প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ভয়াবহ যানজটে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো যাত্রী। নারায়ণগঞ্জের আষাড়িয়ারচর ব্রিজে সংস্কারকাজের কারণে শনিবার মহাসড়কের ঢাকা অভিমুখী লেনে সৃষ্টি হওয়া যানজট একপর্যায়ে কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘ প্রায় ৫২ কিলোমিটার সড়কজুড়ে যানবাহনের সারি তৈরি হওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়েছে যাত্রী, চালক ও পরিবহনশ্রমিকদের।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন হাসপাতালে নেওয়া রোগী, শিশু ও বিদেশগামী যাত্রীরা। নির্ধারিত সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছানো নিয়ে উদ্বেগে পড়েছেন অনেক যাত্রী। কেউ কেউ যানজটে আটকে থাকা গাড়ি ছেড়ে বিকল্প যানবাহনে ঢাকায় পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন। তবে এই সুযোগকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
শনিবার সকালে কুমিল্লার বুড়িচং থেকে মেঘনা টোলপ্লাজা পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। কোথাও গাড়ি ধীরগতিতে চললেও অধিকাংশ স্থানে দীর্ঘ সময় প্রায় স্থির হয়ে থাকে যানবাহন। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের দুর্ভোগও বাড়তে থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আষাড়িয়ারচর ব্রিজের ঢাকা অভিমুখী লেনের একটি অংশে বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দেয়। গর্তটি ক্রমেই বড় হতে থাকায় সড়ক বিভাগের পক্ষ থেকে শুক্রবার সকাল থেকে সংস্কারকাজ শুরু করা হয়। সংস্কারকাজ চলাকালে মহাসড়কের একটি লেন বন্ধ রেখে অন্য লেন দিয়ে যানবাহন চলাচল করতে দেওয়া হয়।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের অন্যতম ব্যস্ত সড়কপথ হওয়ায় একটি লেন বন্ধ হওয়ার প্রভাব দ্রুতই পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। দিনের বেলায় যানবাহনের চাপ বাড়ার পাশাপাশি রাতে অতিরিক্ত গাড়ি এক লেন দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে যানজট আষাড়িয়ারচর ব্রিজ এলাকা ছাড়িয়ে মেঘনা, দাউদকান্দি, চান্দিনা হয়ে কুমিল্লার আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকা মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা গেছে বিদেশগামী যাত্রীদের মধ্যে। নির্ধারিত সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছাতে না পারার আশঙ্কায় অনেকেই চরম উৎকণ্ঠায় সময় পার করেন। কয়েকজন যাত্রীর ফ্লাইট দুপুরে থাকলেও সকাল পর্যন্ত তারা দাউদকান্দি ও আশপাশের এলাকায় আটকে ছিলেন বলে জানা গেছে।
একাধিক চালক জানান, মহাসড়কে যানবাহন আটকে থাকায় বিকল্প পথে দ্রুত ঢাকায় যাওয়ার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে। প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক নজরদারি ব্যবস্থার কারণে উল্টো পথে যান চলাচল করাও সম্ভব হয়নি। ফলে অনেক যাত্রী গাড়ি ছেড়ে সিএনজি চালিত অটোরিকশা কিংবা অন্য ছোট যানবাহনে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
তবে যানজটের এই পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে। যাত্রীদের দাবি, সাধারণ সময়ে যে পথের জন্য তুলনামূলক কম ভাড়া লাগে, যানজটের সুযোগে সেখানে কয়েক গুণ বেশি টাকা দাবি করা হচ্ছে। বিদেশগামী যাত্রীদের জন্য সময়ের চাপ থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে বিকল্প যানবাহনে যাত্রা করছেন।
কুমিল্লা থেকে একজন বিদেশগামী যাত্রীকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়া মনির হোসেন জানান, সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, যানজট এড়িয়ে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার আশায় চান্দিনা থেকে অটোরিকশা ও সিএনজির মতো বিকল্প যানবাহন ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ভাড়া গুনতে হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা থেকে গৌরীপুর পর্যন্ত পৌঁছাতেই কয়েক ঘণ্টা সময় লেগেছে। অথচ নির্ধারিত সময়ে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর চাপ ছিল। সামনে আরও যানজট থাকায় গন্তব্যে সময়মতো পৌঁছানো নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
দাউদকান্দি টোলপ্লাজা এলাকায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকা খন্দকার আরিফ হোসেন বলেন, ভোরে কুমিল্লা থেকে রওনা দেওয়ার পর মাত্র প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেই চার ঘণ্টা সময় লেগেছে। সকাল গড়িয়ে গেলেও গাড়ি খুব একটা এগোচ্ছিল না।
তিনি জানান, দীর্ঘ সময় যানবাহনের মধ্যে আটকে থাকায় নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন। প্রচণ্ড গরমে ছোট শিশুদের অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। পর্যাপ্ত খাবার ও পানি না থাকায় অনেক যাত্রীকে বাড়তি দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
যানজটের কারণে রোগীদের পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জরুরি চিকিৎসার জন্য রাজধানী বা অন্য এলাকায় যাওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টার বিলম্ব গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘ সময় গাড়িতে আটকে থাকা অসুস্থ মানুষ, বয়স্ক ব্যক্তি ও শিশুদের জন্য পরিস্থিতি ছিল বিশেষভাবে কষ্টকর।
পণ্যবাহী যানবাহনের চালকরাও দীর্ঘ যানজটে বিপাকে পড়েছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই স্থানে আটকে থাকায় পরিবহন খরচ বাড়ছে। বিশেষ করে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো প্রয়োজন এমন পণ্যের ক্ষেত্রে বিলম্ব ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রেম দাস রায় জানান, দাউদকান্দি থেকে মেঘনা টোলপ্লাজা পর্যন্ত যানজটের প্রধান কারণ আষাড়িয়ারচর ব্রিজ এলাকায় চলমান সড়ক সংস্কারকাজ। যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে এবং যানজট নিয়ন্ত্রণে হাইওয়ে পুলিশের একাধিক দল মাঠে কাজ করছে।
হাইওয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পুলিশ সদস্যরা যানবাহন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ এবং এক লেন বন্ধ থাকার কারণে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সময় লাগছে।
ইলিয়টগঞ্জ হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জানান, যানজট চান্দিনা অতিক্রম করে বুড়িচং উপজেলার নিমসার এলাকার কাছাকাছি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে যানবাহন ধীরগতিতে চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একাধিক টিম কাজ করছে বলে তিনি জানান।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সড়কপথ। রাজধানীর সঙ্গে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম এবং পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার যোগাযোগ এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে মহাসড়কের কোনো অংশে দীর্ঘ সময় যান চলাচল ব্যাহত হলে তার প্রভাব দ্রুতই বহু জেলায় ছড়িয়ে পড়ে।
সড়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ব্যস্ত মহাসড়কে সংস্কারকাজ পরিচালনার সময় বিকল্প যান চলাচল ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি মেরামত অবশ্যই প্রয়োজন, কারণ ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক বা সেতু দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে একই সঙ্গে সংস্কারকাজের সময় যানবাহনের চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং যাত্রীদের আগাম তথ্য দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে দুর্ভোগ অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
শনিবারের এই যানজট আবারও দেখিয়ে দিল, দেশের প্রধান মহাসড়কগুলোর একটি অংশে সামান্য প্রতিবন্ধকতাও কীভাবে বড় সংকটে পরিণত হতে পারে। একটি লেন বন্ধ হওয়ার পর যানবাহনের চাপ সামাল দিতে না পারায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দীর্ঘ পথজুড়ে যানজট সৃষ্টি হয়েছে।
যাত্রীদের প্রত্যাশা, দ্রুত সংস্কারকাজ শেষ করে পুরো সড়ক স্বাভাবিক করা হবে। একই সঙ্গে রোগী ও বিদেশগামী যাত্রীদের মতো জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারী মানুষের জন্য বিশেষ ব্যবস্থার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সকাল থেকে সড়কে আটকে থাকা হাজারো মানুষের একটাই অপেক্ষা ছিল—কখন আবার গাড়ির চাকা স্বাভাবিক গতিতে চলবে। কারও সামনে হাসপাতালের জরুরি দরজা, কারও সামনে বিমানবন্দরের নির্ধারিত ফ্লাইট, আবার কারও সামনে বহু দূরের গন্তব্য। কিন্তু সবার পথ আটকে দিয়েছে মহাসড়কের দীর্ঘ যানজট।
সংস্কারকাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে, এখন সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। তবে দীর্ঘ সময়ের এই ভোগান্তি যাত্রীদের মনে আবারও একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে—দেশের প্রধান মহাসড়কগুলোতে কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।