প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের চক্রশালা গ্রামে গভীর রাতে একটি বাড়িতে ডাকাতির অভিযোগ উঠেছে। এ সময় বাড়ির পাশের ঘরে থাকা ৭৮ বছর বয়সী এক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে রশি দিয়ে বেঁধে রড দিয়ে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মুখোশধারী একদল ব্যক্তি বাড়ির তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যায় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
বুধবার (২৬ আগস্ট) দিবাগত রাত ১টার দিকে সাবেক ইউপি সদস্য প্রবীর ভট্টাচার্যের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। তাঁর চাচা বাবুল ভট্টাচার্য পুলিশের সাবেক উপপরিদর্শক (এসআই)। ডাকাতির সময় বাধা দিতে গিয়ে তিনি হামলার শিকার হন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ঘটনার পর তাঁকে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা প্রাথমিক চিকিৎসা দেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘটনার সময় প্রবীর ভট্টাচার্যের পরিবারের কেউ বাড়িতে ছিলেন না। তাঁর মেয়ে সন্তান প্রসবের জন্য চট্টগ্রাম নগরের একটি ক্লিনিকে ভর্তি ছিলেন। পরিবারের অন্য সদস্যরাও তাঁর সঙ্গে সেখানে অবস্থান করছিলেন। ফলে রাতের সময় বাড়িটি অনেকটাই ফাঁকা ছিল। পাশের ঘরে ছিলেন প্রবীরের চাচা বাবুল ভট্টাচার্য।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতের নীরবতার মধ্যে সাত থেকে আটজন মুখোশধারী ব্যক্তি বাড়িটির আশপাশে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে তারা প্রবীর ভট্টাচার্যের পাকা ঘরের দরজার তালা কাটার চেষ্টা করে। বিষয়টি টের পেয়ে বাবুল ভট্টাচার্য ঘর থেকে বের হয়ে তাদের দেখতে পান। এরপর হামলাকারীরা তাঁকে জিম্মি করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বাবুল ভট্টাচার্যের ভাষ্য, উঠানে বের হয়ে তিনি কয়েকজন অস্ত্রধারী ব্যক্তিকে দেখতে পান। পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই তাঁকে ধরে ফেলা হয়। পরে তাঁকে রশি দিয়ে বেঁধে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে রড দিয়ে তাঁর মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হয়। ডাকাতির কাজ শেষ করে হামলাকারীরা তাঁকে ছেড়ে দিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে বলে জানান তিনি।
৭৮ বছর বয়সী একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে এমন আচরণের ঘটনায় পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ কর্মজীবনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করা বাবুল ভট্টাচার্য নিজ বাড়ির কাছেই এমন হামলার শিকার হওয়ায় ঘটনাটি এলাকায়ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বাড়ির মালিক প্রবীর ভট্টাচার্য জানান, তাঁর মেয়ের প্রসবের কারণে পরিবারের সবাইকে চট্টগ্রাম নগরের একটি ক্লিনিকে থাকতে হয়েছিল। এই সুযোগে দুর্বৃত্তরা বাড়িতে ঢুকে আলমারি ভেঙে নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে যায়। তাঁর দাবি, বাড়ি থেকে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টাকা এবং প্রায় ছয় ভরি স্বর্ণালঙ্কার লুট করা হয়েছে।
প্রবীর ভট্টাচার্যের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লুট হওয়া টাকার মধ্যে চার লাখ টাকা ছিল জমি কেনার উদ্দেশ্যে ব্যাংক থেকে দুই দিন আগে তোলা। বাকি অর্থও বিভিন্ন প্রয়োজনে বাড়িতে রাখা হয়েছিল। পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে না থাকায় এই অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার দুর্বৃত্তদের হাতে চলে যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘটনার পর বাড়িতে ফিরে পরিবারের সদস্যরা ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো অবস্থায় দেখতে পান। আলমারি ও অন্যান্য জায়গায় তল্লাশি চালানোর চিহ্নও পাওয়া যায়। পরিবারের সদস্যদের কাছে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়ায় বাবুল ভট্টাচার্যের ওপর হামলার ঘটনা। ডাকাতির সময় তিনি একা ছিলেন এবং একদল অস্ত্রধারী মানুষের সামনে পড়ে যাওয়ায় তাঁর জীবন নিয়েও আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
বাবুল ভট্টাচার্য জানান, হামলাকারীদের সবার মুখ ঢাকা ছিল। ফলে তাঁদের কাউকে তিনি স্পষ্টভাবে শনাক্ত করতে পারেননি। মারধরের পর মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা ও ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। ঘটনার পর তাঁকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়।
পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক সামা বিনতে সফিউল জানান, ভোরে মারধরে আহত বাবুল নামের একজন ব্যক্তি চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে এসেছিলেন। তাঁর মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। তবে শরীরের অন্য কোনো স্থানে গুরুতর জখম পাওয়া যায়নি। তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে পটিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে। পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউল হক জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। প্রাথমিকভাবে বাড়িতে কেউ না থাকার সুযোগে দরজার তালা কেটে চুরির ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পুরো বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। হামলাকারীদের সংখ্যা, তাদের পরিচয়, কীভাবে তারা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল এবং আগে থেকে বাড়িতে থাকা অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার সম্পর্কে তারা জানত কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
ঘটনাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বাড়িটি ফাঁকা থাকার বিষয়টি দুর্বৃত্তরা কীভাবে জানতে পারল। পরিবারের সদস্যরা সবাই চট্টগ্রাম নগরের একটি ক্লিনিকে অবস্থান করছিলেন। এমন পরিস্থিতিতে বাড়িতে মূল্যবান সামগ্রী থাকার তথ্য আগে থেকেই কারও জানা ছিল কি না, সেটিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত পুলিশ বা পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়নি।
স্থানীয়দের মতে, রাতের বেলায় একটি বাড়িতে সংঘবদ্ধভাবে প্রবেশ করে তালা ভাঙা, একজন প্রবীণ ব্যক্তিকে জিম্মি করা এবং মারধরের পর নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের তুলনামূলক নির্জন বাড়িগুলোতে পরিবারের সদস্যরা বাইরে থাকলে নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তবে পুলিশ তদন্ত শেষ না করা পর্যন্ত ঘটনাটিকে ঘিরে কোনো অনুমানকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তারা কী উদ্দেশ্যে বাড়িটিকে লক্ষ্য করেছিল এবং লুট হওয়া অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার কোথায় রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।
একদিকে পরিবারের সদস্যদের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে বাড়িতে প্রবেশের অভিযোগ, অন্যদিকে বাধা দেওয়ায় ৭৮ বছর বয়সী একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাকে বেঁধে মারধরের ঘটনা—দুই দিক থেকেই ঘটনাটি গুরুতর। অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার লুটের ক্ষতির পাশাপাশি প্রবীণ ব্যক্তির ওপর শারীরিক হামলা পরিবারের নিরাপত্তাবোধেও বড় ধরনের আঘাত করেছে।
পটিয়া থানার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। পুলিশ জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি লুট হওয়া মালামাল উদ্ধারের চেষ্টা করছে। তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ঘটনার প্রকৃত চিত্র এবং হামলাকারীদের পরিচয় আরও পরিষ্কার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।