প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চীনে বাংলাদেশি মেধাবী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার, শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বিনিময় এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে কারিগরি শিক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা ও গবেষণার নতুন দ্বার উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বুধবার (২৬ আগস্ট) চীনের গুয়াংজুতে আয়োজিত ‘চীন-বাংলাদেশ শিক্ষা সহযোগিতা মধ্যাহ্নভোজ’ অনুষ্ঠানে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়াও অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। আনহুই নরমাল ইউনিভার্সিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট, জিয়াংসি সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি নরমাল ইউনিভার্সিটির ভাইস প্রেসিডেন্টসহ দেশটির বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা এতে উপস্থিত ছিলেন। দুই দেশের শিক্ষা খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এমন অংশগ্রহণ ভবিষ্যতে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকলেও অনেক শিক্ষার্থী উন্নত গবেষণা অবকাঠামো, আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিবেশের সন্ধানে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ ক্ষেত্রে চীন বর্তমানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, চিকিৎসা, ব্যবসা, কৃষি ও অন্যান্য বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও গবেষণায় চীনের অগ্রগতি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আকর্ষণের অন্যতম কারণ। ফলে চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হলে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গুয়াংজুর অনুষ্ঠানে শুধু উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানো নয়, দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। যৌথ গবেষণা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়, একাডেমিক সহযোগিতা এবং গবেষণাভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ সম্পর্ক আরও কার্যকর করা সম্ভব। এর ফলে বাংলাদেশি গবেষক ও শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষণা কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
বিশেষ করে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে এ ধরনের সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, রোবোটিকস, আধুনিক কৃষি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে যৌথভাবে কাজ করা গেলে বাংলাদেশের নিজস্ব উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তি কাজে লাগানোর সুযোগ বাড়বে।
শিক্ষা সহযোগিতার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শিল্প ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ জনশক্তির প্রয়োজনও দ্রুত বাড়ছে। শুধু সাধারণ একাডেমিক শিক্ষা নয়, বাস্তব কাজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও কারিগরি দক্ষতা অর্জনও এখন সময়ের দাবি।
চীনের সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা সহযোগিতা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশি তরুণদের আধুনিক প্রযুক্তি ও শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণরা দেশে ফিরে শিল্প, উৎপাদন, নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন সেবা খাতে নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগাতে পারবেন। এতে একদিকে ব্যক্তিগত কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে, অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ভাষাগত দক্ষতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চীনে পড়াশোনা করতে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য চীনা ভাষা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকা একাডেমিক ও সামাজিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সহায়ক হতে পারে। একইভাবে বাংলাদেশে চীনা ভাষা শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ করা হলে দুই দেশের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ আরও গভীর হতে পারে।
চীন-বাংলাদেশ শিক্ষা সহযোগিতার পরিধি সাম্প্রতিক সময়ে আরও বিস্তৃত হচ্ছে। দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে বৃত্তি, ভাষা শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও গবেষণা সহযোগিতার সুযোগ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আর্থিকভাবে সীমিত পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরাও আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেতে পারেন।
তবে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের যথাযথ প্রস্তুতির বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে পড়তে যাওয়ার আগে একাডেমিক যোগ্যতার পাশাপাশি ভাষা, সংস্কৃতি, গবেষণা পদ্ধতি এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষা পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা যেন প্রতারণার শিকার না হন এবং সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় ও বৃত্তি নির্বাচন করতে পারেন, সে বিষয়েও কার্যকর নির্দেশনা ও সহায়তা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সহযোগিতা বাড়লে শুধু শিক্ষার্থীরাই উপকৃত হবেন না, বাংলাদেশের শিক্ষক ও গবেষকরাও নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন। দুই দেশের শিক্ষকদের যৌথ গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক বিনিময় দেশের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নেও ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে গবেষণার ফলাফল দেশের বাস্তব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রয়োগ করা গেলে এর সুফল আরও বিস্তৃত হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগটি তৈরি হতে পারে দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের ক্ষেত্রে। জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ হওয়ায় তাদের শিক্ষা ও দক্ষতায় বিনিয়োগ দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণরা দেশে ফিরে উদ্যোক্তা, গবেষক, প্রকৌশলী, শিক্ষক কিংবা প্রযুক্তিবিদ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
গুয়াংজুতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সহযোগিতা বিষয়ক এই আয়োজন তাই দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে। শিক্ষা এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে সহযোগিতার সুফল দীর্ঘমেয়াদে দৃশ্যমান হয়। একটি প্রজন্মের শিক্ষার্থী যদি উন্নত শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পায়, তার প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য চীনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ সফল করতে হলে এখন প্রয়োজন ধারাবাহিক ও বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ। বৃত্তির সুযোগ সম্প্রসারণ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ, যৌথ গবেষণা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং ভাষা শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে দুই দেশের শিক্ষা সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে এ উদ্যোগের সুফল আরও ব্যাপক হবে। বিদেশে পড়াশোনা শুধু ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গঠনের সুযোগ নয়; যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে এটি একটি দেশের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে চীনে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগকে দেশের ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।