আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ১১ বার
আজ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

আজ বুধবার, ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি। যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা, ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালিত হচ্ছে। ইসলামি বিশ্বাস ও ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই দিন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের স্মৃতিবিজড়িত। মুসলমানদের কাছে দিনটি মহানবীর জীবন, শিক্ষা, আদর্শ ও মানবতার প্রতি তাঁর অবদান স্মরণ এবং সেই আদর্শ অনুসরণের অঙ্গীকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

বাংলাদেশে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৪৪৮ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসের গণনা শুরু হয়েছে ১৫ আগস্ট। বাংলাদেশের আকাশে রবিউল আউয়ালের চাঁদ দেখা না যাওয়ায় সফর মাস ৩০ দিন পূর্ণ হয়। সেই হিসাব অনুযায়ী আজ ১২ রবিউল আউয়াল এবং দেশজুড়ে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালিত হচ্ছে। দিনটি বাংলাদেশে সরকারি ছুটির দিন।

ইসলামি ঐতিহ্যে ১২ রবিউল আউয়াল মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসেবে পরিচিত। প্রচলিত ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী (সা.) ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে মক্কায় কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে মদিনায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর ২৩ বছরের নবুয়তি জীবন মানবতার জন্য তাওহিদ, ন্যায়, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ক্ষমা, সহমর্মিতা ও মানবিক মর্যাদার শিক্ষা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মহানবী (সা.)-এর জীবন ছিল নানা প্রতিকূলতা ও সংগ্রামে পরিপূর্ণ। জন্মের আগেই তিনি পিতাকে হারান। শৈশবেই মাতা আমিনা (রা.) এবং পরে দাদা আবদুল মুত্তালিবকে হারিয়ে চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে বড় হন। তাঁর জীবনের এই অভিজ্ঞতাগুলো পরবর্তী সময়ে এতিম, অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি তাঁর গভীর সহমর্মিতার প্রকাশেও প্রতিফলিত হয়েছে।

৪০ বছর বয়সে মক্কার হেরা গুহায় তাঁর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়। এরপর দীর্ঘ ২৩ বছর তিনি আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। মক্কার কঠিন বিরোধিতা, নির্যাতন ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি সত্য ও ন্যায়ের আহ্বান থেকে বিচ্যুত হননি। মদিনায় হিজরতের পর তিনি একটি ন্যায়ভিত্তিক ও বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষমা, সহনশীলতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানুষের মর্যাদার যে দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে, তা আজও মুসলমানদের কাছে অনুসরণীয়।

ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সরকারের জাতীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন, মসজিদে বিশেষ দোয়া ও আলোচনা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ নিয়ে বিভিন্ন আয়োজন করা হচ্ছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনও ওয়াজ মাহফিল, সেমিনার, আলোচনা, কিরাত, হামদ-নাত ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ চত্বরে মাসব্যাপী ইসলামি বইমেলারও আয়োজন করা হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে কোরআন তিলাওয়াত, মিলাদ, দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এসব আয়োজনে মহানবী (সা.)-এর জীবন, তাঁর চরিত্র, মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং সমাজে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার শিক্ষা তুলে ধরা হচ্ছে। শিশু-কিশোরদের মধ্যেও মহানবীর জীবন ও আদর্শ সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিশেষ কর্মসূচি নিয়েছে।

রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতেও মানবিকতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সরকারি কর্মসূচির আওতায় হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি এতিমখানা, শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র ও বৃদ্ধাশ্রমে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা রাখার কথা জানানো হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে পবিত্র দিনটির তাৎপর্য শুধু আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশবাসী ও বিশ্বের মুসলমানদের শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়েছেন। তাঁর বাণীতে মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহনশীলতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার আদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে। বর্তমান বিশ্বের যুদ্ধ, সংঘাত, হিংসা, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতার প্রেক্ষাপটে মহানবীর শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক বলেও তিনি উল্লেখ করেন। রাষ্ট্রপতি হিংসা, বিদ্বেষ, বিভেদ ও অন্যায় পরিহার করে শান্তি, সম্প্রীতি, সাম্য ও মানবিকতার ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে পৃথক বাণীতে দেশবাসী ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ অনুসরণ করে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। তাঁর শিক্ষা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ধারণ করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও ন্যায়বোধকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানান।

ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে গতকাল বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে পবিত্র সিরাতুন্নবী (সা.)-এর পক্ষকালব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি। এ আয়োজনে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও বিদায় হজের ভাষণের মানবিক বার্তার প্রাসঙ্গিকতার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতি বলেন, মানবিক মর্যাদা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক অধিকারের বিষয়ে মহানবীর বিদায় হজের ভাষণের শিক্ষা আজও সমগ্র মানবতার জন্য প্রাসঙ্গিক।

মহানবী (সা.)-এর জীবনকে শুধু ধর্মীয় ইতিহাসের একটি অধ্যায় হিসেবে নয়, মানবিক মূল্যবোধের এক বিস্তৃত শিক্ষা হিসেবেও দেখা হয়। তাঁর জীবনের বিভিন্ন ঘটনায় মানুষের প্রতি দয়া, প্রতিবেশীর অধিকার, এতিম ও দরিদ্রের প্রতি দায়িত্ব, নারীর মর্যাদা, ব্যবসায় সততা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থানের শিক্ষা পাওয়া যায়। তাই ঈদে মিলাদুন্নবীর তাৎপর্য শুধু আনন্দ বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নিজের জীবন ও সমাজে মহানবীর আদর্শ কতটা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে, সেই আত্মসমালোচনারও একটি সুযোগ।

আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধ, সহিংসতা, ধর্মীয় ও সামাজিক বিভাজন, বৈষম্য এবং অসহিষ্ণুতার বাস্তবতায় মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, ক্ষমা ও মানবিকতার শিক্ষা নতুন করে আলোচনায় আসে। ব্যক্তি থেকে পরিবার, সমাজ থেকে রাষ্ট্র—প্রতিটি স্তরে পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায়বোধ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। সেই জায়গা থেকেই ঈদে মিলাদুন্নবীর শিক্ষা মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে পারে।

বাংলাদেশের মুসলমানরা আজ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে দিনটি পালন করছেন। মসজিদে মসজিদে দোয়া ও আলোচনা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মিলাদ ও মাহফিল এবং বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ স্মরণ করা হচ্ছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, দরিদ্রদের সহায়তা করা এবং সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলে পবিত্র দিনটির মানবিক আবেদন আরও গভীর হবে।

ঈদে মিলাদুন্নবী তাই মুসলমানদের জন্য কেবল একটি স্মরণীয় দিন নয়; এটি সত্য, ন্যায়, সাম্য, ক্ষমা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার পথে ফিরে আসার একটি আহ্বানও। মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ ব্যক্তি ও সমাজজীবনে ধারণ করার মধ্য দিয়েই এই দিনের প্রকৃত শিক্ষা বাস্তব অর্থে প্রতিফলিত হতে পারে। শান্তি ও কল্যাণের সেই বার্তাই আজকের দিনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের মুসলিম সমাজে নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত