হিজাব নিয়ে আদালতের রায়ে ওয়াইসির কড়া প্রতিক্রিয়া

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫ বার
হিজাব নিয়ে আদালতের রায়ে ওয়াইসির কড়া প্রতিক্রিয়া

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের উত্তরপ্রদেশে স্কুলের নির্ধারিত ইউনিফর্মের সঙ্গে হিজাব পরার অনুমতি চেয়ে এক মুসলিম ছাত্রীর করা আবেদন এলাহাবাদ হাইকোর্ট খারিজ করার পর বিষয়টি নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণের পর অল ইন্ডিয়া মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন (এআইএমআইএম) প্রধান ও হায়দ্রাবাদের সাংসদ আসাদুদ্দিন ওয়াইসি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ইসলাম ধর্মে কোন বিষয়টি অপরিহার্য এবং কোনটি নয়, তা নির্ধারণ করা বিচারকদের কাজ নয়।

ওয়াইসি আদালতের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুশীলনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ধর্মের অনুসারীদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তাঁর মতে, হিজাব নিয়ে আদালতের এমন সিদ্ধান্ত ব্যক্তিগত ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

আদালতের রায়কে ইসলামের ওপর আক্রমণ হিসেবে উল্লেখ করে ওয়াইসি বলেন, “এটা আমাদের ধর্ম এবং কোনটা অপরিহার্য তা আমরাই ঠিক করব। এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিচারক কারা?” তাঁর বক্তব্যে ভারতের সংবিধানে স্বীকৃত ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত অধিকারের বিষয়টিও উঠে আসে।

ওয়াইসি আরও দাবি করেন, এলাহাবাদ হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত ভারতের সংবিধানের ১৯ ও ২৫ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদ নাগরিকদের বিভিন্ন মৌলিক স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়, আর ২৫ অনুচ্ছেদ ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার স্বীকার করে। তাঁর যুক্তি, পোশাকের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী নিজের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করলে সেটিকে শুধুমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইউনিফর্ম নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

হিজাব পরার অধিকার নিয়ে আবেদন করা ওই মুসলিম ছাত্রীর অবস্থানের পক্ষেও সরব হয়েছেন ওয়াইসি। তিনি বলেন, “মেয়েটি হিজাব তার মাথায় পরেছে, মনে নয়।” তাঁর এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, হিজাব পরাকে শিক্ষার্থীর শিক্ষাগত মনোযোগ, মেধা কিংবা বিদ্যালয়ের প্রতি তার দায়িত্ববোধের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।

ওয়াইসি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এ ধরনের সিদ্ধান্তের প্রভাব মুসলিম মেয়েদের শিক্ষাজীবনে পড়তে পারে। তাঁর দাবি, উত্তরপ্রদেশে মুসলিম মেয়েদের স্কুলে ভর্তির হার এমনিতেই কম। ফলে পোশাকসংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে কোনো শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে যাওয়া থেকে বিরত হলে তা শিক্ষার সুযোগকে আরও সংকুচিত করতে পারে।

এই বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে এলাহাবাদ হাইকোর্টের ২১ আগস্টের একটি রায়। প্রয়াগরাজের একটি বেসরকারি স্কুলের এক মুসলিম ছাত্রী স্কুলের নির্ধারিত ইউনিফর্মের পাশাপাশি হিজাব পরার অনুমতি চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। ওই আবেদনের শুনানির পর আদালত জানায়, হিজাব ইসলাম ধর্মের অপরিহার্য অংশ নয়। একই সঙ্গে আদালত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত পোশাকবিধি মেনে চলার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেয়।

আদালতের যুক্তি ছিল, কোনো শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী বিদ্যালয়ের নির্ধারিত ইউনিফর্মের নিয়ম পরিবর্তন করা যায় না। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার শৃঙ্খলা, পরিচিতি ও একরূপতা বজায় রাখার জন্য নির্দিষ্ট পোশাকবিধি প্রণয়ন করতে পারে এবং শিক্ষার্থীদের সেই বিধি অনুসরণ করতে হতে পারে।

এই অবস্থানই ওয়াইসির সঙ্গে আদালতের দৃষ্টিভঙ্গির মূল পার্থক্য তৈরি করেছে। ওয়াইসির মতে, একটি প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের পোশাক পরা এবং সবার প্রতি সমান আচরণ করা—এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখা ঠিক নয়। তিনি বলেন, “একরূপতা মানেই সমতা নয়।” তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একই পোশাকের নিয়ম সবার ওপর প্রয়োগ করলেই তা সব শিক্ষার্থীর ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত অধিকারের প্রতি সমান আচরণ নিশ্চিত করে না।

ভারতে ধর্মীয় পোশাক নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরার অধিকার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আদালত, রাজনৈতিক দল, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা গেছে। একদিকে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ইউনিফর্ম ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার যুক্তি; অন্যদিকে রয়েছে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত পছন্দের অধিকার। ফলে বিষয়টি কেবল পোশাকের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না থেকে সাংবিধানিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার বৃহত্তর আলোচনায় পরিণত হয়েছে।

এলাহাবাদ হাইকোর্টের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণও সেই বৃহত্তর বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। আদালত একদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পোশাকবিধির বৈধতা ও প্রয়োগের অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েছে, অন্যদিকে হিজাবকে ইসলামের অপরিহার্য ধর্মীয় অনুশীলন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে।

ওয়াইসি অবশ্য মনে করেন, ধর্মীয় আচারের অপরিহার্যতা নিয়ে বিচারিক সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে বিষয়টির বৃহত্তর সাংবিধানিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ইতোমধ্যে অপরিহার্য ধর্মীয় আচারের বিষয়টি নিয়ে শুনানি চলছে। সে কারণে এলাহাবাদ হাইকোর্টের এ বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ওয়াইসি মূলত বিচার বিভাগের ভূমিকা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার সীমা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অবস্থান হলো, ধর্মীয় বিশ্বাসের অভ্যন্তরীণ বিষয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে আদালতের ভূমিকা সীমিত থাকা উচিত। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, সংবিধান একজন নাগরিককে যে ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়েছে, তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ইউনিফর্মের নিয়মকে সাধারণত শৃঙ্খলা, সমতা এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নীতির অংশ হিসেবে দেখা হয়। কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষার্থীকে আলাদা পোশাক পরার অনুমতি দিলে একই ধরনের অন্যান্য দাবির সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন যুক্তিও এ ধরনের বিতর্কে উঠে আসে। আদালতের রায়ে এই প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গিই গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে হিজাব বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রশ্ন। একটি পোশাকবিধি যাতে কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ব্যাহত না করে, সেই ভারসাম্য কীভাবে প্রতিষ্ঠা করা হবে—এটি এখনো ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে রয়েছে।

আসাদুদ্দিন ওয়াইসির বক্তব্যের পর বিষয়টি আবারও রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। তাঁর মন্তব্য শুধু এলাহাবাদ হাইকোর্টের একটি রায়ের সমালোচনা নয়; বরং ধর্মীয় স্বাধীনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন, ব্যক্তিগত অধিকার এবং বিচার বিভাগের ভূমিকা—এই চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে একই সঙ্গে সামনে নিয়ে এসেছে।

এখন এ বিষয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ কী হয় এবং উচ্চতর আদালতে বিষয়টি কীভাবে বিবেচিত হয়, সেদিকেই নজর থাকবে। একই সঙ্গে ভারতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ধর্মীয় পোশাক ও ইউনিফর্মের মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, সেটিও ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত