গুমবিরোধী আইনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬
  • ১ বার
গুমবিরোধী আইনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস পালিত হচ্ছে ৩০ আগস্ট। বিশ্বজুড়ে জোরপূর্বক গুমের শিকার মানুষ, তাদের স্বজন এবং দীর্ঘদিন ধরে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে অপেক্ষারত পরিবারগুলোর প্রতি সংহতি প্রকাশের এই দিনটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। অতীতের গুমের অভিযোগগুলোর বিচার, নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অধিকার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর আইন প্রণয়নের প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে।

২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গুম হওয়া থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ গৃহীত হয়। পরবর্তীতে ২০১০ সাল থেকে সনদটি কার্যকর হয়। গুমকে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ এ ধরনের ঘটনায় একজন ব্যক্তিকে আইনগত সুরক্ষার বাইরে নিয়ে যাওয়া, তার অবস্থান গোপন রাখা এবং পরিবারকে দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

বাংলাদেশে গত দেড় দশকে গুমের অভিযোগ মানবাধিকার পরিস্থিতির অন্যতম আলোচিত ও উদ্বেগজনক বিষয় হয়ে ওঠে। বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী, ভিন্নমতাবলম্বী, অধিকারকর্মী এবং সাধারণ নাগরিকদের গুমের অভিযোগ নিয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। অনেক পরিবার বছরের পর বছর নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় থেকেছে। কেউ ফিরে এসেছেন দীর্ঘ সময় পর, আবার অনেকের খোঁজ আজও মেলেনি বলে পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ।

গুমের অভিযোগ শুধু একজন ব্যক্তির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষা, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং গভীর মানসিক যন্ত্রণা। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নিখোঁজ হলে স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মা এবং স্বজনদের জীবন এক মুহূর্তে বদলে যায়। কোথায় আছেন, জীবিত নাকি মৃত—এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে বছরের পর বছর কাটানো পরিবারের জন্য এক ধরনের অসহনীয় বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশে অতীতের গুমের অভিযোগ তদন্ত এবং জবাবদিহির বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পায়। ওই সময় গুমের ঘটনা অনুসন্ধানে কমিশন গঠনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বরাবরই বলে আসছে, গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য শুধু অপরাধীদের বিচার করাই যথেষ্ট নয়; সত্য উদ্‌ঘাটন, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সেই নিশ্চয়তাও প্রয়োজন।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সনদ অনুমোদনের পর গুম প্রতিরোধে একটি শক্তিশালী আইন প্রণয়নের প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ প্রেক্ষাপটে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত আইনি কাঠামো নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। চলতি আগস্টে সরকার গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারসংক্রান্ত নতুন আইনের খসড়া অনুমোদন করে এবং পরে বিলটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়।

সাম্প্রতিক সংসদীয় কার্যক্রম অনুযায়ী, গুমকে একটি স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে শাস্তির বিধানসহ নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত আইনে গুমের অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছে এবং বিলটি সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়েছে বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য। তবে আইনটির বিভিন্ন ধারা নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও অধিকারভিত্তিক সংগঠনগুলোর মধ্যে প্রশ্ন ও উদ্বেগ রয়েছে।

বিশেষ করে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বক্তব্য, যেসব প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে পারে, সেই কাঠামোর ভেতরে তদন্ত হলে স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তাদের মতে, গুমের মতো গুরুতর অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে এমন একটি স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা প্রয়োজন, যাতে ভুক্তভোগী পরিবার এবং সাধারণ মানুষ তদন্তের ফলাফল নিয়ে আস্থা রাখতে পারেন।

অধিকারভিত্তিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ তদন্তকারী কাঠামোর কাছে দেওয়া হলে তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে। কারণ গুমের অভিযোগের ক্ষেত্রে শুরুতেই নিশ্চিত হওয়া কঠিন হতে পারে কোন সংস্থা বা কারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত। ফলে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

প্রস্তাবিত আইনের আরেকটি বিষয় নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অভিযোগ শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত না হলে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান থাকলে প্রকৃত ভুক্তভোগী বা তাদের পরিবার অভিযোগ করতে ভয় পেতে পারেন—এমন আশঙ্কা মানবাধিকারকর্মীদের। তাদের মতে, গুমের মতো ঘটনায় পরিবার অনেক সময় সীমিত তথ্য নিয়ে অভিযোগ করতে বাধ্য হয়। নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান সম্পর্কে তথ্য গোপন থাকলে অভিযোগ প্রমাণের দায়িত্বও পরিবারের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এ কারণে আইন প্রণয়নের সময় ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা এবং মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ প্রতিরোধ—দুই বিষয়েই ভারসাম্য রাখা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একদিকে আইন যেন অপব্যবহারের সুযোগ না দেয়, অন্যদিকে যেন কোনো ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ করার সাহস হারিয়ে না ফেলে।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের আর্থিক ও সম্পত্তিগত অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকলে তার ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তি, ব্যবসা বা পারিবারিক দায়িত্ব পরিচালনা নিয়ে জটিলতা দেখা দিতে পারে। ফলে স্ত্রী-সন্তান ও নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় আইনি এবং অর্থনৈতিক সংকটে পড়েন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের জন্য একটি স্পষ্ট আইনি সুরক্ষা থাকা প্রয়োজন, যাতে তারা অমানবিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে না পড়েন।

যেসব ব্যক্তি দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর ফিরে এসেছেন, তাদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলা বা অন্যান্য আইনি জটিলতার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, গুম থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের অভিযোগ, নির্যাতনের দাবি এবং তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি যদি বেআইনি আটক, নির্যাতন বা জোরপূর্বক স্বীকারোক্তির শিকার হয়ে থাকেন, তাহলে সেই অভিযোগেরও কার্যকর তদন্ত হওয়া জরুরি।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—নতুন আইনটি কতটা কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য হবে। শুধু কঠোর শাস্তির বিধান করলেই একটি আইন সফল হয় না। অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা, সাক্ষীদের সুরক্ষা, দ্রুত বিচার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে আইনের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করা কঠিন।

আন্তর্জাতিক দিবসটি তাই শুধু অতীতের নিখোঁজ মানুষদের স্মরণের দিন নয়; এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য আত্মসমালোচনারও একটি উপলক্ষ। একটি গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারসম্মত রাষ্ট্রে কোনো নাগরিকের অবস্থান অজানা থাকা, পরিবারকে বছরের পর বছর অনিশ্চয়তায় রাখা কিংবা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত না হওয়া কখনোই স্বাভাবিক বিষয় হতে পারে না।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার আজও অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। কেউ জানতে চায় তার স্বজন কোথায়, কেউ চায় সত্য প্রকাশ হোক, কেউ চায় দায়ীদের বিচার, আবার কেউ শুধু এমন একটি নিশ্চয়তা চায়—ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে যেন একই যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।

৩০ আগস্টের আন্তর্জাতিক দিবসকে সামনে রেখে তাই গুম প্রতিরোধে একটি কার্যকর, নিরপেক্ষ এবং মানবাধিকারসম্মত আইন প্রণয়নের দাবি আরও জোরালো হচ্ছে। আইনটি এমন হওয়া প্রয়োজন, যা শুধু কাগজে-কলমে অপরাধকে সংজ্ঞায়িত করবে না; বরং সত্য উদ্‌ঘাটন, ন্যায়বিচার, ভুক্তভোগীর অধিকার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বাস্তব ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

গুমের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অবস্থান কতটা দৃঢ়, তা শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে আইনের ভাষায় নয়, তার প্রয়োগে। নিখোঁজদের সন্ধান, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই হতে পারে একটি নতুন ও মানবিক বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত