রেমিট্যান্স-রিজার্ভে স্বস্তি, কাটেনি অর্থনীতির চাপ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৩ বার
রেমিট্যান্স-রিজার্ভে স্বস্তি, কাটেনি অর্থনীতির চাপ

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রবাসী আয়ের প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক পরিবর্তন দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়েছে। তবে এই স্বস্তির আড়ালে রয়ে গেছে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বেশ কিছু গভীর চাপ। মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের ওপরে, বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণপ্রবাহে গতি নেই, আর রপ্তানি খাতেও প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে না। ফলে বৈদেশিক খাতে কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও অর্থনীতির সামগ্রিক পুনরুদ্ধার এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) তাদের ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি : এপ্রিল-জুন ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতির এই চিত্র তুলে ধরেছে। সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন প্রান্তিকে অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা গেছে। তবে এই পুনরুদ্ধারকে টেকসই করতে হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ব্যাংক খাতের দুর্বলতা দূর করা, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক করার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাময়িক হিসাবে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হয়েছে। আগের অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জনসংখ্যার আকার এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভাবনার তুলনায় এই প্রবৃদ্ধিকে এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী বলে মনে করছে না ব্যবসায়ী সংগঠনটি।

অর্থনীতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি এখনো মূল্যস্ফীতি। কয়েক মাস ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। আয় একই হারে না বাড়ায় অনেক পরিবারকে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় কমাতে হচ্ছে। এমসিসিআইয়ের হিসাবে জুনে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে। মে মাসে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে।

খাদ্য মূল্যস্ফীতিতেও সামান্য স্বস্তির চিত্র দেখা গেছে। জুনে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ এই নয় যে পণ্যের দাম আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। বরং দাম বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমেছে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ দামে পণ্য কিনতে হওয়ায় মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, তা এখনো বহাল রয়েছে। খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও জ্বালানির দামের চাপও অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে।

এই পরিস্থিতিতে বৈদেশিক খাত কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে। এপ্রিল থেকে জুন—এই তিন মাসে বাংলাদেশে ৯ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার বা ৯৩৮ কোটি ডলার প্রবাসী আয় এসেছে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগানে রেমিট্যান্সের এই ধারাবাহিক প্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করছে না, দেশের ভেতরেও বিপুলসংখ্যক পরিবারের আয় ও ভোগব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

রেমিট্যান্স বাড়ার প্রভাব বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও স্পষ্ট হয়েছে। জুন শেষে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মে মাসের শেষে রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার। এক মাসে রিজার্ভে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি তৈরি করেছে। আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক দায় পরিশোধ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় এই মজুত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে বৈদেশিক খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক রপ্তানিতে একই ধরনের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে না। জুনে রপ্তানি আয় বেড়ে ৪১৯ কোটি ডলারে পৌঁছালেও পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাবে রপ্তানি আয় বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ। অর্থবছর শেষে মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৩৮ কোটি ডলার।

রপ্তানির এই প্রায় স্থবির প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎসগুলোর একটি রপ্তানি। তাই রপ্তানি খাতে দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা দেখা দিলে বৈদেশিক খাতের ভারসাম্যের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

এদিকে দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে অন্যতম বড় বাধা হিসেবে সামনে এসেছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবসা ও শিল্প খাতে প্রয়োজনীয় ঋণ সরবরাহ না বাড়লে নতুন বিনিয়োগের গতি ফেরানো কঠিন। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ সহজ করা এবং ব্যাংক খাতের আস্থার সংকট কাটানো জরুরি বলে মনে করছে ব্যবসায়ী মহল।

বেসরকারি ঋণপ্রবাহের স্থবিরতা অর্থনীতির বাস্তব কর্মকাণ্ডে সরাসরি প্রভাব ফেলে। উদ্যোক্তারা যখন নতুন কারখানা স্থাপন, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো বা ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন পান না, তখন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যায়। এর প্রভাব কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও পড়ে। তাই শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা বাড়লেই অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়িয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।

এমসিসিআই মনে করছে, অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে টেকসই করতে হলে একই সঙ্গে কয়েকটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা, ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা, বেসরকারি বিনিয়োগে গতি আনা এবং ঋণপ্রবাহ স্বাভাবিক করা এখন গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি রপ্তানির প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে বৈদেশিক খাতের স্থিতিশীলতা ধরে রাখাও প্রয়োজন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের সাম্প্রতিক উন্নতি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। কিন্তু অর্থনীতির শক্ত ভিত তৈরি করতে হলে এই স্বস্তিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। প্রবাসী আয় বাড়লেও যদি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেশি থাকে, ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে আগ্রহ হারান এবং ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, তাহলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতি প্রত্যাশিত মাত্রায় ফিরবে না।

অর্থনীতির সামনে তাই এখন দ্বৈত বাস্তবতা। একদিকে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভে স্বস্তি, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, ঋণপ্রবাহ ও রপ্তানিতে চাপ। এই দুই চিত্রের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই আগামী দিনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। নীতিনির্ধারকদের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। বৈদেশিক খাতে অর্জিত স্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দুর্বল জায়গাগুলোতে সংস্কার ও বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে পুনরুদ্ধারের বর্তমান ধারা আরও শক্তিশালী হতে পারে।

অন্যথায় রেমিট্যান্স ও রিজার্ভের ইতিবাচক পরিসংখ্যান সাময়িক স্বস্তি দিলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের বাস্তব পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসতে সময় লাগবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন মূল প্রশ্ন শুধু প্রবৃদ্ধি কত হলো তা নয়; বরং সেই প্রবৃদ্ধি কতটা স্থায়ী, কর্মসংস্থান কতটা বাড়ছে এবং মানুষের জীবনযাত্রায় তার সুফল কতটা পৌঁছাচ্ছে—সেটিই হয়ে উঠছে বড় বিবেচনার বিষয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত