দেশে ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ৯ বার
দেশে ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের মোটরসাইকেল বাজারে বড় পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন আমদানি নীতি অনুযায়ী এখন থেকে সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় বা সিবিইউ (Completely Built Unit) সর্বোচ্চ ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল বাংলাদেশে আমদানি করা যাবে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা উচ্চক্ষমতার মোটরসাইকেলপ্রেমীদের জন্য আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মাঝারি ও তুলনামূলক উচ্চক্ষমতার বাইক দেশে আনার সুযোগ আরও বিস্তৃত হলো।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২৪ আগস্ট ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯’-এর গেজেট প্রকাশ করেছে। নতুন এই নীতিতে মোটরসাইকেল আমদানির ক্ষেত্রে ইঞ্জিনক্ষমতার সীমা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। আগের আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২০২৪-এ সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেল আমদানিতে বিধিনিষেধ ছিল। নতুন নীতিতে সেই সীমা বাড়িয়ে ৩৭৫ সিসি করা হয়েছে।

অর্থাৎ নতুন নীতির আওতায় ১২৫, ১৫০ বা ১৬৫ সিসির মতো প্রচলিত মোটরসাইকেলের পাশাপাশি ২০০, ২৫০, ৩০০, ৩৫০ কিংবা ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত সম্পূর্ণ তৈরি মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে যেকোনো ৩৭৫ সিসির বাইক স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাজারে চলে আসবে। আমদানিকারককে বিদ্যমান অন্যান্য আমদানি, শুল্ক, নিবন্ধন ও সড়ক চলাচলসংক্রান্ত বিধিবিধানও মেনে চলতে হবে।

নতুন সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের মোটরসাইকেল বাজারে প্রতিযোগিতার ধরনও বদলাতে পারে। এতদিন উচ্চক্ষমতার অনেক মোটরসাইকেল সরাসরি সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় আমদানির ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকায় ক্রেতাদের পছন্দ তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। নতুন নীতির ফলে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর বিভিন্ন মাঝারি ক্ষমতার মডেল বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। এতে ক্রেতাদের সামনে পছন্দের পরিসর বাড়তে পারে এবং বাজারে নতুন মডেল ও প্রযুক্তির উপস্থিতিও বৃদ্ধি পেতে পারে।

বিশেষ করে দেশের তরুণ মোটরসাইকেলপ্রেমীদের কাছে এই পরিবর্তনের গুরুত্ব বেশি। মোটরসাইকেল এখন শুধু যাতায়াতের বাহন নয়; অনেকের কাছে এটি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, ভ্রমণ, বিনোদন এবং জীবনযাপনের একটি অংশ। দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাজারে নির্দিষ্ট ইঞ্জিনক্ষমতার বাইকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা ক্রেতাদের কাছে ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ভিন্নধর্মী ডিজাইনের মোটরসাইকেল পাওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে।

তবে এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। দেশে মোটরসাইকেল উৎপাদন ও সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন নতুন ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে। এতদিন স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বা সংযোজনের মাধ্যমে যেসব প্রতিষ্ঠান বাজারে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে, তাদের সঙ্গে সরাসরি আমদানি করা উচ্চক্ষমতার মোটরসাইকেলের প্রতিযোগিতা বাড়বে। সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের আশঙ্কা, আমদানি সহজ হলে বিদেশি ব্র্যান্ডের বাইকের বাজার সম্প্রসারণ স্থানীয় উৎপাদকদের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে প্রতিযোগিতা বাড়লে স্থানীয় শিল্পের জন্যও মান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ক্রেতারা যদি বেশি প্রযুক্তিসম্পন্ন ও বৈচিত্র্যময় মোটরসাইকেল বেছে নেওয়ার সুযোগ পান, তাহলে দেশীয় উৎপাদকদেরও পণ্যের মান, প্রযুক্তি, নকশা ও সেবার ক্ষেত্রে আরও প্রতিযোগিতামূলক হওয়ার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে। ফলে নতুন নীতির প্রভাব শুধু আমদানিকারক ও ক্রেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; স্থানীয় মোটরসাইকেল শিল্পের ভবিষ্যৎ কৌশলেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

নতুন আমদানি নীতির পরিধি অবশ্য শুধু মোটরসাইকেলে সীমাবদ্ধ নয়। সরকার আমদানি ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য বেশ কিছু পরিবর্তন এনেছে। নতুন নীতিতে শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আমদানিকারকদের জন্য এলসির পাশাপাশি কোনো নির্দিষ্ট মূল্যসীমা ছাড়াই বিক্রয় বা ক্রয় চুক্তির মাধ্যমে পণ্য আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে। আগের নীতিতে এ ধরনের আমদানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন খাত ও পণ্যের জন্য মূল্যসীমা এবং শর্ত ছিল।

এর ফলে আমদানিকারকদের জন্য আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক চুক্তির ভিত্তিতে পণ্য আনার প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, আমদানি প্রক্রিয়ার জটিলতা কমলে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং প্রয়োজনীয় পণ্য দ্রুত সংগ্রহের সুযোগ বাড়তে পারে। তবে এর পাশাপাশি ব্যাংকিং, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, কাস্টমস ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিদ্যমান নিয়মও কার্যকর থাকবে।

নতুন নীতিতে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল বা ফ্রি ট্রেড জোন এবং সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউস প্রতিষ্ঠার বিধানও রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে আমদানি ও রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত ব্যবসাগুলোর জন্য সরবরাহব্যবস্থা আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পে কাঁচামাল ও উৎপাদন উপকরণ আমদানির সুযোগ সম্প্রসারণের ফলে শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের শিল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও নতুন নীতিতে কিছু সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। দেশের বাইরে থাকা বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা দেশে শিল্প স্থাপন বা বিনিয়োগ করলে মূলধনি যন্ত্রপাতি, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে আরও সহজ প্রক্রিয়া পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রবাসী বিনিয়োগকে দেশে আনার পাশাপাশি শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে।

তবে মোটরসাইকেল আমদানির সীমা ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত বাড়ানো হলেও এর সঙ্গে বাজারের অন্যান্য বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ। একটি মোটরসাইকেলের চূড়ান্ত মূল্য শুধু আমদানি মূল্যের ওপর নির্ভর করে না। আমদানি শুল্ক, কর, পরিবহন ব্যয়, ডিলার মার্জিন, নিবন্ধন ব্যয় এবং অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ক্রেতার কাছে চূড়ান্ত দাম নির্ধারিত হয়। ফলে নতুন নীতিতে আমদানির সুযোগ তৈরি হলেও উচ্চক্ষমতার বাইক সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে কি না, তা নির্ভর করবে সামগ্রিক ব্যয় কাঠামোর ওপর।

নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চক্ষমতার মোটরসাইকেল সাধারণত বেশি গতি ও শক্তি সরবরাহ করতে পারে। তাই এসব মোটরসাইকেলের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা, চালকের প্রশিক্ষণ, লাইসেন্সিং এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে। শুধু উচ্চক্ষমতার বাইক আমদানির সুযোগ তৈরি করলেই হবে না; এগুলো নিরাপদভাবে ব্যবহারের উপযুক্ত পরিবেশও নিশ্চিত করতে হবে।

দেশে ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল নিবন্ধনের সুযোগ আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বাইকের ক্ষেত্রে। ২০২৩ সালে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল নিবন্ধনের অনুমতি দিয়েছিল। এবার নতুন আমদানি নীতিতে একই ক্ষমতার সম্পূর্ণ তৈরি মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ তৈরি হওয়ায় স্থানীয় বাজারে উচ্চক্ষমতার বাইকের উপস্থিতি আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

সব মিলিয়ে ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯’ বাংলাদেশের মোটরসাইকেল বাজারের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। ১৬৫ সিসির সীমা থেকে ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত সম্পূর্ণ তৈরি মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ বাড়ানোয় ক্রেতাদের পছন্দের পরিসর যেমন বাড়বে, তেমনি স্থানীয় উৎপাদকদের জন্যও প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা তৈরি হবে। একই সঙ্গে আমদানি প্রক্রিয়ায় ছাড়, ফ্রি ট্রেড জোন ও বন্ডেড ওয়্যারহাউসের সুযোগ এবং প্রবাসী বিনিয়োগে সুবিধা সম্প্রসারণের মতো পদক্ষেপ দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য পরিবেশকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যকে সামনে রাখছে।

এখন মূল বিষয় হবে, নতুন সুযোগগুলো বাস্তবে বাজারে কতটা কার্যকর হয় এবং এর সুফল কতটা ভোক্তা ও স্থানীয় শিল্পের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। উচ্চক্ষমতার মোটরসাইকেলপ্রেমীদের জন্য ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত আমদানির অনুমতি নিঃসন্দেহে নতুন দরজা খুলেছে। তবে সেই দরজা দিয়ে কতগুলো ব্র্যান্ড, কী দামে এবং কী ধরনের মডেল বাংলাদেশে প্রবেশ করবে, সেটিই আগামী দিনের মোটরসাইকেল বাজারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত