সংযোগ ওলটপালটে গ্রাহক হয়রানি, অনিয়মের অভিযোগ

ফারহান ফারাবী
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৭ বার

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে গ্রাহক হয়রানি, সংযোগের ধরন পরিবর্তন, অবৈধভাবে অর্থ আদায় এবং নতুন সংযোগে অতিরিক্ত টাকা নেওয়াসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, আবাসিক সংযোগকে বাণিজ্যিক করে দিয়ে বাড়তি বিলের বোঝা চাপানো থেকে শুরু করে মামলা করার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় পর্যন্ত নানা কৌশলে হয়রানি করা হচ্ছে।

গোয়ালন্দ পৌর জামতলা বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবুল কালামের অভিযোগ, ওজোপাডিকোর কয়েকজন কর্মী তাঁর কনফেকশনারিতে খাবার খেতেন। তবে খাবারের টাকা ঠিকমতো না দেওয়ায় তাঁদের সঙ্গে তাঁর তর্ক হয়। এরপর ক্ষুব্ধ হয়ে কর্মীরা তাঁর বাড়ির আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ বাণিজ্যিক করে দেন বলে অভিযোগ তাঁর।

আবুল কালাম জানান, আগে তাঁর বাড়িতে মাসে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা বিদ্যুৎ বিল আসত। সংযোগ বাণিজ্যিক করার পর সেই বিল তিন হাজার টাকার বেশি হচ্ছে। ছয় মাস আগে নিয়ম অনুযায়ী অ্যাফিডেভিটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিলেও সংযোগটি আবার আবাসিক করার জন্য তাঁকে বারবার অফিসে ঘুরতে হচ্ছে।

ওজোপাডিকোর গোয়ালন্দ কার্যালয় ঘিরে দীর্ঘ অনুসন্ধানে গ্রাহকদের কাছ থেকে মামলার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, আবাসিক সংযোগকে বাণিজ্যিক এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে আবাসিক সংযোগ দেওয়াসহ নানা অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। নতুন সংযোগের তথ্য চেয়েও দীর্ঘ সময় কার্যালয়ে ঘুরতে হয়েছে বলে অভিযোগ প্রতিবেদকের। শেষ পর্যন্ত কার্যালয়ের আবাসিক প্রকৌশলীও বিভিন্ন অজুহাতে তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান।

বিদ্যুৎচোর বলে অপমানের অভিযোগ

উজানচর ইউনিয়নের নতুনপাড়া গ্রামের রেহেনা খাতুনের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাঁর স্বামী প্রবাসে থাকেন এবং সন্তানদের নিয়ে তিনি বাড়িতে বসবাস করেন। তাঁর ভাষ্য, একসময় তাঁর বাড়ির বিদ্যুৎ বিল হঠাৎ কিছুটা কমে যায়। বিষয়টি তিনি বিল রিডার ও লাইনম্যানদের জানালে তাঁরা মিটার পরীক্ষা করে কোনো সমস্যা নেই বলে জানান।

এর প্রায় ছয় মাস পর লাইনম্যান মো. জাহাঙ্গীর হোসেন এবং মাস্টাররোলে কাজ করা মো. সামছু, মো. মজিবরসহ কয়েকজন তাঁর বাড়ি থেকে মিটার খুলে নিয়ে তাঁকে অফিসে যেতে বলেন।

রেহেনার অভিযোগ, অফিসে যাওয়ার পর তাঁকে ‘বিদ্যুৎচোর’ বলে অপমান করা হয়। পরে মিটারে সমস্যা রয়েছে জানিয়ে এক লাখ টাকা দাবি করা হয় এবং টাকা না দিলে মামলা করার হুমকি দেওয়া হয়। একপর্যায়ে তিনি ৬০ হাজার টাকা দিয়ে বিষয়টি মিটিয়ে নেন বলে দাবি করেন। ওই অর্থের বিপরীতে তাঁকে কোনো রসিদ বা ভাউচার দেওয়া হয়নি বলেও জানান তিনি।

দেবগ্রাম ইউনিয়নের পূর্ব তেনাপচা গ্রামের আব্দুল জলিল ফকিরও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাঁর বাড়ির মিটারে সমস্যা রয়েছে এবং কম বিল আসছে—এমন অভিযোগ তুলে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করার কথা বলেন। মিটার পরীক্ষা করে কোনো ত্রুটি না পাওয়ার পরও তাঁকে এক লাখ টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ জলিলের। নতুন প্রিপেইড মিটারের জন্য আরও ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

খুঁটিতে মিটার, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে আবাসিক সংযোগ

গোয়ালন্দ ওজোপাডিকো কার্যালয়ের কাছেই বৈদ্যুতিক খুঁটিতে মিটার স্থাপনের একটি উদাহরণও দেখা গেছে। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে ডাইভারশন এলাকায় একটি খুঁটিতে স্থাপিত মিটার থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের একটি পোলট্রি খামারে ঝুঁকিপূর্ণভাবে সংযোগ নেওয়া হয়েছে।

খামারের মালিক সুমন মোল্লা জানান, আগে তাঁর পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ ছিল এবং মাসে প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা বিল আসত। সাত-আট মাস আগে ওজোপাডিকোর সংযোগ নেওয়ার পর মাসে মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা বিল দিচ্ছেন। তবে তাঁর কাছে থাকা বিলের কাগজে সংযোগটি আবাসিক হিসেবে উল্লেখ রয়েছে, যদিও তিনি বাণিজ্যিক কাজে বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন।

ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সুমন মোল্লা বলেন, তাঁর লাইন বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তবে দ্রুত বাঁশ দিয়ে সেটি উঁচু করে দেওয়ার কথা জানান তিনি।

নতুন সংযোগে ১০-১১ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ

২০২৫-২৬ অর্থবছরে গোয়ালন্দ ওজোপাডিকো কার্যালয় থেকে ৩৪৮টি নতুন সংযোগ দেওয়া হয়েছে। সরকারি হিসাবে প্রতিটি সংযোগের জন্য নির্ধারিত ফি ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। তবে গ্রাহকদের অভিযোগ, নতুন সংযোগ নিতে তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই নির্ধারিত ফির চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ নেওয়া হয়েছে।

গোয়ালন্দ পৌরসভার ইবাদউল্লাহ মিস্ত্রির পাড়ার নয়ন শেখ, উজানচর ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের রেখা খাতুন, ময়ছের মাতুব্বার পাড়ার রবিউল ইসলাম ও কাইমদ্দিন মাতুব্বার পাড়ার দেলোয়ার শেখসহ কয়েকজন গ্রাহক জানান, নতুন সংযোগের জন্য তাঁদের ১০ থেকে ১১ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়েছে।

নয়ন শেখের অভিযোগ, তাঁর কাছ থেকে মাস্টাররোলের কর্মী মো. ইলিয়াছ শাহেদ টাকা নিয়েছেন। তবে ইলিয়াছ শাহেদ দাবি করেন, সংযোগ ও মিটার বাবদ তিনি আট হাজার টাকা নিয়েছেন এবং এর মধ্যে মিটারের দামই সাড়ে ছয় হাজার টাকা।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, মো. সামছু ও মো. মজিবরের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কর্তৃপক্ষের অস্বীকার

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাজবাড়ী ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন অর রশিদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

তবে গোয়ালন্দ ওজোপাডিকোর আবাসিক প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. তোফাজ্জল হোসেন সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, নতুন সংযোগের জন্য নির্ধারিত ফি ২ হাজার ৬০০ থেকে ৩ হাজার টাকা এবং এর বেশি অর্থ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর বিরুদ্ধেও অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তোফাজ্জল হোসেন বলেন, তিনি কোনো অনিয়মে জড়িত থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে পারে।

গ্রাহকদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং বিদ্যুৎ সংযোগের শ্রেণি পরিবর্তন ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়গুলো তদন্ত করা হলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন>> 

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত