প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় নতুন প্রশ্ন তুলেছেন নিহত শিক্ষকের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। তাঁর দাবি, শুধু দুই তরুণের পক্ষে একই পরিবারের চারজনকে হত্যা করা সম্ভব নয়; এর পেছনে বড় কোনো শক্তি থাকতে পারে।
মঙ্গলবার দুপুরে রংপুর মহানগরীর কামাল কাছনার মাছুয়াপাড়ায় গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে আয়োজিত শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন গোপীনাথ। তিনি এই মামলার বাদীও। তাঁর ভাষ্য, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
গোপীনাথ চক্রবর্তী বলেন, দুই ব্যক্তি কীভাবে চারজনকে হত্যা করে নির্বিঘ্নে ওই বাড়িতে অবস্থান করতে পারে, তা তাঁর কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। তাঁর ধারণা, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে আরও কেউ থাকতে পারে। তবে কারও নাম উল্লেখ করে তিনি কোনো সন্দেহ প্রকাশ করেননি।
তিনি বলেন, গণপতি ছিলেন অত্যন্ত ভালো মানুষ। তাঁর সঙ্গে কারও বিরোধ বা সংঘাতের কথা তিনি কখনো শোনেননি। তদন্তে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনার প্রত্যাশা করেন তিনি।
মামলাটি বর্তমানে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) তদন্ত করছে। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসের বক্তব্যসহ বিভিন্ন আলামত যাচাই করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, অভিযুক্তদের কর্মকাণ্ড এবং হত্যার আগে ও পরের ঘটনাপ্রবাহও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটিকে চুরি বা ডাকাতির মতো দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে তথ্য দিয়েছেন সিদ্ধার্থ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মুগ্ধ ও তিনি বাড়ির বিভিন্ন ঘর ও ড্রয়ার তছনছ করেন। একপর্যায়ে একটি ঘর থেকে ১৫ হাজার টাকা পান এবং স্বর্ণালংকার নিয়ে সেগুলো পরে একটি নির্জন স্থানে লুকিয়ে রাখেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের আগে সিদ্ধার্থ তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন মাদক ব্যবসায়ী প্রশান্ত ওরফে শান্ত ওরফে খুশির কাছে বন্ধক রেখেছিলেন। পরে দুই দফায় মোট নয়টি ইয়াবা বড়ি নেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রতিটি ইয়াবার দাম ছিল ৩৫০ টাকা এবং হত্যাকাণ্ডের পরদিন আগের মাদকের টাকা পরিশোধ করা হয়।
ঘটনার পর সিদ্ধার্থ একটি মুদি দোকানে এক হাজার টাকার কয়েকটি নোট ভাঙাতে গিয়েছিলেন বলেও তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। দোকানদারের কাছে বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় তিনি পরে পুলিশকে জানান।
তবে তদন্তের বিভিন্ন তথ্য নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। হত্যাকাণ্ডের পর সিদ্ধার্থ স্থানীয় একটি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে গিয়েছিলেন বলে পুলিশের দাবি থাকলেও ক্লিনিকটির মালিক চিকিৎসক সমর্পিতা ঘোষ জানিয়েছেন, ওই দিন সিদ্ধার্থ তাঁর ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে আসেননি। যদিও তিনি অভিযুক্ত তরুণকে আগে থেকেই চেনেন বলে জানান।
বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়েও পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে স্থানীয় এক ইলেকট্রিশিয়ানের বক্তব্যে পার্থক্য পাওয়া গেছে। তদন্তকারী দলের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর বাড়িটিকে অন্ধকার রাখতে মিটার থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল এবং এ কাজ মুগ্ধ নিজেই করেছিলেন। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট ইলেকট্রিশিয়ান দাবি করেছেন, লাইনে ত্রুটির কারণে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল এবং পরে তিনিই তা পুনঃস্থাপন করেন।
এদিকে নিহতদের মরদেহের ময়নাতদন্ত নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। এক ডোম দাবি করেছেন, নিহত মা ও মেয়ের ক্ষেত্রে ধর্ষণের আলামত পেয়েছেন এবং চিকিৎসকের নির্দেশে তা সংরক্ষণ করেছেন। তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বাবলু কিশোর বিশ্বাস জানিয়েছেন, চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। শরীরে ধস্তাধস্তির কারণে সামান্য আঘাতের চিহ্ন থাকলেও উল্লেখযোগ্য অন্য কোনো আঘাত পাওয়া যায়নি। ধর্ষণের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
নিহতদের স্মরণে রংপুর জিলা স্কুলেও মঙ্গলবার প্রার্থনা ও স্মরণসভার আয়োজন করা হয়। সেখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর স্মৃতিচারণ করেন। বক্তারা হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন বিনয়ী ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন শিক্ষক। তাঁর ছেলে আয়ুশও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। এমন মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গভীরভাবে শোকাহত।
এদিকে নিহতদের গ্রামের বাড়ি মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের শিব দেউলপাড়াতেও নেমে এসেছে নীরবতা। স্বজনেরা জানান, গণপতি প্রায় ১০ বছর আগে একবার গ্রামের বাড়িতে এসেছিলেন। পরিবারের ব্যক্তিগত কোনো সমস্যার কথা তিনি তাদের জানাননি।
অন্যদিকে গ্রেপ্তার দুই তরুণের পরিবারের সদস্যরা তাঁদের সন্তানদের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়টি বিশ্বাস করতে পারছেন না। সিদ্ধার্থের বাবা বিনোদ চন্দ্র দাস বলেন, তাঁর ছেলে মাদকাসক্ত হলেও এমন অপরাধে জড়িত ছিল না। আর মুগ্ধর মা সেনা রানী দাসের দাবি, ছেলে নেশা করলেও খুনের মতো ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা তিনি বিশ্বাস করেন না।
সব মিলিয়ে রংপুরের চার হত্যাকাণ্ড ঘিরে একাধিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। গ্রেপ্তার দুই তরুণের জবানবন্দি, ফরেনসিক আলামত, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা এবং হত্যাকাণ্ডের পর তাঁদের গতিবিধি—সবকিছু মিলিয়ে তদন্ত এগোচ্ছে। নিহত পরিবারের স্বজনদের প্রত্যাশা, তদন্তের মাধ্যমে সন্দেহ ও প্রশ্নের অবসান ঘটিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা হবে এবং কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন।