প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা দলীয় অবস্থান বিবেচনায় কাউকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও মৌলিক অধিকারের প্রতি সরকারের অঙ্গীকার সব রাজনৈতিক দলের সমর্থকের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। কোনো নাগরিককে কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অন্যায়ভাবে আটক বা কারাগারে রাখা হবে না।
মঙ্গলবার বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শামা ওবায়েদ সরকারের এ অবস্থানের কথা জানান। তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে আইনের শাসন, মানবাধিকার এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তিনি বিরোধী দল, আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ক্ষেত্রে সরকারের নীতির বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরেন।
শামা ওবায়েদ বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে কাউকে অন্যায়ভাবে আটক বা কারাগারে রাখা হবে না এবং সরকার তা নিশ্চিত করবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় তার আইনি অধিকার নির্ধারণের ভিত্তি হতে পারে না। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেটি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিষ্পত্তি করতে হবে। একই সঙ্গে বিচারিক প্রক্রিয়ায় মৌলিক অধিকার রক্ষা করাও নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, বিরোধী দল, আওয়ামী লীগ কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক—কোনো পরিচয়ই এ ক্ষেত্রে মুখ্য নয়। সরকারের দায়িত্ব হলো নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে যাতে কেউ অন্যায়ভাবে কারাগারে না থাকেন, তা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরোধী মত ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি, মামলা এবং গ্রেপ্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্ক রয়েছে। ফলে নতুন সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর এমন বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক উত্তেজনা, মামলা ও গ্রেপ্তারের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের মানবাধিকারনীতি কেমন হবে, সে বিষয়ে মানুষের আগ্রহ রয়েছে।
শামা ওবায়েদের বক্তব্যে একই সঙ্গে আইনের শাসনের প্রতি সরকারের অঙ্গীকারের বিষয়টি সামনে এসেছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার বা আটক না করার নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ কমানোর পাশাপাশি নাগরিকদের মধ্যে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাও বাড়তে পারে। তবে এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ নির্ভর করবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, তদন্তকারী সংস্থা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার ওপর।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের আরেকটি বড় মানবিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মূলত একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল রাজনৈতিক সমস্যা এবং এর সমাধানও রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে।
শামা ওবায়েদের মতে, গত এক দশকে রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল হয়েছে। মিয়ানমারে সহিংসতা, বাস্তুচ্যুতি এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের চেষ্টা চললেও এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। ফলে বাংলাদেশকে দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক মানুষের আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব বহন করতে হচ্ছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, সংকট সমাধানে বাংলাদেশ মিয়ানমারের বর্তমান সরকার, রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন পক্ষ এবং আরাকান আর্মিসহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ এবং সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, শুধু একটি পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের মতো জটিল সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। বাস্তব পরিস্থিতিতে যারা রাখাইন অঞ্চলে প্রভাবশালী, তাদেরও আলোচনার আওতায় আনতে হবে।
রোহিঙ্গা সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পেছনে বাংলাদেশের বাস্তব অভিজ্ঞতাও রয়েছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ব্যাপক সহিংসতার পর কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এর আগে বিভিন্ন সময়েও রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। ফলে কক্সবাজার ও আশপাশের এলাকায় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী জনসংখ্যার চাপ তৈরি হয়েছে।
শামা ওবায়েদ বলেন, ২০১৭ সালে সংকট শুরু হওয়ার পর তৎকালীন সরকার এর সমাধানে যথেষ্ট বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাঁর মতে, তখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা গেলে হয়তো কয়েক বছরের মধ্যেই সংকট সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো।
তবে বর্তমানে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, রাখাইন অঞ্চলে ক্ষমতার পরিবর্তন এবং বিভিন্ন সশস্ত্র পক্ষের উত্থানের কারণে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের প্রশ্নটি এখন শুধু ঢাকা-নেপিডোর দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিও সরাসরি যুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের বর্তমান সংখ্যা নিয়েও শামা ওবায়েদ উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রকৃত সংখ্যা এখন সঠিকভাবে নির্ধারণ করা কঠিন। সীমান্ত দিয়ে বিভিন্ন সময়ে নতুন মানুষ আসছে। পাশাপাশি মিয়ানমারের শরণার্থী শিবিরগুলোতেও প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিশুর জন্ম হচ্ছে। তাঁর হিসাবে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা বর্তমানে ১৩ লাখের বেশি হতে পারে।
এই জনসংখ্যার চাপ বাংলাদেশের জন্য শুধু মানবিক নয়, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবেও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ধরে শরণার্থী শিবির পরিচালনা, খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং নিরাপত্তা বজায় রাখতে বাংলাদেশকে বিপুল সম্পদ ব্যয় করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল এই ব্যবস্থায় অর্থের সংকট তৈরি হলে শরণার্থীদের জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে।
রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়েছে। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এলাকায় বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর উপস্থিতি স্থানীয় পরিবেশ, ভূমি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলেছে। তাই সংকটের স্থায়ী সমাধান না হলে শুধু শরণার্থী জনগোষ্ঠী নয়, স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনেও এর প্রভাব আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে তাই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একই সঙ্গে সামনে এসেছে—দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রোহিঙ্গা সংকটের রাজনৈতিক সমাধান খোঁজা। দুই ক্ষেত্রেই মানবাধিকার ও আইনের শাসনকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা রয়েছে।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ থেকে মুক্ত একটি বিচারব্যবস্থা এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের চেষ্টা—দুটি বিষয়ই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের বক্তব্য এখন বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রতিফলিত হয়, সেটিই হবে মূল বিষয়। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের সমান প্রয়োগ এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে পারলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই আস্থা বাড়তে পারে।