প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬২ জনে দাঁড়িয়েছে। দুর্যোগের পর এখনো শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন। পাহাড়ি নদীর প্রবল স্রোত, কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের কারণে সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। দুর্গম ভূপ্রকৃতি ও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় উদ্ধার তৎপরতাও কঠিন হয়ে উঠেছে।
নেপালের পুলিশ এখন পর্যন্ত ১৬২টি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির পর্যটন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ৪০৩ জন পর্যটকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। নিখোঁজদের মধ্যে ৩৪১ জন বিদেশি নাগরিক। তাঁদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকও নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় হঠাৎ করে নদীর পানি বেড়ে যাওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়। পাহাড়ি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ মুহূর্তের মধ্যে প্রবল স্রোতে পরিণত হয়। পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর, বরফ ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ নেমে আসায় নদীতীরবর্তী জনপদগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়। অনেক মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সুযোগও পাননি।
প্রবল স্রোতের কারণে বাড়িঘর, যানবাহন, সেতু ও বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও ভবন ও যানবাহন কাদার নিচে চাপা পড়েছে। নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষের পাশাপাশি সড়কপথে চলাচলকারী পর্যটক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও আকস্মিক এই দুর্যোগে বিপদের মধ্যে পড়েন।
ভোটকোশী নদীর তীরবর্তী রসুয়া ও নুয়াকোট জেলার কয়েকটি জনবসতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এলাকাগুলো তুলনামূলক জনবিরল হলেও নেপাল-চীন বাণিজ্যের জন্য এসব এলাকার সড়ক যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত বাণিজ্যের পাশাপাশি পর্যটন ও তীর্থযাত্রার ক্ষেত্রেও এই অঞ্চলের গুরুত্ব রয়েছে। ফলে দুর্যোগে যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকাজের পাশাপাশি স্বাভাবিক বাণিজ্যিক কার্যক্রমও বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে।
দুর্যোগের ধাক্কায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, মহাসড়ক ও সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোরও ক্ষতি হয়েছে। অনেক সড়ক কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢেকে গেছে। কোথাও সড়কের অংশবিশেষ ধসে পড়েছে। ফলে উদ্ধারকারী দলগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছাতে বাড়তি সময় ও ঝুঁকি নিতে হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে স্থলপথে পৌঁছানো সম্ভব না হলে হেলিকপ্টারের সাহায্যে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এই প্রাণঘাতী দুর্যোগে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতিতে পুরো জাতি স্তম্ভিত ও মর্মাহত। তিনি ঘটনাটিকে আকস্মিক ও ভয়াবহ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, উদ্ধার অভিযান শুরু করতে সরকার কোনো ধরনের বিলম্ব করেনি এবং রাষ্ট্রের সব ধরনের সম্পদ ও সক্ষমতা কাজে লাগানো হয়েছে।
উদ্ধারকাজে নেপালি সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার সদস্যরা কাজ করছেন। ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও পানির নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারের পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উদ্ধার করা মরদেহ শনাক্ত করার কাজও চলছে। দুর্যোগের পর বিভিন্ন এলাকায় পরিবারগুলো নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছেন।
বিদেশি পর্যটকদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দুর্গম সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় পর্যটকদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। মোবাইল নেটওয়ার্ক ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় নিখোঁজদের বিষয়ে তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে পর্যটন কর্তৃপক্ষ, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা হালনাগাদ করার চেষ্টা করছে।
দুর্যোগের ভয়াবহতার একটি বড় কারণ হলো এর আকস্মিকতা। পাহাড়ি এলাকায় নদীর পানি দ্রুত বেড়ে গেলে সতর্ক হওয়ার জন্য সাধারণ মানুষের হাতে খুব কম সময় থাকে। বিশেষ করে নদীর উজানে হিমবাহ বা বড় ধরনের ভূমিধসের ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব ভাটির জনপদে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগে না। প্রবল স্রোতের সঙ্গে পাথর ও কাদা যুক্ত হলে তা সাধারণ বন্যার তুলনায় অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছিল, দুর্যোগের সময় যে কম্পন অনুভূত হয়েছিল, সেটি ভূমিকম্পের কারণে হয়নি। প্রাথমিকভাবে একটি ভূমিকম্পের তথ্য পাওয়া গেলেও পরে তা সংশোধন করে সংস্থাটি জানায়, হিমবাহ ধস ও এর সঙ্গে পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল প্রবাহের কারণে ভূকম্পনসদৃশ সংকেত তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ এই দুর্যোগে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, হিমবাহ ও নদীর প্রবল স্রোত একসঙ্গে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি এমনিতেই প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। খাড়া পাহাড়, হিমবাহ, বরফঢাকা অঞ্চল ও দ্রুতগতির নদী এই অঞ্চলের পরিবেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। কোনো একটি স্থানে বড় ধরনের ধস বা বরফ ভেঙে নদীতে পড়লে অল্প সময়ের মধ্যে পানির প্রবাহের চরিত্র বদলে যেতে পারে। এর ফলে নদীর নিচের দিকে থাকা জনপদগুলোতে বড় ধরনের আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা কতটা ছিল, তা বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। হিমালয়ের হিমবাহ ও বরফস্তরের পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা চলছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ, নদীর পানির স্তর পর্যবেক্ষণ এবং দ্রুত সতর্কবার্তা দেওয়ার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
বর্তমানে নেপালের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং দুর্গত এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া। যেসব এলাকায় সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে খাদ্য, পানি ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলোকে একই সঙ্গে জীবিতদের সন্ধান, মরদেহ উদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর কারণে তৈরি হওয়া নতুন ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
সীমান্তবর্তী এই দুর্যোগের প্রভাব চীনের তিব্বত অঞ্চলেও পড়েছে। ফলে নেপাল ও চীন—দুই দেশের কর্তৃপক্ষকেই নিজ নিজ এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। সীমান্তের দুই পাশে যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ বিদেশি নাগরিকদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাস ও কর্তৃপক্ষও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে।
প্রাণহানির সংখ্যা ইতোমধ্যে ১৬২-তে পৌঁছালেও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে কাদা ও ধ্বংসাবশেষের নিচে বহু মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার তৎপরতার গুরুত্ব আরও বেড়ে যাচ্ছে। জীবিতদের দ্রুত উদ্ধার করতে পারলে আরও প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নেপালের এই ভয়াবহ বন্যা শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের চিত্র নয়, বরং দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের ভঙ্গুর বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। মুহূর্তের মধ্যে নদীর পানি ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত একটি জনপদের চেনা দৃশ্য বদলে দিয়েছে। কেউ হারিয়েছেন স্বজন, কেউ হারিয়েছেন ঘরবাড়ি ও জীবিকার অবলম্বন। আবার বহু পরিবার এখনো অপেক্ষা করছেন নিখোঁজ প্রিয়জনের কোনো খবরের জন্য।
উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, দুর্যোগের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তত স্পষ্ট হবে। আপাতত সরকারের প্রধান লক্ষ্য নিখোঁজদের সন্ধান, আহতদের চিকিৎসা, জীবিতদের নিরাপদ আশ্রয় এবং দুর্গত এলাকায় প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে পাহাড়ি এলাকায় এমন আকস্মিক বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম সতর্কতা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তাও এই বিপর্যয় নতুন করে সামনে এনেছে।