লন্ডনে মদের বার কিনে মসজিদ গড়লেন রাউজানের জিয়া

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬
  • ১০ বার
মদের বার কিনে মসজিদ গড়লেন রাউজানের জিয়া

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পূর্ব লন্ডনে একটি মদের বার কিনে সেটিকে মসজিদ ও মুসলিম কমিউনিটি সেন্টারে রূপান্তর করেছেন চট্টগ্রামের রাউজানের সন্তান ও লন্ডনপ্রবাসী ব্যবসায়ী জিয়া বিন রাসেল। একটি বাণিজ্যিক স্থাপনা কিনে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে ধর্মীয় ও সামাজিক কাজে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার এই উদ্যোগ স্থানীয় মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছে। তাঁর এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘদিনের মানবিক কর্মকাণ্ডও।

জানা গেছে, পূর্ব লন্ডনে মদের বার হিসেবে ব্যবহৃত একটি ভবন কিনে সেটিকে পূর্ণাঙ্গ মসজিদ ও মুসলিম কমিউনিটি সেন্টারে রূপান্তর করেন জিয়া বিন রাসেল। মুসলিমদের ধর্মীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি কমিউনিটির বিভিন্ন সামাজিক ও কল্যাণমূলক কাজে স্থানটি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। একটি মদের বারকে ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের ঘটনা তাঁর মানবিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি আগ্রহের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে।

জিয়া বিন রাসেলের মানবিক কর্মকাণ্ড অবশ্য শুধু লন্ডনে মসজিদ প্রতিষ্ঠার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগে তিনি সহযোগিতা করে আসছেন বলে জানা যায়। তাঁর কর্মকাণ্ডের অন্যতম দিক হলো সুবিধাবঞ্চিত ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার ব্যবস্থা করা।

প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের জন্য অনেক সময় এককালীন খাদ্য সহায়তা কিংবা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়া হলেও তাদের দীর্ঘমেয়াদে স্বাবলম্বী করে তোলা বড় চ্যালেঞ্জ। সেই জায়গায় জিয়া বিন রাসেলের উদ্যোগ কিছুটা ভিন্ন। শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তার পরিবর্তে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের কর্মদক্ষতা তৈরি এবং ভবিষ্যতে আয় করার সুযোগ করে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এই উদ্দেশ্যে সাভারের নবীনগরে ‘হাফেজ্জি চ্যারিটেবল সোসাইটি অব বাংলাদেশ’-এর মাধ্যমে প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রশিক্ষণ চালু করা হয়েছে। এর মূল অর্থায়ন ও পরিকল্পনার সঙ্গে জিয়া বিন রাসেল যুক্ত রয়েছেন বলে জানা গেছে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষকে নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী কাজের উপযোগী করে তোলার উদ্যোগটি তাদের জীবনে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

একইভাবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত নারীদের আত্মনির্ভরশীল করার ক্ষেত্রেও কাজ করছেন তিনি। শুধু সাময়িক আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিবর্তে নারীদের আয় করার সুযোগ তৈরি করতে বিভিন্ন উপকরণ সরবরাহ করা হয়েছে। কোথাও সেলাই মেশিন, কোথাও নগদ অর্থ কিংবা অন্য কোনো আয়মুখী সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে পরিবারগুলোর জন্য স্থায়ী উপার্জনের পথ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে।

গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে নারীর আয় সরাসরি পরিবারের জীবনযাত্রার মানের ওপর প্রভাব ফেলে। একটি সেলাই মেশিন কিংবা ছোট পরিসরে আয় করার কোনো উপকরণ একটি পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে। এমন চিন্তা থেকেই জিয়া বিন রাসেলের সহায়তায় বিভিন্ন এলাকায় দরিদ্র নারীদের জন্য আয়মুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

ধর্মীয় মূল্যবোধ ও দ্বীনি শিক্ষার প্রসারেও তাঁর সহযোগিতা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন দুর্গম অঞ্চলের মক্তব ও মাদরাসায় নিয়মিত অনুদান দেওয়ার পাশাপাশি এতিম ও দুস্থ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষা থেমে যাওয়ার যে ঝুঁকি থাকে, সহায়তার মাধ্যমে তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হয়েছে।

তাঁর সরাসরি অর্থায়নে একাধিক শিক্ষার্থী পবিত্র কোরআনের হিফজ সম্পন্ন করে হাফেজ হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন বলেও জানা গেছে। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি অসহায় শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ তাদের ভবিষ্যৎ জীবনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

জিয়া বিন রাসেলের মানবিক কর্মকাণ্ডের পরিধি দেশের সীমানার মধ্যেও সীমাবদ্ধ নেই। যুদ্ধ ও সংঘাতে বিপর্যস্ত মানুষের জন্যও তিনি সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন। ফিলিস্তিনের গাজায় দীর্ঘদিন ধরে চলা ভয়াবহ মানবিক সংকট এবং সুদানের চরম দুরবস্থার সময়ও তাঁর অনুদান পৌঁছেছে বলে জানা যায়।

গাজা ও সুদানের মতো সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে সাধারণ মানুষের জীবন যখন খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার সংকটে বিপর্যস্ত, তখন ব্যক্তি পর্যায়ের মানবিক সহায়তাও অনেক মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এই দুই অঞ্চলের সংকটেও জিয়া বিন রাসেলের অনুদান দেওয়ার উদ্যোগ তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ডের আন্তর্জাতিক পরিসরকে তুলে ধরে।

দেশের যেকোনো দুর্যোগময় পরিস্থিতিতেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন এই লন্ডনপ্রবাসী ব্যবসায়ী। বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অন্য কোনো সংকটের সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজন মেটাতে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্য হিসেবে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের সংকট কিছুটা লাঘব করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে পূর্ব লন্ডনের মদের বার কিনে সেটিকে মসজিদে রূপান্তরের উদ্যোগটি তাঁর অন্যান্য কর্মকাণ্ডের তুলনায় আলাদা তাৎপর্য বহন করছে। একটি বাণিজ্যিক স্থাপনাকে ধর্মীয় উপাসনালয় ও সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্রে পরিণত করার মাধ্যমে স্থানীয় মুসলিমদের জন্য নতুন একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেখানে মুসলিম কমিউনিটির ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের প্রয়োজন রয়েছে, সেখানে এমন একটি স্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মসজিদ শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়; মুসলিম সমাজে এটি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানবিক কর্মকাণ্ডেরও একটি কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে পূর্ব লন্ডনের নতুন এই মসজিদ ও কমিউনিটি সেন্টার স্থানীয় মানুষের জন্য ধর্মীয় কার্যক্রমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ ও কল্যাণমূলক উদ্যোগের জায়গা হয়ে উঠতে পারে।

রাউজানের সন্তান হিসেবে দেশের মানুষের জন্যও জিয়া বিন রাসেলের বিভিন্ন উদ্যোগের আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। প্রবাসে বসবাস করেও দেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কথা মনে রাখা এবং তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগে অর্থায়ন করা প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামাজিক দায়িত্ববোধের একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি মানুষকে ভবিষ্যতের জন্য স্বাবলম্বী করে তোলা। জিয়া বিন রাসেলের বিভিন্ন উদ্যোগে এই দুই দিকই দেখা যায়। কোথাও অসহায় মানুষকে সরাসরি সহায়তা দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও প্রশিক্ষণ, আয়মুখী উপকরণ ও শিক্ষার সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে।

লন্ডনে মদের বার কিনে মসজিদে রূপান্তরের উদ্যোগ থেকে শুরু করে প্রতিবন্ধীদের দক্ষতা উন্নয়ন, দরিদ্র নারীদের স্বাবলম্বী করার চেষ্টা, মক্তব-মাদরাসা ও এতিম শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো—সব মিলিয়ে জিয়া বিন রাসেলের কর্মকাণ্ডের পরিধি বিস্তৃত। তাঁর এই উদ্যোগগুলোকে ঘিরে মূল বার্তাটি হলো মানুষের প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানো এবং সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।

প্রবাসে থেকেও দেশের মানুষের জন্য কাজ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবিক সংকটে সহযোগিতার এই ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হবে—এমন প্রত্যাশাই সংশ্লিষ্টদের। পূর্ব লন্ডনের মসজিদ ও মুসলিম কমিউনিটি সেন্টারও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মানবিক ও সামাজিক উদ্যোগের একটি কার্যকর কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত