্তির আরেকটি স্পর্শকাতর দিক হলো পারমাণবিক বিস্তার রোধের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি দেওয়ার বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ওয়াশিংটনে বিতর্ক রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু হলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং পারমাণবিক বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের মতো প্রযুক্তি। এসব প্রযুক্তি বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হলেও সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি না থাকলে ভবিষ্যতে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই জায়গাতেই সৌদি চুক্তির সঙ্গে ২০০৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির তুলনা সামনে আসছে। ওই চুক্তিতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও পারমাণবিক বর্জ্য পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক বিস্তার রোধের ক্ষেত্রে এটিকে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম কঠোর মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সৌদি চুক্তিতে একই ধরনের বিধিনিষেধ কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
এর ফলে চুক্তিটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয় হয়ে থাকেনি। এটি মধ্যপ্রাচ্যে ভবিষ্যৎ পারমাণবিক প্রতিযোগিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সৌদি আরবকে তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত পারমাণবিক সক্ষমতা দেওয়া হলে ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোও নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি জোরদারের যুক্তি খুঁজে পেতে পারে। এতে অঞ্চলটিতে সামরিক ও কৌশলগত ভারসাম্য আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান হলো, চুক্তিটি শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির জন্য এবং এতে পারমাণবিক নিরাপত্তা ও বিস্তার রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ও চুক্তিটিকে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা হিসেবে তুলে ধরেছে। ফলে ওয়াশিংটনের বক্তব্য ও পারমাণবিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েল ইস্যুটি এই বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। ২০২০ ও ২০২১ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের পথে এগোয়। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের উভয় প্রশাসনই সৌদি আরবকে সেই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সৌদি-ইসরায়েল স্বাভাবিকীকরণ আলোচনা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ে।
রিয়াদ বরাবরই বলে আসছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দিকে একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি না হলে ইসরায়েলের সঙ্গে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টি সহজ হবে না। ফলে ট্রাম্পের নতুন শর্ত সৌদি আরবের ঘোষিত অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন হলো, পারমাণবিক প্রযুক্তির সুযোগ পাওয়ার জন্য রিয়াদ শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার অবস্থানে যাবে কি না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চুক্তির অনেক বিস্তারিত তথ্য এখনো সর্বসাধারণের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত নয়। এ কারণে এর সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা কাঠামো, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের পরিধি নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ নথি শ্রেণিবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে, যা সাধারণত এ ধরনের পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
সব মিলিয়ে ট্রাম্পের সৌদি পারমাণবিক চুক্তি এখন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে—সৌদি আরবের জ্বালানি ও প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের আন্তর্জাতিক উদ্বেগ।
কংগ্রেসের পর্যালোচনা শেষ হওয়ার আগেই যদি সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে কোনো অগ্রগতি না দেখায়, তাহলে চুক্তিটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। আবার রিয়াদ যদি মার্কিন শর্ত মেনে নেয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের বিনিময়ে সৌদি আরব যে পারমাণবিক প্রযুক্তির সুযোগ পাবে, তার নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। তাই এই চুক্তির পরিণতি শুধু ওয়াশিংটন, রিয়াদ ও তেল আবিবের সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়তে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্য এবং বৈশ্বিক পারমাণবিক বিস্তার রোধের ব্যবস্থার ওপর।