প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
মানিকগঞ্জে চাঁদাবাজির অভিযোগকে কেন্দ্র করে ওয়েস্কেল লোড কন্ট্রোল স্টেশনের সাইট অফিস হিসেবে ব্যবহৃত একটি অস্থায়ী ‘টোল ঘর’ ভেঙে দিয়েছেন ক্ষুব্ধ ট্রাক শ্রমিকরা। মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে পৌরসভার নয়াকান্দি দোয়াত আলী দাখিল মাদ্রাসার সামনের সড়কে এ ঘটনা ঘটে।
টিন দিয়ে নির্মিত ওই অস্থায়ী কার্যালয়টি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ধামরাইয়ের বাথুলি ওয়েস্কেল লোড কন্ট্রোল স্টেশন থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে একটি সংযোগ সড়কে অবস্থিত। এই সড়ক ব্যবহার করে বাথুলি ওজন নিয়ন্ত্রক স্টেশন এড়িয়ে মানিকগঞ্জের তরা ব্রিজ হয়ে সিংগাইর-হেমায়েতপুর দিয়ে ঢাকায় যাতায়াত করা যায়।
স্থানীয় ট্রাক শ্রমিকদের অভিযোগ, নয়াকান্দিতে ওয়েস্কেলের ‘টোল ঘর’ পরিচয়ে ট্রাক থামিয়ে চালকদের কাছ থেকে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো। বিশেষ করে অতিরিক্ত পণ্য বহনের অভিযোগ তুলে ট্রাকচালকদের কাছ থেকে টাকা দাবি করা হতো বলে অভিযোগ তাদের। শ্রমিকদের দাবি, রাতের বেলায় এ ধরনের অর্থ আদায়ের ঘটনা বেশি ঘটত।
ট্রাক শ্রমিক রাসেল মিয়া অভিযোগ করেন, জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রফিক উদ্দিন হাবুর লোকজন ওই টোল ঘর বসিয়ে ট্রাক থেকে চাঁদা আদায় করতেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগও করেন তিনি। এসব ঘটনার প্রতিবাদেই শ্রমিকরা সম্মিলিতভাবে অস্থায়ী ঘরটি ভেঙে দিয়েছেন বলে জানান রাসেল।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রফিক উদ্দিন হাবু। তাঁর দাবি, টোল ঘরটি সরকারি ব্যবস্থার অংশ এবং সেখানে কর্মরত ব্যক্তিরা তাঁর এলাকার পরিচিত হলেও তাঁরা বিএনপির কোনো পদে নেই। তাঁর সঙ্গে টোল ঘরে অর্থ আদায়ের কোনো সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত নিয়ে ট্রাক শ্রমিকদের ভাষ্য, মঙ্গলবার সকালে সিংগাইরের দিকে যাওয়ার পথে ইউনুস আলীর একটি ট্রাক নয়াকান্দি এলাকার ওই অস্থায়ী কার্যালয়ের সামনে থামানো হয়। সেখানে অতিরিক্ত পণ্য বহনের অভিযোগ তুলে সুপারভাইজার নাসির উদ্দিন ও তাঁর সহকারী মো. রানার পক্ষ থেকে চালকের কাছে দুই হাজার টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ।
চালক টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন শ্রমিকরা। পরে দুপুর ১২টার দিকে মানিকগঞ্জ ট্রাকস্ট্যান্ড থেকে ২৫ থেকে ৩০ জন ট্রাক শ্রমিক ঘটনাস্থলে গিয়ে ট্রাক দিয়ে অস্থায়ী ঘরটি ভেঙে দেন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ট্রাকচালক ইউনুস আলী বলেন, পণ্য নিয়ে সিংগাইরের দিকে যাওয়ার সময় নয়াকান্দিতে তাঁর ট্রাক থামিয়ে টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে বাথুলি ওয়েস্কেল হয়ে হেমায়েতপুর ঘুরে যেতে বলা হয়। এর প্রতিবাদ করলে তাঁকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নয়াকান্দির সাইট অফিসের সুপারভাইজার নাসির উদ্দিন। তাঁর ভাষ্য, ট্রাকে অতিরিক্ত পণ্য থাকায় চালককে বাথুলি ওয়েস্কেল হয়ে হেমায়েতপুরের দিকে ফিরে যেতে বলা হয়েছিল। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হলেও তাঁকে মারধর করা হয়নি।
নাসির উদ্দিন বলেন, অস্থায়ী পোস্টটির দায়িত্ব হলো ওভারলোড যানবাহন ফিরিয়ে দেওয়া। এই পোস্টের মাধ্যমে কোনো অবৈধ অর্থ নেওয়া হয় না বলেও দাবি করেন তিনি।
বাথুলি ওয়েস্কেল লোড কন্ট্রোল স্টেশনের ম্যানেজার মিজানুর রহমান জানান, মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী একটি ওভারলোড ট্রাক নয়াকান্দির সাইট অফিসের সামনে এলে কর্মীরা সেটিকে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ নিয়ে ট্রাকচালকের সঙ্গে তর্কবিতর্ক হয়। পরে চালক ফিরে গিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা পর লোকজন নিয়ে এসে অস্থায়ী ঘরটি ভেঙে ফেলেন বলে জানান তিনি।
বাথুলি ওয়েস্কেল স্টেশনের ঠিকাদারের প্রতিনিধি কামরুল ইসলামও সেখানে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, নয়াকান্দির সাইট অফিসে কোনো ধরনের চাঁদা নেওয়ার সুযোগ নেই।
মানিকগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহরিয়ার আলম বলেন, বাথুলি ওয়েস্কেল স্টেশনের ঠিকাদার নয়াকান্দিতে একটি অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করেছেন বলে তিনি শুনেছেন। সেখানে জরিমানা বা চাঁদা আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। তবে কেউ ব্যক্তিগতভাবে অর্থ আদায় করে থাকলে তদন্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার বিষয়ে মানিকগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির হোসেন বলেন, বিষয়টি পুলিশ জানতে পেরেছে। তদন্ত করে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনাটি নিয়ে একদিকে ট্রাক শ্রমিকদের চাঁদাবাজির অভিযোগ, অন্যদিকে ওয়েস্কেল কর্তৃপক্ষের অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ অস্বীকার—দুই পক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। ফলে অস্থায়ী কার্যালয়টি কেন এবং কী উদ্দেশ্যে স্থাপন করা হয়েছিল, সেখানে অর্থ আদায়ের কোনো বৈধ বা অবৈধ কার্যক্রম চলছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।