তিব্বত সীমান্তে নেপালে ভয়াবহ বন্যা, ৮ জনের মৃত্যু

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ বার
তিব্বত সীমান্তে নেপালে ভয়াবহ বন্যা, ৮ জনের মৃত্যু

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬  । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী পার্বত্য জেলা রাসুয়ায় আকস্মিক ভয়াবহ বন্যায় অন্তত আটজনের মৃত্যু হয়েছে। প্রবল স্রোতে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বাজার ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বহু মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে তিব্বতের দিক থেকে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি নেমে এসে ভোতে কোশী নদীতে প্রবল স্রোতের সৃষ্টি হলে এই বিপর্যয় ঘটে।

রাসুয়া জেলার স্যাপ্রুবেশি, তিমুরে ও রাসুওয়াগাধি সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। কয়েকটি এলাকায় মুহূর্তের মধ্যে নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ারও পর্যাপ্ত সময় পাননি। তিমুরে এলাকার স্থানীয় প্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকালে বিকট শব্দের সঙ্গে পাহাড়ি ঢলের মতো পানি নেমে আসে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বাজার ও আশপাশের স্থাপনা পানির তোড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।

নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বন্যার উৎস ও সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো তদন্তাধীন। তবে তিব্বতের দিক থেকে হঠাৎ বিপুল পানির প্রবাহ আসায় প্রাথমিকভাবে হিমবাহ-সংলগ্ন কোনো হ্রদের পানি আকস্মিকভাবে নেমে আসার সম্ভাবনাও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এর আগে একই অঞ্চলে এ ধরনের আকস্মিক বন্যার সঙ্গে তিব্বতের হিমবাহ-সংলগ্ন হ্রদ থেকে পানি নেমে আসার যোগসূত্র পাওয়া গিয়েছিল। ফলে এবারের ঘটনাতেও প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট আকস্মিক জলপ্রবাহের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

বন্যার তীব্রতায় ভোতে কোশী নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নদীটির প্রবাহ তিব্বত থেকে নেপালে প্রবেশ করে পরে ত্রিশূলী নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এরপর পানি ভারতের দিকে গণ্ডক নদী ব্যবস্থায় প্রবাহিত হয়। এ কারণে উজানের রাসুয়া ছাড়াও নুয়াকোট, ধাদিং, গোরখা ও চিতওয়ানসহ ভাটির কয়েকটি এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নদীর তীরবর্তী নিচু এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ ও উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

বন্যার পানি শুধু বসতবাড়িতেই আঘাত করেনি, গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামোকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নেপালের সড়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নুয়াকোটের বেত্রাবতী থেকে চীনের রাসুওয়াগাধি সীমান্ত পর্যন্ত প্রায় ৪২ কিলোমিটার সড়ক বিভিন্ন স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একাধিক কংক্রিটের সেতুও পানির তোড়ে ভেসে গেছে। ফলে নেপাল-চীন সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও যোগাযোগপথ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। স্যাপ্রুবেশি থেকে সীমান্ত পর্যন্ত আরও একটি সড়ক অংশের ক্ষয়ক্ষতির তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে।

জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোতেও বড় ধরনের ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। কয়েকটি প্রকল্পের স্থাপনা বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একটি প্রকল্প ভেসে যাওয়ার খবরও স্থানীয় পর্যায়ে পাওয়া গেছে। সামগ্রিকভাবে প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ওপর এই দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছে। নেপালের বিদ্যুৎ খাতের জন্য এটি বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় প্রকল্পগুলোর অবস্থান এবং যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব করতে সময় লাগতে পারে।

বন্যার পরপরই উদ্ধার তৎপরতা জোরদার করেছে নেপালের সরকার। পুলিশ, সেনাবাহিনী ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠানো হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং দুর্গম এলাকায় আটকে পড়াদের উদ্ধারে অভিযান চলছে। তবে প্রবল স্রোত ও ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। কিছু এলাকায় হেলিকপ্টার অবতরণ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ফলে দুর্গত মানুষের কাছে দ্রুত খাদ্য, পানি, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন। নদীর তীরবর্তী নিচু এলাকায় বসবাসকারী মানুষদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য নতুন বন্যার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভাটির এলাকাগুলোতেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে, কারণ পাহাড়ি নদীতে আকস্মিক পানি বৃদ্ধির প্রভাব দ্রুত নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

নুয়াকোটেও বন্যার প্রভাব পড়েছে। ভোতে কোশীর পানি নিচের দিকে প্রবাহিত হয়ে ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থায় পৌঁছানোর পর নদীর আশপাশের বসতিগুলোতে আতঙ্ক দেখা দেয়। স্থানীয় প্রতিবেদনে ত্রিশূলী বাজারসংলগ্ন এলাকায় বহু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা ভেসে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে আগাম সতর্কতার কারণে অনেক বাসিন্দা নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সক্ষম হওয়ায় কিছু এলাকায় বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে।

এদিকে তিব্বতের সীমান্তবর্তী চীনা অংশেও ভূমিধস ও বন্যার কারণে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। চীনের তিব্বত অঞ্চলের গিরং কাউন্টিতে সড়ক, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি হতাহত ও নিখোঁজের খবরও এসেছে। নেপাল ও তিব্বত—দুই পাশেই একই জলপ্রবাহ ও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে দুর্যোগের প্রভাব সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য এবারের বন্যা আবারও হিমালয় অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও হিমবাহ-সংলগ্ন হ্রদ নিয়ে উদ্বেগ সামনে এনেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয়ের বরফ ও হিমবাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটায় পাহাড়ি হ্রদ ও নদীগুলোর ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্কতা রয়েছে। গত বছরও ভোতে কোশী নদীতে ভয়াবহ বন্যায় প্রাণহানি ও ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছিল। সেই বন্যায় নেপাল-চীন সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুও ভেসে গিয়েছিল এবং কয়েক মাস ধরে সীমান্তবর্তী যোগাযোগ ও বাণিজ্যে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছিল।

এবারের দুর্যোগে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন নিখোঁজ মানুষদের সন্ধান এবং দুর্গতদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া। পাহাড়ি অঞ্চলে রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার অভিযান আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে ভাটির নদীগুলোতে নতুন করে পানি বাড়ার আশঙ্কায় সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতেও সতর্কতা অব্যাহত রয়েছে। প্রশাসনের সামনে এখন একদিকে প্রাণহানি কমানো, অন্যদিকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া জনপদে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার বড় দায়িত্ব।

নেপালের এই ভয়াবহ বন্যা আবারও দেখিয়ে দিল, হিমালয়ের দুর্গম জনপদে কয়েক মিনিটের আকস্মিক জলপ্রবাহ কীভাবে মানুষের জীবন, বসতি ও কোটি কোটি টাকার অবকাঠামোকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র এখনও স্পষ্ট নয়। উদ্ধার অভিযান এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে। আপাতত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া এবং নিখোঁজদের উদ্ধারের দিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে নেপালের কর্তৃপক্ষ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত