কক্সবাজার আদালতে গুলির ঘটনায় ২ মামলা, গ্রেফতার ১৩

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬
  • ১ বার
কক্সবাজার আদালত প্রাঙ্গনে গোলাগুলির ঘটনায় ২ মামলা

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে পুরো জেলায়। আদালতের মতো স্পর্শকাতর ও নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় দিনের আলোতে সশস্ত্র হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা। ঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। এ ঘটনায় দ্রুত বিচার আইন ও অস্ত্র আইনে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত মোট ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে একাধিক দল কাজ করছে।

মঙ্গলবার সকালে কক্সবাজার সদর মডেল থানার তদন্ত কর্মকর্তা হিমেল রায় মামলা দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, একটি মামলার বাদী হয়েছেন ঝিলংজা ইউনিয়ন বিএনপির নেতা লিয়াকত আলী। এই মামলায় গ্রেফতার জিয়াউল হক জিকুকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাত কয়েকজনকেও আসামি করা হয়েছে। মামলাটি দ্রুত বিচার আইনে নথিভুক্ত করা হয়েছে।

অপরদিকে অস্ত্র আইনে দায়ের করা দ্বিতীয় মামলার বাদী হয়েছেন কক্সবাজার সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক রুহুল আমিন। এই মামলারও প্রধান আসামি জিয়াউল হক জিকু। মামলায় কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে আরও কিছু অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করে অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হচ্ছে।

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতার হওয়া এক আসামিকে ইতোমধ্যে আদালতে পাঠানো হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে রিমান্ড আবেদনও করা হয়েছিল। তবে আদালত শুনানি শেষে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। বাকি আসামিদের গ্রেফতারে কক্সবাজার ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চলছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, প্রধান আসামি জিয়াউল হক জিকু কক্সবাজারের ঈদগাঁও উপজেলার কালিরছড়া এলাকার বাসিন্দা। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া মামলায় নাম থাকা অন্য আসামিদের বেশিরভাগই লিংকরোড এলাকার বাসিন্দা। পুলিশ বলছে, তাদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে আগেও নানা ধরনের অভিযোগ ছিল।

এজাহারে বাদী লিয়াকত আলী উল্লেখ করেছেন, পূর্বের বিরোধ এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় তাকে হত্যার পরিকল্পনা থেকেই আদালত প্রাঙ্গণে হামলা চালানো হয়েছে। হামলাকারীরা পরিকল্পিতভাবে আদালতে এসে গুলি চালায় বলে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে অস্ত্র আইনের মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজে কয়েকজনের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা গেছে।

রোববার সকালে এই ঘটনা ঘটে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত এলাকায়। সেদিন সাবেক ইউপি সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলী মেম্বার একটি মামলায় হাজিরা দিতে সহযোগীদের নিয়ে আদালতে আসেন। এ সময় আদালত চত্বরে হঠাৎ গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে লিয়াকত আলী এবং তার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ মঈন উদ্দিন গুলিবিদ্ধ হন। আহতদের মধ্যে লিয়াকত আলী প্রাথমিক চিকিৎসা নিলেও মঈন উদ্দিনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ঘটনার পরপরই আদালত এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী এবং সাধারণ মানুষ ছোটাছুটি শুরু করেন। অনেকেই আদালতের বিভিন্ন কক্ষে আশ্রয় নেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গুলির শব্দে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। আদালতের মতো জায়গায় এ ধরনের ঘটনা আগে খুব কমই দেখা গেছে।

ঘটনার কিছুক্ষণ পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। সেই ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, হামলাকারীদের পাশাপাশি আহত পক্ষের সঙ্গেও কয়েকজনের হাতে অস্ত্র ছিল। এমনকি লিয়াকত আলীর এক ভাইয়ের হাতেও অস্ত্র দেখা গেছে বলে দাবি উঠেছে। এসব ভিডিও এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ব্যবহার করছে পুলিশ।

জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল এই সংঘর্ষ লিয়াকত আলী মেম্বার ও খালেক বাহিনীর মধ্যকার পূর্ব বিরোধের জেরে হয়েছে। তবে তদন্তে নতুন কিছু তথ্য উঠে এসেছে। তিনি বলেন, এই ঘটনার সঙ্গে তৃতীয় আরেকটি পক্ষের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। বিশেষ করে রামু, গর্জনিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত এলাকায় মাদক ও চোরাচালান সংশ্লিষ্ট বিরোধের বিষয়টি তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

গরু পাচার, মাদক চোরাচালান কিংবা সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধের সঙ্গে এই ঘটনার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, তদন্তে এমন কিছু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে যা এই ধরনের অপরাধচক্রের সম্পৃক্ততার দিকে ইঙ্গিত করে। তবে পুরো বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন এবং সব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকরা বলছেন, আদালত প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে অস্ত্রের ব্যবহার দেশের বিচারব্যবস্থা ও জননিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক বার্তা বহন করে। আদালত এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। একইসঙ্গে সীমান্ত অঞ্চলে সক্রিয় অপরাধচক্র, মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদও দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে ঘটনার পর আদালত এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে বিচার বিভাগীয় বিভিন্ন স্থাপনাতেও। সাধারণ মানুষ চাইছেন, দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় আনা হোক এবং আদালত প্রাঙ্গণের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় যেন আর কখনো এমন ঘটনা না ঘটে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত