বিনা খরচে ১০ হাজার কর্মী যাবে মালয়েশিয়া

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ১২ বার
বিনা খরচে ১০ হাজার কর্মী যাবে মালয়েশিয়া

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সুনামগঞ্জ থেকে: মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ১০ হাজার কর্মীকে কোনো খরচ ছাড়াই দেশটিতে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিদেশে যেতে আগ্রহী বিপুলসংখ্যক কর্মীর জন্য দীর্ঘদিনের বড় একটি আর্থিক বাধা দূর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। একই সঙ্গে বৈধ পথে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে অবৈধভাবে বিদেশযাত্রা ঠেকাতেও উদ্যোগটি ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মঙ্গলবার সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে নিরাপদ অভিবাসন ও অবৈধভাবে বিদেশযাত্রা প্রতিরোধ বিষয়ে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা জানান। সভায় বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থাপনা জোরদার, কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিদেশ যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

মন্ত্রী বলেন, সরকারিভাবে কোনো খরচ ছাড়াই ১০ হাজার কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি স্বচ্ছ ও বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করা হবে। বিদেশে কাজের সুযোগ পেতে গিয়ে অনেক মানুষ যেন দালালচক্রের হাতে অর্থ ও প্রতারণার শিকার না হন, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ একটি গন্তব্য। নির্মাণ, উৎপাদন, সেবা, কৃষি ও বিভিন্ন কারিগরি খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের উপস্থিতি রয়েছে। তবে বিদেশে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, অনিয়ম এবং তথ্যের ঘাটতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠেছে। এসব কারণে বিদেশে যাওয়ার আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের পক্ষে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সরকারের বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা এ বাস্তবতায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। তবে উদ্যোগটি বাস্তবে কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, কোন ধরনের কর্মীরা অগ্রাধিকার পাবেন এবং কর্মী বাছাই থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ, নিয়োগ ও যাত্রা পর্যন্ত কোন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে—এসব বিষয় পরবর্তী সময়ে স্পষ্ট হবে। স্বচ্ছতার সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়া পরিচালনা করা গেলে বিদেশগামী কর্মীদের ওপর আর্থিক চাপ কমার পাশাপাশি অভিবাসন ব্যবস্থায় মানুষের আস্থাও বাড়তে পারে।

মতবিনিময় সভায় মন্ত্রী বিদেশ যাওয়ার আগে কর্মীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ গ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর মতে, শুধু বিদেশে কর্মী পাঠালেই দায়িত্ব শেষ হয় না; কর্মীদের দক্ষ করে তোলা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের কর্মপরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি দেওয়াও জরুরি। দক্ষতা থাকলে একজন কর্মী বিদেশে তুলনামূলক ভালো কাজ পাওয়ার সুযোগ যেমন বাড়াতে পারেন, তেমনি নিজের আয় ও কর্মজীবনের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে পারেন।

এ লক্ষ্যে সুনামগঞ্জের পাঁচটি নির্বাচনী এলাকায় পাঁচটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী। এসব কেন্দ্রে বিদেশগামী কর্মীদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থী নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, এ ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে বিদেশে যেতে আগ্রহী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা, তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া এবং প্রশিক্ষণের আওতায় আনার ক্ষেত্রে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে কর্মীদের বৈধ অভিবাসনের নিয়মকানুন সম্পর্কে সচেতন করাও প্রয়োজন।

বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ভাষাগত দক্ষতার গুরুত্বের কথাও তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, শুধু কারিগরি দক্ষতা অর্জন করলেই হবে না, যে দেশে কর্মীরা যাবেন সেই দেশের কর্মপরিবেশে যোগাযোগের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষাজ্ঞানও অর্জন করতে হবে। এ জন্য ইংরেজি, আরবি, জাপানি, চীনা ও কোরিয়ান ভাষায় প্রশিক্ষণ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

বর্তমান বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বিভিন্ন দেশের চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। একই কাজের জন্য দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মীর চাহিদা যেমন বেশি, তেমনি ভাষাগত যোগাযোগে সক্ষম কর্মীরা কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলায় তুলনামূলক সুবিধা পান। ফলে বিদেশে কর্মসংস্থানের পরিকল্পনার সঙ্গে ভাষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণকে যুক্ত করার উদ্যোগ বাংলাদেশের শ্রমবাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে শুধু সংখ্যার দিকে নজর দিলে হবে না; কর্মীদের দক্ষতা, বেতন, কর্মপরিবেশ, চুক্তির শর্ত এবং নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একজন কর্মী বৈধ ও নিরাপদ প্রক্রিয়ায় বিদেশে গিয়ে যদি নির্ধারিত কাজ ও পারিশ্রমিক পান, তাহলে তাঁর পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। বিপরীতে প্রতারণা বা অনিয়মের মাধ্যমে বিদেশে গিয়ে কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ পরিবার এবং রাষ্ট্র উভয়ের ওপর পড়ে।

নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করার আলোচনায় অবৈধভাবে বিদেশযাত্রা বন্ধের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের অনেক মানুষ বিভিন্ন সময়ে দালাল বা অননুমোদিত মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা করেন। এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি ভিসা জটিলতা, প্রতারণা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং বিদেশে গিয়ে আইনি সমস্যায় পড়ার ঝুঁকি থাকে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো গেলে এ ধরনের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।

মন্ত্রী বিদেশগামীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের পর বৈধ প্রক্রিয়ায় বিদেশ যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর এই আহ্বানের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণভাবে যুক্ত হচ্ছে। বিশেষ করে যারা অর্থের অভাবে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না, তাদের জন্য সরকারি উদ্যোগে কম খরচে বা বিনা খরচে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হলে তা নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে।

মালয়েশিয়ায় ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর প্রস্তাব তাই শুধু বিদেশে কর্মসংস্থানের একটি সংখ্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু পরিবারের অর্থনৈতিক প্রত্যাশা। একজন কর্মীর বিদেশযাত্রা অনেক সময় পুরো একটি পরিবারের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারে। নিয়মিত আয়, পরিবারের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন, সন্তানের শিক্ষা এবং ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয়ের সুযোগ তৈরি হয়। একই সঙ্গে দেশে পাঠানো রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখে।

তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতার ওপর। কর্মী নির্বাচন থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ, নিয়োগকর্তা নির্বাচন, ভিসা প্রক্রিয়া, চুক্তির শর্ত এবং বিদেশে পৌঁছানোর পর কর্মীদের অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে পরিচালনা করতে হবে। কোনো পর্যায়ে অনিয়ম বা অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হলে বিনা খরচে কর্মী পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে।

সরকারের পক্ষ থেকে সুনামগঞ্জে পাঁচটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনাও স্থানীয় জনগণের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে যুক্ত করা গেলে শুধু বিদেশে কর্মসংস্থানই নয়, দেশের মানবসম্পদের মানও উন্নত হবে। দীর্ঘমেয়াদে দক্ষ কর্মী তৈরি ও বৈধ অভিবাসন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

সব মিলিয়ে, বিনা খরচে ১০ হাজার কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর সরকারি উদ্যোগ বিদেশে কর্মসংস্থানপ্রত্যাশীদের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে ভাষা ও কারিগরি দক্ষতা অর্জনের ওপর সরকারের জোর নিরাপদ ও টেকসই অভিবাসনের পথকে আরও শক্তিশালী করার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন এই পরিকল্পনা কত দ্রুত এবং কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দক্ষতা, বৈধতা ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করা গেলে বিদেশে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বহু পরিবারের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎও বদলে যেতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত