রাশিয়ায় গোপন সফরে সিআইএ প্রধান র‌্যাটক্লিফ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩২ বার
রাশিয়ায় গোপন সফরে সিআইএ প্রধান র‌্যাটক্লিফ

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র‌্যাটক্লিফ রাশিয়ায় গোপন সফর করেছেন বলে খবর সামনে এসেছে। মস্কোর একটি বিমানবন্দরে মার্কিন বিমানবাহিনীর পরিবহন উড়োজাহাজ এবং কূটনৈতিক বহরের উপস্থিতি নজরে আসার পর তাঁর সফরের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। তবে সফর নিয়ে এখন পর্যন্ত ওয়াশিংটন বা মস্কোর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজকে সফর সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র মঙ্গলবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। সূত্রটি র‌্যাটক্লিফের সফরের কথা জানালেও তাঁর সফরের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়নি। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সরকারি কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। সিআইএর পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ কারণে র‌্যাটক্লিফের মস্কো সফরের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এবং ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে সিআইএর প্রধানের এমন সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সম্প্রতি মস্কোর একটি বিমানবন্দরে মার্কিন বিমানবাহিনীর বোয়িং সি-১৭এ গ্লোবমাস্টার থ্রি পরিবহন উড়োজাহাজ অবস্থানের ছবি বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই উড়োজাহাজের উপস্থিতির সঙ্গে র‌্যাটক্লিফের সফরের বিষয়টি সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ আরও বেড়েছে। তবে উড়োজাহাজটি ঠিক কোন কাজে ব্যবহৃত হয়েছে কিংবা র‌্যাটক্লিফের সফরের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক কতটা, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।

সিবিএস নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিআইএর পরিচালক হিসেবে র‌্যাটক্লিফের এটি প্রথম রাশিয়া সফর বলে মনে হচ্ছে। এর আগে গোয়েন্দা পর্যায়ে রাশিয়ার কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ থাকার বিষয়টি জানা গেলেও প্রকাশ্য সফরের ঘটনা আলাদাভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যখন দীর্ঘদিনের বৈরিতা, পারস্পরিক সন্দেহ ও নিরাপত্তা উদ্বেগে আবদ্ধ, তখন দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের গোপন যোগাযোগ কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা মহলে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এ ধরনের যোগাযোগ সাধারণত এমন কিছু বিষয়ে হতে পারে, যেগুলো প্রকাশ্য কূটনৈতিক চ্যানেলের বাইরে সীমিত পরিসরে আলোচনা করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো মনে করে।

র‌্যাটক্লিফের সফরের আগে ইউক্রেনকে একটি উচ্চপর্যায়ের মার্কিন প্রতিনিধি দলের মস্কো সফরের বিষয়ে জানানো হয়েছিল বলেও সূত্রের বরাতে জানিয়েছে সিবিএস নিউজ। প্রতিনিধি দলটি রওনা হওয়ার আগ পর্যন্ত হামলা স্থগিত রাখার জন্য ইউক্রেনকে অনুরোধ করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

এই তথ্য সত্য হলে সফরটির সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতির একটি সরাসরি যোগসূত্র থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়। যদিও র‌্যাটক্লিফ মস্কোতে ঠিক কার সঙ্গে বৈঠক করেছেন, কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে কিংবা কোনো সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে এখনো নির্ভরযোগ্যভাবে বিস্তারিত জানা যায়নি।

রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নতুন নয়। যুদ্ধ, বন্দি বিনিময়, নিরাপত্তা সংকট কিংবা এমন কিছু সংবেদনশীল বিষয়ে যেখানে প্রকাশ্য কূটনৈতিক যোগাযোগ জটিল হয়ে ওঠে, সেখানে গোয়েন্দা পর্যায়ের যোগাযোগ অনেক সময় বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

সিআইএর নেতৃত্বাধীন এ ধরনের যোগাযোগের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হলো মার্কিন ও রুশ বন্দি বিনিময়। গত বছরের এপ্রিলে মার্কিন-রুশ দ্বৈত নাগরিক কেসনিয়া কারেলিনার মুক্তির ক্ষেত্রে সিআইএর ভূমিকা ছিল বলে জানা যায়। তাঁর মুক্তির বিষয়ে র‌্যাটক্লিফ নিজেও আলোচনায় যুক্ত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাংবাদিক ইভান গেরশকোভিচ এবং সাবেক মার্কিন মেরিন সদস্য পল হুইলানের মুক্তির ক্ষেত্রেও সিআইএ সম্পৃক্ত ছিল। এসব ঘটনায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা তীব্র থাকলেও নির্দিষ্ট মানবিক ও নিরাপত্তা ইস্যুতে দুই পক্ষের মধ্যে গোপন যোগাযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

র‌্যাটক্লিফের বর্তমান সফরের সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট হিসেবে রাশিয়ার সামরিক ও নিরাপত্তা নীতির পরিবর্তন নিয়েও আলোচনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক গোয়েন্দা মূল্যায়নে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষেত্রে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের হিসাব-নিকাশ পরিবর্তিত হতে পারে।

ওই মূল্যায়ন অনুযায়ী, রাশিয়া ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক পদক্ষেপ নেওয়ার অনুমতি দিতে পারে। সম্ভাব্য পদক্ষেপের মধ্যে এমন হাইব্রিড কার্যক্রম বা সামরিক অভিযান থাকতে পারে, যার দায় সরাসরি স্বীকার করার প্রয়োজন হবে না। এর মাধ্যমে ন্যাটো জোট এবং মার্কিন প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও দৃঢ়তা যাচাই করার চেষ্টা করা হতে পারে বলে মার্কিন গোয়েন্দা মহলে আশঙ্কা রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে র‌্যাটক্লিফের মস্কো সফরকে শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। ইউরোপের নিরাপত্তা, ন্যাটোর সঙ্গে রাশিয়ার উত্তেজনা এবং ইউক্রেন যুদ্ধের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ গতিপথের সঙ্গে সফরটির কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

র‌্যাটক্লিফের আগে সিআইএর সাবেক পরিচালক উইলিয়াম বার্নসও মস্কো সফর করেছিলেন। ২০২১ সালের নভেম্বরে বার্নস রাশিয়ার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই সফরের সময় তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকেও ইউক্রেনে হামলা না চালানোর বিষয়ে সরাসরি সতর্ক করেছিলেন।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি ২০২১ সালের তুলনায় অনেক বেশি জটিল। রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে, ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এসেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্কের অবনতি আরও গভীর হয়েছে। ফলে র‌্যাটক্লিফের মস্কো সফর হয়ে থাকলে তার কৌশলগত গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি হতে পারে।

তবে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ সফরের খবরটি এখনো সরকারি পর্যায়ে প্রকাশ করা হয়নি এবং এর উদ্দেশ্য সম্পর্কেও নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ পায়নি। ফলে এটি শান্তি আলোচনা, বন্দি বিনিময়, নিরাপত্তা বার্তা, গোয়েন্দা যোগাযোগ কিংবা অন্য কোনো সংবেদনশীল বিষয়ে হয়ে থাকতে পারে—এমন একাধিক সম্ভাবনা রয়েছে।

গোপন কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে খুব কম তথ্য পাওয়া স্বাভাবিক। অনেক সময় এ ধরনের বৈঠকের বিষয়বস্তু দীর্ঘ সময় গোপন রাখা হয়, বিশেষ করে যখন সংশ্লিষ্ট আলোচনায় যুদ্ধরত পক্ষ, গোয়েন্দা তথ্য, বন্দি বা সম্ভাব্য সামরিক ঝুঁকির মতো স্পর্শকাতর বিষয় জড়িত থাকে।

র‌্যাটক্লিফের সফর তাই প্রকাশ্যে আসার পরও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে—মস্কোতে তিনি কী নিয়ে আলোচনা করেছেন। যদি সফরটির সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের কোনো কূটনৈতিক বা নিরাপত্তাগত উদ্যোগ যুক্ত থাকে, তাহলে এর প্রভাব ভবিষ্যতে আরও স্পষ্ট হতে পারে। আর যদি এটি গোয়েন্দা পর্যায়ের নিয়মিত বা বিশেষ যোগাযোগের অংশ হয়ে থাকে, তাহলেও রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রকাশ্য উত্তেজনার আড়ালে যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যানেল সক্রিয় থাকার ইঙ্গিত মিলবে।

বর্তমানে মস্কো ও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে নীরবতা বজায় রাখা হয়েছে। ফলে র‌্যাটক্লিফের সফর ঘিরে যে প্রশ্নগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলোর উত্তর পেতে আরও তথ্যের অপেক্ষা করতে হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রধানের মস্কোয় উপস্থিতির খবর নিজেই দুই পরাশক্তির সম্পর্কের অন্তরালে চলা কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা যোগাযোগের গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত