অর্থ পাচার ঠেকাতে আমদানিতে কড়াকড়ি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ১৬ বার
অর্থ পাচার ঠেকাতে আমদানিতে কড়াকড়ি

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার, অতিমূল্যায়ন, ভুল পণ্যের বিবরণ কিংবা ভুয়া বাণিজ্যিক লেনদেন ঠেকাতে আমদানি কার্যক্রমে নজরদারি আরও জোরদার করছে সরকার। বড় অঙ্কের আমদানির ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর যাচাই-বাছাই বাড়ানোর পাশাপাশি ঋণপত্র বা এলসি খোলার আগেই বাংলাদেশ ব্যাংককে তথ্য জানানোর বাধ্যবাধকতা কার্যকর করা হয়েছে। নতুন এই ব্যবস্থায় একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেনে শৃঙ্খলা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারের সম্ভাব্য পথগুলোও সংকুচিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৩ আগস্ট জারি করা বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগের সমন্বিত নির্দেশনায় আমদানি লেনদেনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিধিবিধান একত্র করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এদিন বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ থেকে ‘FEPD-1 Circular No. 30’ জারি করা হয়, যার বিষয়বস্তু আমদানি লেনদেনসংক্রান্ত বৈদেশিক মুদ্রা বিধিবিধানের সমন্বিত নির্দেশনা। এর মধ্য দিয়ে আমদানি অর্থায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর করণীয় আরও সুস্পষ্ট করা হয়েছে।

নতুন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ৩০ লাখ মার্কিন ডলার বা তার বেশি মূল্যের আমদানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অনুমোদিত ডিলার ব্যাংককে ঋণপত্র খোলার অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনলাইন আমদানি তদারকি ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে। সরকারি আমদানি এই বাধ্যবাধকতার বাইরে থাকবে। বড় অঙ্কের বাণিজ্যিক লেনদেনকে এলসি খোলার আগেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারির আওতায় আনার ফলে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করার সুযোগ বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

এর সঙ্গে সম্প্রতি জারি হওয়া আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯-ও আমদানি ব্যবস্থায় নতুন কাঠামো তৈরি করেছে। ২৪ আগস্ট গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নতুন নীতিমালা কার্যকর করা হয়েছে। এতে আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি বাণিজ্যিক লেনদেনে স্বচ্ছতা, পণ্যের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন নীতিমালায় এলসি ছাড়াও বিক্রয় বা ক্রয় চুক্তির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ সম্প্রসারিত করা হয়েছে এবং এ ধরনের আমদানিতে আগের নির্দিষ্ট মূল্যসীমা তুলে দেওয়া হয়েছে।

একদিকে ব্যবসায়ীদের জন্য আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা হচ্ছে, অন্যদিকে লেনদেনের ওপর নজরদারি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ এলসির বাইরে চুক্তিভিত্তিক আমদানি বাড়লে পণ্যের প্রকৃত মূল্য, পণ্যের বিবরণ, আমদানিকারক ও বিদেশি রপ্তানিকারকের পরিচয় এবং অর্থ পরিশোধের বৈধতা যাচাইয়ের প্রয়োজনও বাড়বে। নতুন ব্যবস্থায় এই বিষয়গুলোতে ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অর্থ পাচারের একটি পরিচিত কৌশল হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে পণ্যের মূল্য বাড়িয়ে দেখানো। কোনো পণ্যের প্রকৃত মূল্য যদি ১০ লাখ ডলার হয়, কিন্তু কাগজপত্রে তার মূল্য কয়েক গুণ বেশি দেখানো হয়, তাহলে অতিরিক্ত অর্থ বিদেশে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। আবার বিপরীতভাবে পণ্যের পরিমাণ বা মূল্য কম দেখিয়েও শুল্ক ফাঁকি বা অন্য ধরনের অবৈধ আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। এসব ঝুঁকি কমাতে আমদানিকারকের পরিচয় থেকে শুরু করে পণ্যের বিবরণ, মূল্য ও বাণিজ্যিক নথিপত্র যাচাই করা জরুরি।

নতুন আমদানি নীতিতে পণ্যের HS কোড এবং পণ্যের বিবরণের মধ্যে অসামঞ্জস্য কমানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একটি পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস নির্ধারণে HS কোড গুরুত্বপূর্ণ। পণ্যের প্রকৃত ধরন ও ঘোষিত কোডের মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে শুল্ক নির্ধারণ, পণ্য খালাস এবং বাণিজ্যিক হিসাবের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে। নতুন নীতিমালায় এ ধরনের জটিলতা কমানোর পাশাপাশি আমদানি ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও স্বচ্ছ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

আমদানি ব্যবস্থার এই পরিবর্তন শুধু অর্থ পাচার ঠেকানোর উদ্যোগ নয়; এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনাও জড়িত। বাংলাদেশে আমদানি ব্যয়ের বড় একটি অংশ বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়। ফলে বড় অঙ্কের আমদানি লেনদেনে অস্বাভাবিক মূল্য, ভুয়া নথি কিংবা অতিরিক্ত অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হলে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে। এ কারণে বড় আমদানির তথ্য আগে থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরে আসা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন নীতিমালায় একই সঙ্গে ব্যবসাবান্ধব কিছু ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। শিল্প ও বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য এলসি ছাড়াই বিক্রয় বা ক্রয় চুক্তির মাধ্যমে আমদানির সুযোগের মূল্যসীমা তুলে দেওয়া হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক বাণিজ্য পরিচালনায় ব্যবসায়ীরা আরও বেশি নমনীয়তা পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানি, প্রবাসী বাংলাদেশিদের শিল্প বিনিয়োগ, ফ্রি ট্রেড জোন এবং কেন্দ্রীয় বন্ডেড ওয়্যারহাউসের মতো বিষয়গুলোও নতুন আমদানি নীতির কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

তবে ব্যবসা সহজ করার সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। আমদানিকারকদের জন্য নিয়ম যত সহজ হবে, সেই ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতে তদারকিও তত কার্যকর হতে হবে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের চুক্তিভিত্তিক আমদানির ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে নথিপত্র যাচাই, গ্রাহকের পরিচয় নিশ্চিতকরণ এবং পণ্যের প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে যথাযথ ধারণা নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানি ব্যবস্থায় নজরদারি বাড়ানোর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত বৈধ ব্যবসাকে বাধাগ্রস্ত করা নয়, বরং অবৈধ লেনদেনের সুযোগ কমানো। কারণ দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতের জন্য দ্রুত এবং সহজ আমদানি ব্যবস্থা প্রয়োজন। কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন উপকরণ আমদানিতে অযথা জটিলতা তৈরি হলে শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন শনাক্ত করে সেখানে বেশি নজর দেওয়া এবং স্বাভাবিক বাণিজ্যিক লেনদেন দ্রুত সম্পন্ন করার মধ্যে ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ।

এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আমদানির নথিপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল্য, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, পণ্যের বাজারদর এবং লেনদেনের ধরন সম্পর্কে ব্যাংক কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত দক্ষতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনলাইন তদারকি ব্যবস্থায় সঠিক ও সময়মতো তথ্য সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আমদানি বাণিজ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিল্পের কাঁচামাল থেকে শুরু করে মূলধনী যন্ত্রপাতি, খাদ্যপণ্য ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির ওপর দেশের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফলে আমদানি বন্ধ বা অযথা কঠোর করার পরিবর্তে ঝুঁকি অনুযায়ী নজরদারি বাড়ানোই কার্যকর পথ হতে পারে।

নতুন নীতিমালা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার ফলে বড় অঙ্কের আমদানি এখন আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায় আসছে। বিশেষ করে ৩০ লাখ ডলার বা তার বেশি মূল্যের আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খোলার আগে তথ্য জানানোর ব্যবস্থা বড় লেনদেনের ওপর আগাম নজরদারির সুযোগ তৈরি করছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহজনক বা অস্বাভাবিক লেনদেন দ্রুত শনাক্ত করা গেলে বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচারের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।

সবশেষে, নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে এর বাস্তব প্রয়োগের ওপর। নিয়ম জারি করাই যথেষ্ট নয়; ব্যাংক, আমদানিকারক, কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্যের সমন্বয়, দ্রুত যাচাই এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ ব্যবসায়ীদের জন্য যেন অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক চাপ তৈরি না হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। অর্থ পাচার রোধের পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা গেলে নতুন আমদানি নীতিমালা দেশের বাণিজ্য ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও আস্থার ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত