জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের যে সক্ষমতা নজর কেড়েছে

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ২৭ বার
জে-১০সিই যুদ্ধবিমানের যে সক্ষমতা নজর কেড়েছে

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনী আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে চীনের তৈরি জে-১০সিই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ এখন প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এগিয়েছে। সরকারি পর্যায়ে এ নিয়ে খসড়া চুক্তিপত্র প্রস্তুত করে অনুমোদনের জন্য সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেলে চলতি অর্থবছরেই প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে; তা সম্ভব না হলে পরবর্তী অর্থবছরে উদ্যোগটি বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরে মূলত চীনা উৎসের যুদ্ধবিমান ও সামরিক প্রযুক্তির ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। ফলে নতুন প্রজন্মের জে-১০সিই যুক্ত হলে শুধু নতুন একটি যুদ্ধবিমান বহরে যোগ হবে না, বরং আকাশযুদ্ধের সক্ষমতা, দূরপাল্লার লক্ষ্য শনাক্তকরণ, বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ বা চোখের দৃষ্টিসীমার বাইরে যুদ্ধ এবং আধুনিক নেটওয়ার্কভিত্তিক অপারেশনের ক্ষেত্রেও সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

জে-১০সিই মূলত চীনের জে-১০সি যুদ্ধবিমানের রপ্তানি সংস্করণ। এটি একক ইঞ্জিনের মাঝারি ওজনের বহুমুখী যুদ্ধবিমান, যা আকাশযুদ্ধের পাশাপাশি স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধেও ব্যবহারের জন্য তৈরি। উন্মুক্ত তথ্য অনুযায়ী, বিমানটির নকশায় ডেল্টা উইং ও ক্যানার্ড কনফিগারেশন ব্যবহার করা হয়েছে। এই নকশা যুদ্ধবিমানের চালনাগত সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে এবং উচ্চ গতিতে বিভিন্ন কৌশলগত মুভমেন্ট পরিচালনার সুযোগ দেয়।

জে-১০সিই নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় এর রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ঘিরে। বিমানটির আধুনিক অ্যাভিওনিক্সের মধ্যে অ্যাকটিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে বা এএইএসএ রাডার ব্যবস্থার কথা বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এ ধরনের রাডার একসঙ্গে একাধিক লক্ষ্য শনাক্ত, অনুসরণ এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী লক্ষ্যবস্তুকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত রাডারের তুলনায় উন্নত সক্ষমতা দিতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘপাল্লার পিএল-১৫ বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ ক্ষেপণাস্ত্র। উন্মুক্ত বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সূত্রে পিএল-১৫-এর পাল্লা ২০০ কিলোমিটারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের প্রকৃত কার্যকর পাল্লা পরিস্থিতি, লক্ষ্যবস্তুর উচ্চতা, গতি, দিক, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং অন্যান্য অপারেশনাল বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। ফলে কেবল ঘোষিত সর্বোচ্চ পাল্লার ভিত্তিতে কোনো যুদ্ধবিমানের সামগ্রিক যুদ্ধক্ষমতা নির্ধারণ করা যায় না।

জে-১০সিইর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার আকাশযুদ্ধের জন্য ব্যবহৃত আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং হেলমেট-মাউন্টেড ডিসপ্লে বা সাইটিং ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করার সক্ষমতা। ফলে পাইলটকে শুধু বিমানের নাকের সামনের লক্ষ্যবস্তুর ওপর নির্ভর করতে হয় না; বিভিন্ন পরিস্থিতিতে দ্রুত লক্ষ্য নির্বাচন ও আক্রমণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাতের পর জে-১০ যুদ্ধবিমান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে আলোচনায় আসে। ওই সংঘাতে পাকিস্তান দাবি করেছিল, চীনা জে-১০ যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও জে-১০-এর ওই কথিত যুদ্ধ-অভিজ্ঞতাকে বিমানটি বিবেচনার অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব ঘটনার নির্দিষ্ট ফলাফল ও কোন বিমান কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন দাবি ও পাল্টা দাবি রয়েছে। তাই কোনো একটি পক্ষের বক্তব্যকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা সতর্কতার সঙ্গে এড়িয়ে চলাই যুক্তিযুক্ত।

বাংলাদেশের জন্য জে-১০সিইর আকর্ষণের আরেকটি কারণ হতে পারে এর পরিচালনাগত সামঞ্জস্য। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী দীর্ঘ সময় ধরে চীনা নির্মিত যুদ্ধবিমান পরিচালনা করে আসছে। ফলে নতুন চীনা প্ল্যাটফর্ম যুক্ত হলে পাইলট প্রশিক্ষণ, স্থলকর্মীদের কারিগরি দক্ষতা, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা, যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং বিদ্যমান অবকাঠামোর সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। অবশ্য নতুন যুদ্ধবিমান যুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে প্রশিক্ষণ, সিমুলেটর, অস্ত্র ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো এবং আধুনিক কমান্ড ও কন্ট্রোল ব্যবস্থারও উন্নয়ন প্রয়োজন হবে।

জে-১০সিইকে ভারতের তেজাস বা যুক্তরাষ্ট্রের এফ-১৬-এর সঙ্গে তুলনা করা হলেও তিনটি বিমানকে সরাসরি একই মানদণ্ডে বিচার করা সহজ নয়। তেজাস হালকা শ্রেণির যুদ্ধবিমান, আর জে-১০সিই মাঝারি ওজনের মাল্টিরোল প্ল্যাটফর্ম। এফ-১৬ আবার দীর্ঘদিনের যুদ্ধ-অভিজ্ঞতা ও বিপুল সংখ্যক ব্যবহারকারীর কারণে অত্যন্ত পরীক্ষিত একটি যুদ্ধবিমান পরিবার। ফলে কোন বিমানটি সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বদলে রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, পাইলট প্রশিক্ষণ, ডেটালিংক, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বাস্তব যুদ্ধপরিস্থিতির মতো একাধিক বিষয় বিবেচনা করতে হয়।

তবে জে-১০সিইর ডেল্টা-ক্যানার্ড নকশা, আধুনিক রাডার, দীর্ঘপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং উন্নত অ্যাভিওনিক্স এটিকে আধুনিক আকাশযুদ্ধের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত করেছে। চীনা বিমানটির সর্বোচ্চ গতি, অস্ত্র বহনের সক্ষমতা এবং সেন্সর ব্যবস্থার সমন্বয়ও এর সামরিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে। একটি প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণে জে-১০সিইর এএইএসএ রাডার, পিএল-১৫ ও পিএল-১০ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ক্রয় পরিকল্পনা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে ২০টি জে-১০সিই কেনার সম্ভাব্যতার কথা বলা হয়েছে। একটি প্রতিবেদনে বিমান, প্রশিক্ষণ, লজিস্টিকস, রক্ষণাবেক্ষণ, অবকাঠামো ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সরকারের প্রকাশ্য বক্তব্যে এখনো চূড়ান্ত সংখ্যা, মোট মূল্য ও সরবরাহের সময়সূচি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে চুক্তি স্বাক্ষরের আগে প্রকাশিত বিভিন্ন সংখ্যা পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আধুনিক যুদ্ধবিমান কেনা মানেই কেবল বিমান কেনা নয়। একটি কার্যকর যুদ্ধবিমান বহর গড়ে তুলতে প্রয়োজন প্রশিক্ষিত পাইলট, দক্ষ প্রকৌশলী, পর্যাপ্ত খুচরা যন্ত্রাংশ, অস্ত্রের মজুত, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, রানওয়ে ও হ্যাঙ্গার অবকাঠামো, নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আধুনিক কমান্ড ও কন্ট্রোল নেটওয়ার্ক। যুদ্ধক্ষেত্রে একটি বিমান কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকাংশেই এসব সহায়ক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে।

বাংলাদেশ সরকারের বৃহত্তর পরিকল্পনায় জে-১০সিই ছাড়াও অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার এবং ইউএভি ব্যবস্থাসহ বিমানবাহিনী আধুনিকায়নের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। অর্থাৎ জে-১০সিই কেনার উদ্যোগটি বিচ্ছিন্ন কোনো প্রকল্পের বদলে সামগ্রিক বিমানবাহিনী আধুনিকায়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, জে-১০সিই বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আকাশযুদ্ধ প্ল্যাটফর্ম। দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, আধুনিক রাডার, উন্নত অ্যাভিওনিক্স এবং বহুমুখী যুদ্ধ সক্ষমতার কারণে বিমানটি বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। একই সঙ্গে এর প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করবে কতগুলো বিমান কেনা হচ্ছে, কী ধরনের অস্ত্র ও সেন্সর প্যাকেজের সঙ্গে সেগুলো পাওয়া যাচ্ছে, পাইলট ও কারিগরি কর্মীদের প্রশিক্ষণ কতটা উন্নত হচ্ছে এবং বিমানগুলোকে দেশের সামগ্রিক আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের সঙ্গে কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত করা যাচ্ছে তার ওপর।

বাংলাদেশের জন্য তাই জে-১০সিই কেনার বিষয়টি শুধু একটি নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ আকাশ প্রতিরক্ষা কাঠামো, সামরিক প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি বড় সিদ্ধান্ত। চূড়ান্ত চুক্তি হলে বিমানগুলোর সঙ্গে কী ধরনের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তা ও প্রযুক্তিগত সুবিধা যুক্ত হচ্ছে, সেটিই শেষ পর্যন্ত এর কৌশলগত মূল্য নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত